বইপোকা - কানাই কুণ্ডু


বইপোকা
কানাই কুণ্ডু

বইপোকারা বই পড়ে না। চশমাও পরে না। এটা জেনেও সবাই সুমনকে কেন যে বইপোকা বলে! সুমন বই খায় না, পড়ে।মানুষের নানা অভ্যেস থাকে। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, সিনেমা দেখে, বেড়াতে যায়, খেতে ভালবাসে, রুস্তমি করে, পাড়ার দাদা হয়। আবার কেউ গান গায়, গপ্পো কবিতা লেখে, নাটক করে, সংসারও করে। সুমন এ সব কিছুই করে না, পড়ে। যত পুরনো তত আগ্রহ। এই অভ্যেসে সে কলেজ ষ্ট্রিট যায়, শ্যামবাজার, চৌরঙ্গি পাড়া, ফ্রি স্কুল ষ্ট্রিট বা গোলপার্ক। ফুটপাথে বিছানো নানা নতুন পুরনো বই। নতুনে সুমনের আগ্রহ নেই। কেবল পুরনো খোঁজে। মলাট ফর্দাফাই। হলদেটে পাতা পোকায় কুটো করা। টাইটেল পেজ নেই। নেই লেখকের নাম বা শেষের পাতা। অথবা ছেঁড়া পাতা সেলোটেপে জড়ানো।

এ ভাবেই ডিফো সুইফট ব্রন্টি থেকে শলোকভ টলস্টয়। পদাবলি থেকে মধুসূদন হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্র বিহারীলাল অক্ষয়কুমার বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র তারকনাথ। অথবা হোমার বায়রন টেনিসন। এর আগে এগোয় না। পরের প্রজন্মের লেখকদের বই পুরনো হলেও দাম বেশি। ব্যতিক্রম কেবল উইয়ের মানচিত্র আঁকা একটি সঞ্চয়িতা। সুমনের মাসিক বরাদ্দ চল্লিশ টাকা। চার-পাঁচটার বেশি হয় না। আজকাল দাম আরও চড়ছে। সুমন পাঁচেই সন্তুষ্ট। এতেই একটা মাস কেটে যায়। শেষের দিকে ফাঁকা থাকলে আগের কেনা বই ওল্টায়।

সকালের এজমালি কাগজ হাতে আসতে সাড়ে আট। তাও পাতা ভাগ করে পড়তে নটা। কেউ কেউ আলাদা কাগজ নেয়। আমার রুমের নতুন ছোকরা জয়ন্ত নেয় টেলিগ্রাফ। বিজ্ঞাপন দেখে চাকরি বদল করে। বামার গপ্পো বাতিক আছে। সে নেয় আনন্দবাজার। নটার পরে নীচতলার চৌবাচ্চায় স্নান ইত্যাদির হুড়োহুড়ি। দু’ মুঠো গিলে বেরিয়ে পড়া।

সুমন দশটায় তৈরি হয়। আগে পরের ঝগড়া নেই, নির্বিকার। বি বি গাঙ্গুলি ধরে হেঁটে বি বা দী বাগ। একই চেয়ার টেবলে এক খাতা থেকে অন্য খাতায় টোকাটুকিতে একুশটা বছর। অথচ এরই জন্যে গ্রাজুয়েশনে প্রথম বিভাগ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা! ছুটির পর আবার হাঁটতে হাঁটতে নানা বইয়ের খোঁজ খবর। তালিকা তৈরি। মাসের মাইনে পেলে এক সপ্তাহ ধরে কেনাকাটা। দোকানদাররা তাকে চেনে। পুরনো বই তুলে রাখে। সুমনের পছন্দ না হলে অন্য খদ্দেরকে বিক্রি করে।

একবার কেনাকাটায় তার সঙ্গী ছিলাম। ভাইঝি যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য পড়ে। বাইরনের বই দরকার। সুমন বুদ্ধি দিয়েছিল, নতুন কিনবেন কেন? তিনশো টাকা দাম। আমার সঙ্গে চলুন। পুরনো কিনে দেব সস্তায়।

অফিস পাড়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গি, পার্ক ষ্ট্রিটের মোড়, ভবানীপুর, রাসবিহারীতে এসে আমার ধৈর্য এবং ক্ষমতা স্তিমিত। সুমন আশ্বাস দেয়, ঠিক পাওয়া যাবে। আর একটু এগোলেই গড়িয়াহাট, গোলপার্ক। কত পুরনো বইয়ের দোকান, এদিকে আবার বেশির ভাগই ইংরেজি বই।

বললাম, কোথাও একটু বসি। চা খাই।

আগে বইটা পাওয়া যায় কি না দেখি। অকারণে খরচা করবেন?

