বৃদ্ধাশ্রম - অভিজিৎ তরফদার


বৃদ্ধাশ্রম
অভিজিৎ তরফদার

সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ছুটির দিনে দুপুরের জমাট ঘুম, সব উপেক্ষা করেও শান্তনু যে বেরিয়ে পড়ল তার প্রধান কারণ অবশ্যই উৎপল। বাবা মারা যাবার পর ভাগ-বাঁটোয়ারা শেষে দীপার প্রাপ্য যে দেড় কাঠা জমি পড়েছে, সেখানে তাড়াতাড়ি কিছু খাড়া না করতে পারলে জমিটা বেদখল হয়ে যাবে। অথচ, উঠে যাওয়ার মতো সামান্য একটা ষ্ট্রাকচারেও লাখ ছয়েকের ধাক্কা। অতএব উৎপলকে বধ করা ছাড়া উপায় নেই। উৎপল বেশ কিছু দিন ধরেই বলছে, রবিবার দেখে চলে আয়। আসার আগে একটা ফোন করে দিস। গেলে খারাপ লাগবে না। উৎপল নারাজ হলে, বলা তো যায় না, তার চেয়ে একটাই তো দিন, দিলই নাহয় উৎপলকে।

দ্বিতীয় কারণ, যে জন্য দীপার সঙ্গে শুকনো ঝগড়াও হয়ে গেল সাতসকালে, দীপার কাতুকাকা। দীপার সঙ্গে শান্তনুর ব্যাপারটায় যত দূর সম্ভব কাঠি করেছিলেন ভদ্রলোক। ষোলো বছরেও ভোলেনি শান্তনু। এখন বউ মরে যাবার পর, নিঃসন্তান কাতুকাকা যখন-তখন উদয় হন। গলায় মধু ঢেলে, ‘হ্যাঁ বাবা শান্তনু,’ বলতে বলতে দরজা ঠেলে ঢোকেন, মাংস-পরোটা না খেয়ে ওঠেন না। পিত্তি জ্বলে যায় শান্তনুর। আজ কাতুকাকা সন্ধেয় আসবেন, ফোনে খবর পাঠিয়েছেন। অতএব এই সুযোগ। রাগারাগির চোটে ছাতাটা ফেলে এল শান্তনু। অবশ্য বৃষ্টি ধরে গিয়েছে অনেক ক্ষণ। একটা রোদ গোছের লাজুক আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারারও চেষ্টা করছে।

উৎপল অপেক্ষা করছিল। ‘দেরি করে এলি, সন্ধ্যা হয়ে গেলে বেড়ানোটাই মাটি’, বলে গাড়ি স্টার্ট করল নিজেই। ‘ড্রাইভার রবিবার ছুটি নেয়, তা ছাড়া প্র্যাকটিসটা রাখা ভাল’, বলতে বলতে গড়িয়া পার হয়ে দক্ষিণে তুলে দিল গাড়ি।

কলকাতার এত কাছে এতখানি সবুজ? পাকা রাস্তা থেকে মোরামে উঠেছে গাড়ি। চাকার নীচে ভেজা মোরামের চপচপে আওয়াজ, ব্যাঙের ডাক, পাখির কিচির-মিচির। গাছের পাতায় বিকেলের আলোর পিছলে যাওয়া। পুকুরভর্তি পানা, শালুক ফুলের ফুটে থাকা। ভেজা মাটি, বুনো গাছগাছড়া, অজানা ফুল, উৎপলের ফ্রেঞ্চ পারফিউম; এক আশ্চর্য ককটেল। খানা-খন্দে পড়ে গাড়ি টাল খাচ্ছিল। শান্তনুর মনে হচ্ছিল এস্টিম নয়, মোষের গাড়িতে বসে দুই বন্ধু গ্রামের রাস্তায় অভিযানে বেরিয়েছে।

স্বপ্ন? যে-কোনও দিবাস্বপ্নের মতোই এটাও ছিঁড়ে গেল। সামনে পাঁচিল, পাঁচিলে গেট, গেটে লোহার দরজা। কেউ কি গাড়ির আওয়াজ পেয়েছিল? প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গেট খুলে গেল। উর্দি-পরা দারোয়ান ছাড়াও মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক গেট অবধি এসে সঙ্গ দিলেন। উৎপল আলাপ করিয়ে দিল, মহাদেববাবু, এখানকার কেয়ারটেকার।

ভেতরেও অনেকখানি ফাঁকা জায়গা, পুকুর, নারকোলগাছ, আমগাছ, তেঁতুলগাছ; এক পাশে কিচেন গার্ডেন। শেষে দোতলা বাড়ি, খুব পুরনো নয়, সামনে সিমেন্টের চাতাল, এক পাশে টিউবওয়েল।