তার অসীম ধৈর্য এবং বিনীত পথ হাঁটায় আমি বিরক্ত। ভাবি, কলেজ ষ্ট্রিটের দোকান থেকে নতুন কেনাই ঠিক ছিল। কেন যে সুমনকে বলতে গেলাম! অগত্যা পথ হাঁটি। কিছুই দেখি না। দেশপ্রিয় পার্ক পেরিয়ে লেক ভিউ’র ফুটপাথে বইটা পাওয়া গেল। পুরনো হলুদ পাতার বই। মাঝারি ডায়রির আকৃতি। সাধারণ ম্যাটমেটে বোর্ডে নতুন করে বাঁধাই। ওপরে কালো কালিতে হাতে লেখা: বায়রন’স পোয়েমস। কবিতা তখনও পোয়েট্রি হয়নি। প্রিফেসের পাতা থেকে শুরু। দ্বিতীয় মুদ্রণের প্রিফেসে প্রকাশ কাল ১৮১৩। শেষের পাতায় একটি ফুলের ছবি সহ লেখা: টেম্পল প্রেস, লেচওয়ার্থ, গ্রেট ব্রিটেন। ব্রিটেন তখন গ্রেট ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর বই একবিংশ শতাব্দীর ফুটপাথে! দাম জিজ্ঞাসা করতে বলল, পঁচিশ টাকা। তবে ওনার খাতিরে কুড়ি।

সেই দিন থেকে সুমন আমার চোখে ভিন্ন এবং একা।

উত্তরে বা দক্ষিণে সুমনের পত্রচিত্র এমনই পদাতিক। মেসে ফেরে প্রায় আটটায়। হাত মুখ ধুয়ে শুকনো মুড়ি এবং চা। তেলেভাজা রোল টোস্ট ওমলেট নাকি পেটে সয় না। অন্য বোর্ডাররা বলে, পেটে নয়, পকেটে সয় না। হাড় কেপ্পন। দাড়িটা পর্যন্ত কাটে না!

তাকে রোগাই বলা যায়। লম্বা। চোখে চশমা। কাঁচা পাকা চুল। পায়ে প্লাস্টিক ফোমের চটি। খানসামার মতো খাটো পাজামা। পাঞ্জাবি কখনও গেরুয়া অথবা সাদা। শীতে বাড়তি খদ্দরের ডানা ছাঁটা কোট। মেসে লুঙ্গি গেঞ্জি।

অবনীদা মেসের মালিক। নাম বদলে গেস্ট হাউস করেছেন। আমরা বোর্ডার ছিলাম। এখন সবাই পেয়িং গেস্ট। তিনি সকালে আসেন, রাত্রে পারিবারিক ফ্ল্যাটে ফিরে যান। মহাত্মা গান্ধী রোডে তিনতলা পুরনো বাড়িতে এই গেস্ট হাউস। নীচে রাস্তার দিকের ঘরে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। পাশের গলিতে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। নীচেই চৌবাচ্চা, বাথরুম ইত্যাদি। টানা বারান্দা। ওপরের দুই তলায় তিনটি করে বড় বড় কামরা। প্রতি কামরায় চারটি তক্তপোশ। মাঝে হাঁটা চলার জায়গা। ইদানীং পুরনো তুলোর গদি বদলে কয়্যারফোমের ম্যাট্রেশ এবং বালিশ। রাস্তার দিকে কয়েকটা বিশাল জানলা। প্রায় প্রতিটায় দু-চারটে খড়খড়ি ভাঙা। সপ্তাহে একদিন চাদর বদল হয়। ছাদের চিলেকোঠায় রান্না। নীচের বারান্দা ঘিরে ডাইনিং। তবুও এই ছয় কামরার চল্লিশ জনই পুরনো অভ্যাস এবং পরম্পরায় একে মেস বলে থাকি।

প্রতি তক্তপোশের মাথার দিকে কিছুটা জায়গা ছাড়া। সেখানে কারও আলমারি, সেলফ, র্যাক বা টেবিল নিজের পয়সায় কেনা। কোনও বোর্ডার চলে গেলে, পুরনো দামে সস্তায়। যেমন উমাপতি তক্তপোশে বসে টেবিল টেনে ছাত্রদের খাতা দেখে, নম্বর দেয়। তাপস ভাল চাকরি করে। তার টেবিল এবং আয়না লাগানো আলমারি। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই কাজ সারে। বামাচরণের টুল আছে। মাথার দেওয়ালে বারো মাসের লম্বা ক্যালেণ্ডার। সেখানে সে জামা প্যান্ট ঝুলিয়ে রাখে। সুবোধের খাটের নীচে কালো ঢাউস ট্রাঙ্ক। সুমনের পাশে নাইলনের দড়ি টাঙানো। সেখানে তার লুঙ্গি গেঞ্জি পাজামা। নীচে ইটের ওপর পাতা তক্তায় বইয়ের পিরামিড। পড়াশোনা তক্তপোশে। প্রতি কামরায় ঝুলে কালো হয়ে যাওয়া দুটি পাখা, তিনটি টিউব। কারও রেডিও, ট্রানজিস্টার বা টেপরেকর্ডার। তাপসের কেবল টিভি, রঙিন এবং ছোট। কেউ গান শোনে, টিভি দেখে, কেউ বা তাস খেলে। সুমন পড়ে।

আর এই পড়া নিয়েই সেদিন ক্যাচাল। বিরক্তি থেকে কলহ। আলোটা নিবিয়ে দিন না মশাই। কটা বাজে দেখেছেন?

আলো তো সবই নেবানো, শান্তভাবে বলে সুমন।

আপনার টেবিল ল্যাম্পটাও বন্ধ করুন।

আর দেড় পৃষ্ঠা।

সময় যায়। কলহ চিৎকারে পরিণত হয়। উমাপতি উঠে ল্যাম্পের সুইচ বন্ধ করে। বামাচরণ চোখের ওপরে থেকে রুমাল সরায়। সুবোধ কাগজ ভাঁজ করে রাখে।

মেসের একটা শৃঙ্খলা আছে। সেই নিয়মে সবাইকে অবনীদার অফিস ঘরে বৃহস্পতিবার উপস্থিত থাকতে হয়। আমাকেও। উমাপতি শুরু করে, আপনি পয়সা আগাম নেন, অথচ গেস্টদের অসুবিধার খবর নেন না।

অবনীদা থই পান না। আপনারা না বললে, বুঝব কী করে।

রাতের বিশ্রাম আর দু’ মুঠো খাবারের জন্যে মেসে থাকা, সুবোদের যোগান।

এটা মেস নয়।

দুটো কথার একই মানে। বেশ, গেস্ট হাউস। কিন্তু বিশ্রামে...

হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটল কেন?

রাত্রে ঘুমোতে না পারলে, বিশ্রাম হয় কেমন করে। উমাপতির রাগত অভিযোগ।

কে ঘুমোতে দেয় না? ওহ্‌, সুমন।

আরে দাদা, রাত দুটো পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে রাখে, বলে বামাচরণ।

তাপস বলে, কীসের এত পড়া। এই যে উমাদা, স্কুলে ছাত্র পড়ান। তাকেও তো এত পড়তে দেখি না।

উমাপতির অবজ্ঞা, বোধহয় বানান করে পড়ে। মগজে কিছু ঢোকে বলে মনে হয় না।

সুমনের নির্হিংস সাফাই, আপনারা গান শোনেন, টিভি দেখেন, তাস খেলেন। আমি তো বিরক্ত হই না। মগজ জ্ঞান এ সব প্রসঙ্গ না তোলাই ভাল।

তাপস তেড়ে আসে, উমাদার চেয়ে আপনি বেশি বোঝেন?