মহাদেব ও উৎপলের কথা কানে আসছিল শান্তনুর।—‘জ্বর’, ‘ভুল বকছে’, ‘এখানে রাখা ঠিক হবে না’। উৎপল ডাক্তার। জেনারেল প্র্যাকটিশনার। ভাল প্র্যাকটিস। এই বৃদ্ধাশ্রমটায় রবিবার রবিবার আসে। ফ্রি-সার্ভিস? ও-ই বলতে পারবে।

চাতাল পার হয়ে দু’ধাপ সিঁড়ি, বাঁ দিকে অফিসঘর। শান্তনুকে বসিয়ে ফ্যান চালিয়ে মহাদেব উৎপলকে নিয়ে চলে গেলেন। টেবিল-চেয়ার কাঠের আলমারি ছাড়াও এক পাশে নেয়ারের খাট। মহাদেব কি এ ঘরেই রাত্রিবাস করেন?

বারান্দায় বেরিয়ে এল শান্তনু। টানা বারান্দার এক প্রান্তে বাথরুম। বারান্দার পাশে সারি সারি ঘর। বেশির ভাগই ভেতর থেকে বন্ধ। যে ঘরটার দরজা খোলা, দু’খানা রক্তহীন নির্লোম পা বারান্দায় ছড়ানো। শরীরটা যেহেতু ভেতরে, পায়ের মালিককে দেখা যাচ্ছে না। কোনও ঘরে বন্ধ দরজার আড়ালে ক্যাসেটে গান বাজছে। কান পাততে অবাক হয়ে গেল শান্তনু।—‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বলো তো’।
—না, এখানে রাখা ঠিক হবে না। তাড়াতাড়ি শিফ্‌ট করাই ভাল।
উৎপল। অন্যমনস্ক ছিল শান্তনু, দেখতে পায়নি। মহাদেববাবুও অফিসঘরে। গলা শোনা গেল।
—বাড়িতে তা হলে একটা খবর দিই।
—কোথায় খবর দেবেন? দুই ছেলেই তো বিদেশে।

চমকে উঠল শান্তনু। উঁকি মেরে দেখল। লাল পাড় সাদা শাড়ি, অভিজাত চেহারার এক ভদ্রমহিলা উৎপলের মুখোমুখি।
উৎপলকে হতাশ দেখাচ্ছিল, ‘কিন্তু এত জ্বর, কথাবার্তাও ঠিকঠাক বলছেন না। ভর্তি না করলে বিপদ হতে পারে।’
রেজিস্টার ওলটাচ্ছিলেন মহাদেব। পাতা খুঁজে একটা নম্বর বের করে ডায়াল করলেন। দু’তিন বার চেষ্টা করে নামিয়ে রাখলেন। ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হাওড়ার ও দিককার। কেউ ফোন ধরছে না’।

নম্বরটা জেনে নিয়ে উৎপলও ফোন করল। নো রিপ্লাই। ছেলেরা বাইরে থাকলেও তাদের নম্বর নিশ্চয়ই আছে। এক জনের পাওয়া গেল। উৎপল মোবাইল থেকে চেষ্টা করল। লাগল না। ভদ্রমহিলা উৎপলদের দেখছিলেন। বললেন, কী হল? বাড়ির কারওকে না পাওয়া গেলে অবিনাশবাবু এখানেই থাকবেন? চিকিৎসা হবে না?

কথা খুঁজছিল উৎপল। মহাদেব বললেন, ‘চিকিৎসা নিশ্চয়ই হবে। ওষুধপত্র যা এখানেই দেওয়া সম্ভব...’
—থামুন। ও সব আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। আটকাচ্ছে কোথায়? শুধু অনুমতি? নাকি টাকাপয়সাও?
—ধরুন দুটোই।

উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা। চেয়ার ঠেলে গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন। কিছু ক্ষণ পর একটা খাম এনে মহাদেবের হাতে দিয়ে বললেন, ‘পাঁচ হাজার আছে।’ তার পর উৎপলের দিকে তাকালেন চন্দ্রমল্লিকা। হ্যাঁ, মহাদেব একটু আগেই বলেছেন, উনি চন্দ্রমল্লিকা। ‘দেখবেন, চিকিৎসার যেন ত্রুটি না হয়।’