তেমন দাবি আমি করিনি। উনি নিশ্চয়ই বেশি বোঝেন। তবে সেদিন এক ছাত্রের খাতায় ভুল লিখতে দেখেছি।

উমাপতি চিৎকার করে প্রতিবাদ জানায়, ভুল লিখেছি? আমি?

তেমন কিছু নয়। হোমারের জন্মস্থান আয়োনিয়া লিখেছিলেন।

তাই তো।

না। তা নয়। গ্রিসের সাতটি শহরকে তার জন্মস্থান অনুমান করা হয়। জন্মসালও ৭০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ নয়। তার জন্ম তারিখ আজও নিরূপিত হয়নি। এমনকী ওডিসি যে তাঁরই রচনা, এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। সবই অনুমানভিত্তিক।

উমাপতি থমকে যায়। এই তথ্য আমার জানা নেই। প্রয়োজন হয় না। আমি ইংরাজি ভার্সান পড়েছি। রিউ-র সম্পাদনা।

এই র্যু কে?

বিলেতের কোনও পণ্ডিত।

র্যু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের দায়িত্বে বোম্বাইতে এসেছিলেন। এমনকী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারাঠা ইনফ্যান্ট্রির সৈনিক হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন কিছুকাল।

উমাপতির অহমিকা গুঁড়িয়ে যায়। স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে বলে চলে যায়।

আজকাল সুমনের সঙ্গে দেখা হয় না। সে মেসে থেকেও প্রায় নেই। ওপরের চিলেকোঠার খুপরিতে আগে যেখানে রান্না হত, ওটাই তার আস্তানা। নীচের বারান্দার একাংশ ঘিরে এখন কিচেন। একদিন তাকে দেখতে গেলাম। তক্তপোশে আধশোয়া। হাতে মলাট ছেঁড়া বই। আমাকে দেখে উঠে বসল। মাথার দিকে বেশ উপরে একমাত্র ঘুলঘুলি বা জানালা। সিলিং-এ ঝোলানো তেল কালিতে বিবর্ণ দুই ব্লেডের ডি সি পাখা, দেওয়ালের হোল্ডারে বাল্‌ব এবং সুমনের মাথার পাশে বইয়ের তাকের ওপর টেবিল ল্যাম্প। তক্তার ওপরে বইয়ের পাহাড়। পাশে বসে বলি, নতুন কী পড়লে সুমন?

ঠিক বলতে পারব না।

হাতে বই। অথচ বলতে পারবে না! নামের পাতাও ছেঁড়া?

তা নয়। একটা চটি বই। নাম কলকেতার হাট হদ্দ। ১৮৬৪-তে ছাপা। লেখকের নাম নেই। ঝরঝরে চলিত ভাষা। পুরনো কলকাতাকে জীবন্ত পাওয়া যায়। অনামে কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা মনে হয়।

কিন্তু এই আলো হাওয়াহীন ঘরে তুমি যে অসুস্থ হয়ে পড়বে।

আলো তো আছে। ওপরের জানালা দিয়ে হাওয়াও আসে।

কিছুদিন না হয় বাইরে কোথাও ঘুরে এসো। দেশ গ্রামে কেউ নেই শুনেছি। দূরে কাছে আত্মীয়স্বজনও নেই? দিঘা পুরী দার্জিলিং তো পা বাড়ালেই।

ওই পয়সায় পঁচিশটা বই হবে। দেশ বিদেশের অনেক বইও আছে। ওতেই আমার দেখাশোনা জানা।

মনে পড়ে কে যেন ওকে পোকা বলেছিল এবং কিপ্টে।

সুমন এখন দিব্যি আছে। অনেক রাত পর্যন্ত বই পড়ে। তাকে নিয়ে কোনও কৌতূহল বা বিরক্তি নেই। আমরাও নিয়মিত অফিস যাই, মেসে ফিরি। আমার প্রতি শুক্রবার বা ছুটির দিনে অফিস থেকে সোজা দুবরাজপুর যাওয়া আছে। সেখানে মা বউ ছেলে মেয়ে। সোমবার অফিসে হাজিরা। সন্ধ্যায় মেসে ফেরা। এই আবর্তে জীবনের অনেকগুলো বছর খরচ হয়ে যায়। বুড়ো হই।

সিঁড়ি বেয়ে সেদিনও দোতলায় ওঠার মুখে থমকে দাঁড়ালাম। অবনীদার ঘরে ভিড় কেন! দুই পুলিশকেও দেখতে পাচ্ছি। ভেতরে আসতে উমাপতিকে বলতে শুনি, কার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে অবনীদা, আপনি কী করে বলবেন। এ রকম হতেই পারে। কারও পক্ষে এত বই কেনা সম্ভব!

সবই তো ছেঁড়া, পোকায় কাটা।

হলই বা পুরনো বই, তার দাম নেই?

প্রসঙ্গ যখন বই, নিশ্চয়ই সুমনকে নিয়ে আবার গোলমাল। আমি আগ্রহী হই, পুলিশ অফিসার বলে, পরশু রাতে এক বিখ্যাত পুরনো বইয়ের দোকানের শাটার ভেঙে চুরি হয়। ফ্রি স্কুল ষ্ট্রিটের এক হকারের কাছে কয়েকটা চোরাই বই পাওয়া যায়। সেই হকার বলেছে, দুটো বই সে নাকি এই মেসের একজনকে বিক্রি করেছে। আমরা তদন্তে এসেছি।

আমি প্রতিবাদ করি, আপনারা ভুল জায়গায় এসেছেন। বই পুরনো মানেই চোরাই নয়।

কালপ্রিট এই মেসের কথাই বলেছে। ভাল বই পেলে সে নাকি এখানে খবর দিতে আসত।

সুবোধ বলে, আমি দু-তিনজনকে আসতে দেখেছি।

উমাপতি বলে, আমিও।

অফিসার আমার দিকে তাকায়। আমরা ভুল জায়গায় আসিনি। চলুন, আপনাকে থানায় যেতে হবে।

অবনী বলেন, না না, উনি নন। বই যে কেনে, সে ফেরেনি এখনও। তার তো বিগত দশ-বারো বছর ধরে বই কেনার অভ্যাস। সবই পুরনো।

অফিসার গম্ভীর। তা হলে তো এক গভীর চক্রান্ত। এতদিন ধরে কেনাবেচার কারবার করছেন। তাও আমাদের নাকের ডগায়!

সে বই বিক্রি করে না।

নিশ্চয়ই করেন। আপনারা জানেন না।

আমরা তাকে কখনও বই বিক্রি করতে দেখিনি।

তাপস আমাকে শুধরে দেবার চেষ্টা করে, এ ভাবে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, সত্যেনদা। আমি ওকে বই নিয়ে বেরোতে দেখেছি।

ইতিমধ্যে সুমন আসে। হাতে দুটো পুরনো বই। সোজা উপরে যাচ্ছিল। উমাপতি পুলিশ অফিসারকে বলে, ওই যে আপনার আসামি।

আমি সুমনকে ডাকি। জানতে চাই, সম্প্রতি ফ্রি স্কুল ষ্ট্রিটের কোনও দোকান থেকে বই কিনেছ?

কোন দোকান থেকে কখন কী বই কিনি ঠিক মনে থাকে না, বলে সুমন।

পুলিশ অফিসার জানতে চায়, সব পুরনো?

সবই পুরনো।

রবার স্ট্যাম্প আছে?

কোনওটায় নাম লেখা, কোথায়ও বা সই তারিখ, কোথায়ও আণ্ডারলাইন, ফুট নোট। রবার স্ট্যাম্পও থাকতে পারে।

আমরা দেখতে চাই।

ওপরে চলুন।

অবনীদাকে সঙ্গে নিয়ে আমিও ওপরে যাই। সুমনের ঘরের দরজায় দড়ির ফাঁস। অফিসার বলে, এই ভাবে দরজা বন্ধ রাখেন। চুরি হয় না!