এ বারে উৎপল ড্রাউভ করছে। সামনের সিটে একা, পেছনে অবিনাশ চৌধুরী, আধশোয়া, শান্তনুর কোলে মাথা। বিরলকেশ মাথাটি আগুনের মতো গরম। হাতের পাতায় আটকে রেখেছে শান্তনু, যাতে গড়িয়ে না পড়ে যায়। বিড়বিড় করে কী সব বলার চেষ্টা করছেন অবিনাশ। ঘড়ঘড়ে গলার আওয়াজ, চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। একটা নোংরা গন্ধ বেরোচ্ছে অবিনাশের শরীর থেকে। উৎপলও নিশ্চয় পাচ্ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘কনট্রোল নেই, কাপড়েই সব করে ফেলছেন।’ গলা তুলে শান্তনু বলল, ‘এ সি অফ করে জানলাগুলো খুলে দিবি উৎপল?’

ছুটির দিন বলেই দ্রুত গাড়ি চালাতে পারছিল উৎপল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই একটা নার্সিংহোমে পৌঁছে গেল। ট্রলিতে অবিনাশকে তুলে পেছন পেছন ভেতরে গেল উৎপল। এ-দিক ও-দিক দেখতে দেখতে শান্তনু বুঝল, বাজেট নার্সিংহোম, খুব একটা খরচ পড়বে না। মাঝে এক বার লোডশেডিং হল। মশার কামড় খেতে খেতে শান্তনু যখন চলে আসবে কি না ভাবছে, উৎপল এল।

—আমাকে কিছু ক্ষণ থাকতে হবে মনে হচ্ছে রে। একা যেতে পারবি তুই?
ঘাড় নাড়ল শান্তনু। ‘কী মনে হচ্ছে, বাঁচবে?’
—দেখা যাক চেষ্টা করে।
উৎপল ফিরতে যাবে, সেলফোন বেজে উঠল।— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ভর্তি হয়ে গেছেন। ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। না না, এখুনি চিন্তার কিছু নেই। ঠিক আছে। আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব।’
শান্তনু দাঁড়িয়ে পড়েছিল। উৎপল হাসল, ‘চন্দ্রমল্লিকা।’

বেরিয়ে শান্তনু দেখল, টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি, মেঘ সন্ধ্যাকে ডেকে এনেছে তাড়াতাড়ি। রিকশা ধরে বাস রাস্তায় পৌঁছতে পৌঁছতে বৃষ্টি বাড়তে শুরু করল। মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানের পাশে গরম ফুলুরি ভাজা হচ্ছিল। পেটে আলসার ধরা পড়ার পর থেকে নিষিদ্ধ খাবারগুলোর প্রতি আসক্তি বেড়েছে শান্তনুর। আজও গুটি গুটি এগোচ্ছিল। হঠাৎ নজরে পড়ল যে বাসটা এখান থেকে সোজা বাড়ির চৌহদ্দি অবধি পৌঁছে দেবে, সেটারই একখানা ফাঁকা সংস্করণ বাস-স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে লোক ডাকাডাকি করছে। ছুটে গিয়ে নিজেকে গুঁজে দিল শান্তনু।

বসার জায়গা পেয়ে গেল, তবে পেছন দিকে। বেশিটাই বাইপাস ধরে দৌড়য়। অতএব ঝাঁকুনির আশঙ্কা কম। তেমন জোরে বৃষ্টি পড়ছে না যে, জানলা বন্ধ রাখতে হবে। পাশের ভদ্রলোককে বলে জানলা খুলে দিতেই ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখ মুখ জুড়িয়ে গেল। দিনটাকে চোখের সামনে মেলে ধরল শান্তনু।

আজ তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উৎপলকে খুশি করা। উৎপল কি খুশি হয়েছে? হয়েছে বোধহয়। উৎপলের অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকলে যা যা করত, শান্তনু তার চেয়ে কম কিছু করেনি। ধরাধরি করে গাড়িতে তুলেছে, ভারী মাথাটা কোলে নিয়ে বসে থেকেছে, যাতে পড়ে না যায় হাত দিয়ে আগলে রেখেছে, সিট থেকে ঝুলে পড়লে টেনে সোজা করেও দিয়েছে। আর এ সবই করেছে স্বেদ কফ মূত্র পুরীষ মিশ্রিত এক পূতিগন্ধের অনুষঙ্গে। ভাবতেই গন্ধটা নাকে উঠে এল শান্তনুর। মনটা সরাতে শান্তনু পথের দৃশ্যগুলো কল্পনা করার চেষ্টা করল। ব্যাঙের ডাক, শালুক ফুল, মাটির গন্ধ আসছে না, ব্যর্থ হয়ে বৃদ্ধাশ্রম, চন্দ্রমল্লিকা।

বৃদ্ধাশ্রমের দৃশ্যটা মনে পড়ল শান্তনুর। ব্যারাকের মতো সারি সারি ঘর। প্রত্যেক ঘরে এক জন করে বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা। রক্তহীন দু’খানা পা-ও নজরে পড়েছিল শান্তনুর। একটি গানের কলি ছাড়া সমস্তটাই মৃত্যুর মতো নিঃস্তব্ধ। শান্তনু নিশ্চিত, ওই গান বৃদ্ধাশ্রমের কোনও অর্বাচীন কর্মচারীর যন্ত্রপ্রসূত। জীবনের সমস্ত লক্ষণ ওই আশ্রমে অনুপস্থিত।

তা হলে চন্দ্রমল্লিকা কেন? এক জন মৃত্যুপথযাত্রী সহবাসীর অসুখে অতখানি উদ্বেগ? টাকা দিয়েই হাত মুছে ফেলেননি। পরে ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন। অবিনাশ কি চন্দ্রমল্লিকার প্রেমিক? বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার প্রেম! না কি তাঁরা পূর্বপরিচিত? চন্দ্রমল্লিকাই পারলেন মন থেকে মৃত্যুকে মুছে দিতে। ঘুমিয়ে পড়ল শান্তনু। ঘুম ভেঙে গেল তীক্ষ্ণ চিৎকারে, ‘ছাড়ুন, আমি কিন্তু লোক ডাকব।’ হঠাৎ ঘুম ভাঙলে যা হয়, শান্তনু প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। তার পর নিজেকে গুছিয়ে নিতে নিতে দেখল বাস প্রায় ফাঁকা, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি এবং ভেতরে অভিনীত হচ্ছে একটি পরিচিত নাট্যদৃশ্য।

যেহেতু মেয়েটি বসে আছে ড্রাইভারের পিছনের সিটে, একদম সামনে, সব কথা ভাল করে শোনা যাচ্ছিল না। টিমটিমে আলোয় ভাল করে দেখাও যাচ্ছিল না সকলকে। তবু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটি বাড়ি ফিরছে। আজকাল অনেক কল সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এমনকী অফিসও রবিবার খোলা থাকে। সে রকমই কিছুতে কাজ করে হয়তো। তিনটে ছেলে সুযোগ নেবার চেষ্টা করছে। সামনের জন পা ফাঁক করে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মেয়েটার কথায় হ্যা হ্যা করে হেসে এক পাক ঘুরে নিল। তার পর গলা তুলে বলল, ‘লোক? এই সব লোক? এই ঢ্যামনাগুলো? ডাক। যত জোরে পারিস ডাক। দেখি কে তোকে বাঁচাতে আসে।’

শান্তনু দেখল তার সহযাত্রীরা কেউ জানলার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বাইরেটা দেখতে ব্যস্ত, কেউ ঘুমের ভান করে নিমীলিত চক্ষু, কেউ বা পয়সা গুনে ভাড়া মিটিয়ে দেবার উদ্যোগ করছে।

শান্তনুর মনে পড়ল, তারও ভাড়া দেওয়া হয়নি। হাত নেড়ে কনডাকটরকে ডাকল। আর তখনই মনে হয় কোনও প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দেবার জন্য সামান্য থেমেছিল বাস, নিজের সিট থেকে ছিটকে উঠে দরজা দিয়ে নেমে গেল মেয়েটা।

একটা সমবেত আওয়াজ উঠল তিন জনের গলা থেকে। ‘রোককে রোককে’ বলতে বলতে ঘন্টি বাজিয়ে বাস স্লো করে ওরাও নেমে গেল পেছন পেছন। জানলার পাল্লা নামিয়ে শান্তনু দেখল, অন্ধকার রাস্তা, একটা দুটো দোকানের ঝাঁপ খোলা, রাস্তা জনমানবহীন, বৃষ্টি ঝরে চলেছে অঝোরে। ছাট আসছিল। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে বাইরের ভেতরে আসা আটকে দিল শান্তনু।

যেখানে নামবার কথা তার পরের স্টপে বাস থেকে নামল শান্তনু। উঠেছিল ঠিকঠাক, কিন্তু হাঁটু দুটোয় জোর এত কম, আর পা-দুখানা এত ভারী, পা টেনে টেনে দরজা অবধি পৌঁছতেই বাস এগিয়ে গেল।

নেমে প্রথমেই পেছন দিকে তাকাল শান্তনু। দূরে, যত দূর দেখা যায়, জমাট অন্ধকার। কান পাতল, শোনার চেষ্টা করল। কোনও একঘেয়ে আওয়াজ ছাড়া চার পাশ লক্ষণীয় রকম নিস্পন্দ। এক মুহূর্ত দাঁড়াল। তার পর নিজেকে বোঝাল, না, তার কিছু করবার নেই।

বড় রাস্তা নয়, নিজের অগোচরেই কখন গলির পথ ধরেছে, খেয়াল পড়ল যখন বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। আসতে আসতে মনে হল, বাসের পাঁচ জন সহযাত্রী, তারই মতো, কিছু ঘটে গেলে উঠে গিয়ে বাধা দিতে পারত মনে হয় না। সে দিক থেকে মেয়েটা ঠিকই করেছে। বড় রাস্তায়, হোক অন্ধকার, হোক বৃষ্টি, ডাক দিলে অন্তত জনা পঞ্চাশ লোক বেরিয়ে আসবেই। তা ছাড়া এই সময় পুলিশের হল্লাগাড়ি টহল দেয়। মুখোমুখি পড়ে গেলে ছেলেগুলো পালাতে পথ পাবে না। না, মেয়েটার বুদ্ধি আছে এবং এ যাত্রা বেঁচে গেল বলেই মনে হয়।

ভাবতে ভাবতেই শান্তনু দেখল পায়ের জোর ফিরে আসছে। বৃষ্টিতে ঠাণ্ডায় যে কাঁপুনিটা ভেতরে ভেতরে কাবু করে ফেলছিল, সেটাও অনেকখানি কমে গেল। দরজায় কড়া নাড়ার সময় তো দেখল, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। দরজা খুলল দীপা। মৌ? পায়ের কাঁপুনিটা ফিরে আসছে।

রান্নাঘরে ঢুকছিল দীপা। না ঘুরেই বলল, ‘নন্দিনীর বাড়ি গিয়েছিল। বৃষ্টিতে আটকে পড়েছে। রাত হয়ে গেছে। ফোন করে আসতে বারণ করে দিলাম।’ ভাল করে স্নান করল শান্তনু। মড়া ছুঁলে ছোটবেলায় মাথায় জল ঢেলে তবে বাড়িতে ঢুকতে দিত মা। মাথা মুছল শুকনো তোয়ালেতে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বুকের পাকা চুল গুনল। বেগুন ভাজা আর অমলেট দিয়ে একথালা খিচুড়ি সাঁটিয়ে মুখ ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টি কমেনি এতটুকু। কাল কলকাতা ভাসাবে। লাইটপোস্টগুলোর আলো একটু এগিয়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা কি বাড়ি ফিরে গেছে? চিন্তাটা সরাবার চেষ্টা করল শান্তনু।

চন্দ্রমল্লিকা, চন্দ্রমল্লিকা। মেয়েটাকে সরানোর একটাই উপায়, চন্দ্রমল্লিকা। কত বয়েস হবে চন্দ্রমল্লিকার? উনি কি বিবাহিতা? স্বামী বেঁচে আছেন চন্দ্রমল্লিকার? সিঁদুর ছিল কি? অবিনাশ চৌধুরী, পদবি লিখতে হয়েছিল রেজিস্টারে। চন্দ্রমল্লিকার পুরো নাম কী যেন? মহাদেব বলেছিলেন।

হঠাৎই গন্ধটা নাকে এল শান্তনুর। অবিনাশের গন্ধ। মৃত্যুর গন্ধ। এমনকী চন্দ্রমল্লিকাও তাড়াতে পারছেন না, এত তীব্র, এত বিস্তৃত সেই গন্ধের পরিধি। ঘরে ঢুকল শান্তনু। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাতে ক্রিম ঘষছিল দীপা। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শান্তনু, টানল নিজের দিকে। চুলের গন্ধ, ক্রিম, কসমেটিকস, পাউডারের গন্ধ।

শান্তনুর চুলে বিলি কাটতে কাটতে দীপা বলল, ‘রাগ করে বেরিয়ে গেলে, ছাতাটাও নিয়ে গেলে না। কাকভেজা হয়ে তো ফিরলে, এ বারে ঠাণ্ডা লাগিয়ে অসুখ না বাধাও। তা কোথায় যাওয়া হয়েছিল শুনি?’ দীপার স্তনসন্ধিতে মুখ ডুবিয়ে শান্তনু জবাব দিল, ‘ছাড়ো তো! উৎপলটার পাল্লায় পড়ে....। যত সব বুড়োবুড়িদের কাণ্ড!’

সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪ রবিবার ২৭ মে ২০০৭

0 comments:

Post a Comment