আমাদের পরস্পরে আস্থা আছে। তালার দরকার হয় না।

অফিসার কিছুটা যেন বিব্রত। মাথা নিচু। দড়ির ফাঁস খুলে অন্ধকার ঘর। ভ্যাপসা গন্ধ। সুমন আলো জ্বালায়। বিছানায় ছড়ানো বই। মাথার দিকের তক্তায় বইয়ের পাহাড়। অফিসার বলে, করেছেন কী মশাই। এই ছাইভষ্ম এখন ঘাঁটতে হবে!

সুমন উত্তর দেয় না। অফিসার কনস্টেবলকে বলে, স্ট্যাম্প মারা বই সব বের করো।

কনস্টেবল পাহাড় ভাঙে। পাতা উল্টে স্ট্যাম্প খোঁজে। জঞ্জাল সরানোর কায়দায় নীচ থেকে ওপরে তোলে। মলাট খসে। ছেঁড়া পাতা উড়ে যায়। অসহায় কাতরতায় সুমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো মনে মনে কাঁদছে। কোনও প্রতিবাদ নেই দেখে আহত হচ্ছে।

উমাপতিরা মজা দেখে। নিজেদের মধ্যে মন্তব্য চালাচালি। সব লটের দরে কেনা। এত বই তো আগে দেখিনি। বাংলা বইও চুরি হয়েছে?

অফিসার উত্তর দেয় না। এগারোখানা রবার স্ট্যাম্প দেওয়া বই পাওয়া যায়। কোথাও বোধোদয় লাইব্রেরি, শহীদ নগর পাঠাগার, হারবার্ট কলিনস, হেমন্ত পুস্তকালয়, ম্যাসাচুসেট ইউনিভার্সিটি বা বাপুজি সংঘ। ইংরাজি নামের স্ট্যাম্প দেওয়া বই অফিসার নিয়ে বলে, এগুলো আমি সিজ করলাম। কাগজে লিখে উমাপতির হাতে দিয়ে বলে, সই করুন। আপনি উইটনেস।

না না, আমি ব্যস্ত মানুষ। কোর্ট কাছারি করার সময় পাব না। এনাকে দিন, বলে আমার দিকে কাগজ বাড়িয়ে দেয়।

বই কবে ফেরত পাব, আমি জানতে চাই।

থানা থেকে ইন্ট্যাক্ট ফেরত পাবেন, যদি চোরাই না হয়।

কোন থানা?

আমহার্স্ট ষ্ট্রিট। আপনি সঙ্গে চলুন। বলে সুমনকে ডাকে।

কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

থানায়।

কেন?

চুরি যাওয়া বই পাওয়া গেছে। ছাড়িয়ে আনতে হলে আপনারাও আসুন। বড়বাবুকে বলে জামিন করিয়ে নেবেন।

কিন্তু ওগুলো যে চুরি যাওয়া বই তার প্রমাণ?

প্রমাণ হবে আদালতে।

থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা গেলেও কোর্টকাছারি রোধ করা যায়নি। বছর দেড়েকের টানাপোড়েন। কাউন্সিলর এম এল এ-র কাছে ধর্না, উকিল মুহুরি হাজিরার হা পিত্যেশ। তবু শেষ রক্ষা হল না। অন্তত দুটি বই যে চোরাইয়ের অন্যতম সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত। চোরের অপরাধ কবুল, ফুটপাথের দোকানদারের স্বীকৃতি, নিরপরাধ অজ্ঞানতায় তার কাছ থেকে সুমনের বই কেনা এবং পার্ক লেনের বই বিক্রেতা হারবার্ট কলিনসের মালিকের শনাক্তকরণের ফলে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড।

মাঝে মাঝে দেখা করতে যাই। সুমনের কোনও বিমর্ষতা নেই। বরং বলে, আপনি কেন কষ্ট করে আসেন। এখানে আমার কোনও অসুবিধা নেই। জেলারকে বই চাইলে পড়তে দেয়। সারা রাত আলো জ্বলে। কেউ আলো নেবানোর কথা বলে না। অনেক রাত্রি পর্যন্ত পড়তে পারি।

বাইরে দাঁড়িয়ে আমি একা ভাবি, এই সংসারে কোনটা যে কার জেলখানা!

সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ মাঘ ১৪০৯ রবিবার ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৩

1 comment: