ভেজাল - বিমল মিত্র


ভেজাল
বিমল মিত্র

এতদিন সরষের তেলে ভেজাল চলছিল, ঘি-এ ভেজাল চলছিল, ওষুধে ভেজাল চলছিল। কোর্টে, কাছারিতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, সর্বত্র ভেজালে ভেজালে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার যা দেখলাম তারপর আমার বাকরোধ না হয়ে আর কোনও উপায় রইল না।

ছোটগল্প ছোটও হতে হবে আবার নাকি গল্পও হতে হবে। গল্পটা ছোট হল কিনা সেটা তবুও মেপে বলা সম্ভব, কিন্তু গল্প হল কিনা সেটা বিচার সাপেক্ষ। বিজ্ঞান যেমন অঙ্কঘটিত, গল্প তেমনি রস ঘটিত। অবশ্য অঙ্কেরও রস আছে। আমার এক অঙ্ক-রসিক বন্ধু আছে সে যখন কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন বিশ্রাম করবার জন্য অঙ্ক করতে বসে।

রস যে পায় সে পায়। মানে নিতে জানলে পাথর থেকেও রস নেয়া যায়। যেমন অশ্বত্থ গাছ। সঞ্জীবচন্দ্র পাহাড়ের ফাটলে সেই রকম একটা অশ্বত্থগাছকে জন্মাতে দেখে গাছটাকে খুব রসিকবলে ঠাউরেছিলেন। কিন্তু আমি জানি আর একটা অশ্বত্থ গাছকে। গাছটা আমাদের কার্নিসে জন্মেছিল। গাছটা দেখে সঞ্জীবচন্দ্রের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল স্বভাবতই। সত্যিই মনে হয়েছিল বাহাদুর গাছ বটে। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম গাছটা শুকিয়ে গেছে। সিমেন্ট-কংক্রিটের মধ্যে রস খুঁজতে গিয়ে বেচারি বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে।

বৈজ্ঞানিককে গালাগালি দেয়া শক্ত। কারণ বিজ্ঞান বুঝতে গেলে বোদ্ধাকে মোটামুটি বৈজ্ঞানিক হতে হবে। কিম্বা অন্য বৈজ্ঞানিকের সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু সাহিত্য বুঝতে গেলে বোদ্ধা না হলেও চলে। কারণ রস বোদ্ধা নিরঙ্কুশ! তিনি বলবেন-আমি রস পেলাম না মশাই, সুতরাং এটা নিরস বস্তু।

অর্থাৎ অশ্বত্থ গাছটা যে সিমেন্ট-কংক্রিটের মধ্যে বাঁচতে পারল না সেটা যেন অশ্বত্থ গাছের রসগ্রহণ অক্ষমতায় নয়, সিমেন্ট-কংক্রিটের নিরসতার দোষে!

ব্যাপারটা ঠিক এই রকম ঘটেছিল!

আমার বন্ধু বিশ্বনাথ তখন বোম্বাই-এর পুলিশের বড়কর্তা। বোম্বের মদ-চোলাই কারবার ধরার কাজের অফিসের হেড।

আমি জিজ্ঞেস করলাম-মদ খাওয়া বন্ধ করতে পেরেছ-টেরেছ কিছু?

বন্ধু বললে-পারব কি করে? পাবলিকের ভালর জন্যেই প্রোহিবিশনটা হয়েছে, অথচ পিপ্ লই সাপোর্ট করেছ না প্রোহিবিশন! এতে কখনও মদ খাওয়া বন্ধ করা যায় না?

বললাম- তুমি নিশ্চয় মদ খাও না?

প্যাটেল বললে -না ভাই, অতটা হিপোক্রিট এখনও হতে পারিনি-

-কিন্তু আমার যতদূর মনে পড়ে তোমার বাবা মদ খেতেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মদ খেয়ে গেছেন।

প্যাটেল বললে- এ তো ভারি আশ্চর্য। বাবা মদ খেয়েছেন বলে আমি মদের বিরুদ্ধে বলতে পারবো না?

-আলবৎ পারবে। তোমার বাবা মদ খেতেন বলে আরও জোর করে প্রতিবাদ করবে। হিটলারের বাবা মদ খেতেন বলেই হিটলার ছিল টিটোটেলার।

-তাহলে কি বলতে চাও?

বললাম- আমি বলতে চাই যে,তোমার চেয়ে আর বেশি ভাল করে কেউ জানে না যে মদের নেশা ছাড়া কত শক্ত!

প্যাটেল বললে- সেইজন্যেই তো আমরা পারমিটের ব্যবস্থা করেছি। যারা পুরোনো নেশাখোর, তাদের আমরা পারমিট দিই, সেই পারমিট দেখালে তারা একটা লিমিটেড কোয়ানটিটি লিকার পায়-

-তাতে কি তাদের চলে?

প্যাটেল বললে- চলে না তো বটেই। তবু নেই মামার চেয়ে কানা-মামা ভাল। একেবারে না খেতে পেলে তারা মারা যাবে, তাই এই ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা চাই দেশ থেকে মদ খাওয়া উঠে যাক। এতে অনেক টাকা রেভিনিউ বন্ধ হচ্ছে বটে কিন্তু মানুষের মর্যাল ভাল হচ্ছে।

বিশ্বনাথ প্যাটেলের বাবাকে আমরা দেখছি। নাগ পুরে বিশ্বনাথদের বহু পুরুষের বাস। গনেশপূজোর দিন বিরাট হৈ চৈ হত! সেদিন নাগপুরের গণ্যমান্য লোকদের নেমন্তন্ন হত তাদের বাড়িতে। বড়লোক মানুষ। বিশ্বনাথের বাবার ছিল ফরেস্ট। ফরেস্ট থেকে প্রচুর টাকা আমদানি হত। সেকালে সেই টাকায় সব রকম বাবুয়ানি করেও অপব্যয় করবার অনেক পয়সা থাকত।

আমরা দেখছি সেই সব মাতলামি। গণেশপূজোর সকাল থেকেই আসর বসতো গানের। এদিকে গানও চলছে, ওদিকে মদও চলছে। শেষকালের দিকে জ্ঞানও থাকত না বিশ্বনাথ প্যাটেলের বাবার। তখন বাড়ির উঠোনেই নাচতে আরম্ভ করতেন। বিরাট ভুঁড়িওয়ালা চেহারা। ধপ ধপ করছে গায়ের রং। গায়ের জামা তখন মাতলামির চোটে ছিঁড়ে গেছে। সেই ছেঁড়া জামা, পরণের ধুতি খসে যাচ্ছে, আর তিনি ধেই ধেই করে নেচে চলেছেন।

আমরা ছোটরা সবাই বারান্দার ভেতরে আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়োদের মাতলামি দেখে মজা পাচ্ছি আর হাসছি। বিশ্বনাথের মাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছেন। কিন্তু কিছু করবারও উপায় নেই।

চাকরটা উঠোনের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলছিল কর্তাবাবুর কাণ্ড দেখে।

বিশ্বনাথের মা আর থাকতে পারলেন না।

বললেন- এ্যায় ধনিয়া, দাঁত বার করে হাসছিস যে বড়? খুব মজা পেয়েছিস না? মজা দেখবার জন্য তোমাকে রাখা হয়েছে? দেখছিস না কর্তাবাবু মাতলামি করছে? কর্তাবাবুর কমরে কাপড়ের কষি খুলে যাচ্ছে, সেদিকে নজর নেই?

হঠাৎ কি যে হল কর্তাবাবুরও নেশা চটে গেল।

ডাকলেন এই ধনিয়া, দাঁত বার করে হাসছিস যে রড়, খুব মজা পেয়েছিস না? মজা দেখবার জন্য তোমাকে রাখ হয়েছে? দেখছিস্ না আমি মাতলামি করছি? আমার কাপড়ের কষি খুলে গেছে, নজরে পড়ছি না তোর?

ধনিয়া বহুদিন ধরে কর্তাবাবুর সেবা করিয়া আসছে। বাবুর কথায় লজ্জায় পড়ে গেল। কর্তাবাবু বললে- আমার মাথায় জল ঢাল বেটা, বালতি আন্-যা-

বিশ্বনাথের বাবার এ-সব কাণ্ড দেখে আমরা সবাই হাসাহাসি করছি বহুদিন। যে এ গল্প শুনেছে সে-ই হেসেছে। এবার সেই কর্তা বাবুর ছেলেকেই বোম্বেতে এসে মদ-খাওয়া বন্ধ করবার চাকরি করতে দেখে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

তা বিশ্বনাথ প্যাটেল সত্যিই ভাল ছেলে। আমাদের পাড়ায় যতগুলো ছেলে এক ক্লাশে পড়তাম, তাদের সকলের চেয়ে ভাল।

বিশ্বনাথ বললে- আসলে ভাই মন্দ কেউ খায় না, মদই সকলে খায়।

বললাম- সে আমি জানি। জানি বলেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। তুমি শেষকালে এই চাকরিতে ঢুকলে। এখানে কি তুমি কিছু কাজ দেখাতে পারবে?

বোধ হয় বিশ্বনাথের নিজের মনেও সন্দেহ ছিল। আর তাছাড়া চাকরি মানেই চাকরি। চাকরিতে তো বাছ-বিচার করার উপায় থাকে না সব সময়ে। বিশ্বনাথকেও নিজের অনিচ্ছাতে এই চাকরি নিতে হয়েছিল। কিন্তু বোম্বেতে এসে যে বিশ্বনাথের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, আর বিশ্বনাথের সঙ্গে দেখা হবার ফলে যে এমন একটা ছোট গল্প জুটে যাবে তা কল্পনা করতে পারিনি।

বোম্বেতে আমার এক দূর সম্পর্কের জ্যাঠাইমা থাকতেন। দূর সম্পর্কের হলেও এককালে জ্যাঠাইমার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমাকে নিজের ছেলের মত স্নেহ করতেন। আমাদের বিপদ-আপদের দিনে সাহায্য করেছেন। এখন অনেক বয়স হয়েছে। প্রায় আশি। কিন্তু তবুও স্বাস্থ্য ভাঙেনি। জ্যাঠাইমা এখনও ছোলা ভাজা মটর ভাজা খেতে পারতেন চিবিয়ে চিবিয়ে। বোম্বেতে জ্যাঠাইমার জামাই বিরাট বড়লোক ব্যবসায়ী। ভদ্রলোক মহারাষ্ট্রী। কীভাবে আমার জ্যাঠতুতো বোনের সঙ্গে কলেজে পড়তে পড়তে ভদ্রলোকের বিয়ে হয়ে যায়। তখন অবস্থা তত ভাল ছিল না তাদের। কিন্তু পরে আস্তে আস্তে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় হতে শুরু করে। তখন একটার পর একটা প্রপার্টি করতে আরম্ভ করে।

আমি এমনিতে হটেলেই উঠেছিলাম। জ্যাঠাইমার সঙ্গে দেখা করিনি। টেলিফোন করতেই জ্যাঠায়ইমা বললেন- তুই হটেলে উঠতে গেলি কেন?

আমার এখানে চলে আয়।

জ্যাঠাইমা যে-রকম করে হুকুম করলে তার পর আসমার আর হটেলে তাকা চললো না।

সেই দিন আমার ভগ্নিপতি গাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে তুলে নিয়ে আমাকে নিজের বাড়িতে তুললো। দিদি যদিও অবাঙালিকে বিয়ে করে ছিল, কিন্তু ভগ্নীপতিকে পুরো বাঙ্গালী করতে ভোলে নি। নামেই শুধু মিস্টার দেশপান্ডে, আসলে ভেতো বাঙ্গালি। চেহারা দেখে কে বলবে যে এই মানুষটাই হাজার হাজার লোক খাটিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন। বোম্বের কাপড়ের মিল আর শেয়ার মাকের্টটাই যেন মিস্টার দেশপান্ডে নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে পুরে ফেলেছে। সকাল থেকে যে সব লোক তার সঙ্গে দেখা করবার জন্য কিউ দেয় তা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। আর ওদিকে আমার দিদি বেশ স্বাচ্ছন্দে সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত দিন রান্নাঘরের ভেতরে কি অমানুষিক পরিশ্রম করে কেবল ভাল ভাল করে যায়।

মিস্টার দেশপাণ্ডে বললে- তোমার দিদির ওই কেমন শখ দেখ না কেবল রান্না, রান্না আর রান্না-

দিদির রান্নার বোধ হয় বাতিক ছিল।

বাড়িতে যে আসবে তাকে দিদি না খাইয়ে ছাড়বে না। শুধু খায়ানো নয়, খেতে হবে। রান্না কেমন হয়েছে বলতে হবে। আর একবার রান্নার প্রশংসা করলে তো আর কথায় নেই, বার বার খাইয়ে তার পেটে গ্যাসট্রিক-আলসার না ধরিয়ে দিয়ে আর তাকে ছাড়বে না।

আমি আমার জামাই বাবুর দিকে চেয়ে বললাম-আপনি? আপনার তো পেট ভাল রয়েছে। আপনার তো আলসার হয়নি?

দিদি বললে ওর-কথা ছেড়ে দাও-উনি কি এসব খান না কি? এসব ছঁয়ে দেখবে না-

-কেন? আলসারের ভয়ে?

জামাই বাবু হাসতে লাগলো। কিছু কথা বললেনা।

দিদি হাসতে হাসতে বললে- ওঁর পেটে কি আর খাবার জায়গা থাকে? সন্ধ্যে থেকেই চলে কিনা!

তা সত্যিই তাই। সন্ধে থেকেই তার বোতল আসে। সোডা আসে। যারা জামাই বাবুর বন্ধু তারাও খায়। দিদি তখন রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। যারা অতিথি তারাও খাবে। আর খাওয়াও সামান্য কিছু নয়। একেবারে পুরো ডিনার। টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই সংসারে। সুতরাং অঢেল খাওয়া। যে যত পারো খাও। দিদি যেমন খাওয়াতে ভালোবাসে অতিথিরও তেমনি কামাই নেই। ব্রেকফাস্টের সময় কেউ এলে সে ব্রেকফাস্ট খেয়ে যাবে। লাঞ্চের সময়ে লাঞ্চ, ডিনারের সময় ডিনার।

আর আমার জ্যাঠাইমা?

জ্যাঠায়ই থাকতো দোতলায়। দোতলায় শাশুড়ির জন্যে জামাইবাবু, এলাহি পুজোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সেখানে ছিল শাশুড়ির ঠাকুরঘর, গঙ্গাজলের জালা। কোষাকুষি। হরিণের চামড়ার আসন। শাঁখ, ধুপ-ধুনোর বন্দোবস্ত। সকাল থোকই উঠে জ্যাঠাইমা তার পুজোর যোগাড় নিয়ে ব্যস্ত। বেলা তিনটের সময় একমুঠো ভাত খেত। তাও নিরামিষ। আর রাত্রিটাও উপোস।

জ্যাঠাইমার ব্রহ্মচর্য ছিল বড় কঠোর। ওই এক মেয়ে নিয়ে জ্যাঠাইমা বিধবা হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে নাগপুরে দেখছি জ্যাঠাইমা ঠিক ওই রকম করে দিন কাটিয়েছে। জ্যাঠামশাই টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তাছাড়া বাড়ি-ভাড়ারও আয় ছিল। সে টাকা দিয়েই মেয়ে কলেজের হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করছে, এম.এ. পাশ করেছে। আর জ্যাঠাইমা তার গুরুদের নিয়ে মেতে দিন কাটিয়েছে।

জ্যাঠাইমা বললে- আমি বাবা ওদের কাছে খাইনে-

-কেন? খাওনা কেন তুমি?

জ্যাঠাইমা বললে- ওখেনে বড় নোংরা ওরা, কেবল মুগরী-টুরগী রাঁধে, ও-সব আমার ভাল লাগে না। গেলে আবার কাপড় কাচতে হবে তো-

ছোয়াছুঁয়ির বাতিকটা দেখলাম সেই রকমই আছে জ্যাঠাইমার।

জ্যাঠাইমা জিজ্ঞেস করলে- কদিন থাকবি বোম্বেতে?

বললাম কাজ হয়ে গেলেই চলে যাব-

-জন্মাষ্টমীর দিন থাকবি?

-কবে জন্মাষ্টমী?

-এই তো রবিবার। খুব ভাল করে ‘ঝলুন’ পুজো করি জন্মাষ্টমীর দিন। অনেক লোকজন আসবে, এবার নেমন্তন্ন করেছি কিনা, সবাই এখানে খাবে!

জিজ্ঞেস করলাম- তুমি এখানে এসেও সেই তখনকার মত পুজো-আচ্চা নিয়েই মেতে আছ জ্যাঠাইমা? তোমার দেখি কিছু বদলাই নি।

সত্যিই বয়স বাড়লেও চেহারা সেই আগের মতই আছে।

অদ্ভুদ সত্যবাদী ছিল জ্যাঠাইমা, একবার একটা সত্যি কথা বলার জন্যে একটা চল্লিশ হাজার টাকার সম্পত্তি হাত ছাড়া হয়ে যায়।

উকিল বলেছিল আপনার কিছু বলবার দরকার নেই, আপনি শুধু বলবেন যে, আমি এই সাক্ষ্যিকে চিনি- আর কিছু বলতে হবে না।

জ্যাঠাইমা বলেছিল আমি তাকে চিনি না।

-তা না চিনলেই বা, চিনি বলতে দোষ কী! আপনার চল্লিশ হাজার সম্পত্তিটা যে বেঁচে যাবে, সেটা ভাবছেন না?

জ্যাঠাইমা বলেছিল- না বাবা আমি বলতে পারব না, মিথ্যে কথা আমার আসে না-

-কিন্তু ভেবে দেখুন, চল্লিশ হাজার টাকার সম্পত্তিটা যে আপনার হাত ছাড়া হয়ে যাবে!

জ্যাঠাইমা বলেছিল- তা হোক বাবা, পরোলোকে গিয়ে কি আমি মিথ্যে বলে নরকে যাব?

তা সে সব কথা যাক, দেখলাম জামাই- এর বাড়িতে এসে জ্যাঠাইমার সে সভাব যায় নি। এখানেও সেই ধর্ম-কর্ম, এখানেও সে বাছ-বিচার, এখানেও সেই ন্যায়-অন্যায়, সত্যি-মিথ্যের মাপ কাঠি নিয়ে মাথা উঁচু করে দিন কাটাচ্ছে।

বললে- টাকাই থাকুক তোর আর যাই-থাকুক, আসলে তো সেই পাপ-পূণ্য নিয়ে পরকালে বিচার হবে তোর!

তা এর পরদিনই প্যাটেলের সঙ্গে রাস্তায় দেখা। আমাদের নাগপুরের বিশ্বনাথ প্যাটেল!

আর অনেক দিন পরে দেখা। সুতরাং ছাড়লে না। অফিসে টেনে নিয়ে গিয়ে অনেক গল্প করলে। বন্ধু-বান্ধব কি করলে জিজ্ঞাসা করলে। তারপর জিজ্ঞেস করলে-কোথায় উঠেছিস তুই?

বললুসম সব। মিস্টার দেশপাণ্ডের নাম শোনেন নি এমন লোক বোম্বেতে আর নেই তাও জানলাম।

বললাম এত তো তোদের প্রোহিবিশন, এত তো তোরা চেষ্টা করছিস, আমার ভগ্নিপতি তো মদ খায়, তার মদ খাওয়া তো বন্ধ করতে পারিসনি। তার মদ খাওয়া বন্ধ করতে পারলে বুঝতুম তোর কেরামতি!

বিশ্বনাথ বললে- আমি তো ভাই নতুন এখানে এসেছি, একবার দেখি চেষ্টা করে কিছু করতে পারি কি না! তারপর একটু থেমে বললে- আসলে কী হয়েছে জানিস, কারোর কোনো কো-অপারেশন পাচ্ছি না, গভর্নমেন্টে কেন সাহায্য করছে না, পাবলিকও না।

-কেন? গভর্নমেন্ট কেন সাহায্য করছেনা?

-গভর্নমেন্ট অফিসাররাও যে প্রায় সব মাতাল। সবাই মদ খায়। আমাদের ডিপার্টমেন্টের প্রায় সব পুলিশ অফিসারই যে খায়-কাকে বারণ করি! তা ছাড়া বেশি চেষ্টা করতে গেলে আমিই হয়ত কোনদিন খুন হয়ে যাব-

-কেন?

-পুলিশ যে বহু টাকা ঘুষ পায়! আমি বেশ বাড়াবাড়ি করলে তদের অনেক টাকা আয় কমে যাবে।

বলালাম- কিন্তু পাবলিক? পাবলিকের তো সাহায্য করা উচিত; তারা কেন কো-অপারেট করছে না?

বিশ্বনাথ বললে- সে অনেক কথা আছে ভাই, তোকে সে-সব কথা বলা যাবে না।

-কেন?

বিশ্বনাথ বললে-তবে দ্যাখ্, তোকে দেখাচ্ছি-

বললে বিশ্বনাথ একজন কনস্টেবলকে একটা ফাইল আনতে বললে। ফাইলটা দিয়ে চলে যেতেই বিশ্বনাথ আমাকে ফাইলটা দেখালে।

বললে-এই-দ্যাখ-কত লোকের মদের পারমিট দেয়া হয়েছে, তুই নিজে দ্যাখ-।

-আমি নাম গুলো পড়তে লাগলাম। অসংখ্য নামের লিস্ট। কাউকে চিনি না। তার মধ্যে আবার অনেক মেয়ের নাম রয়েছে। ডাক্তাররা যাদের সার্টিফিকেট দিয়েছে, তাদের মদের পারমিট দেয়া আছে। আমার ভগ্নিপতি দেশপাণ্ডের নামও দেয়া আছে তার মধ্যে।

বিশ্বনাথ বললে- এই মেয়েদের লিস্টটা দ্যাখ, এক দ্যাখ এক আশি বছরের বুড়ি সেও মদ খায়- কার কথা আর বলব? কার নামে বা দোষ দেব?

জিজ্ঞেস করলাম- কে?

বিশ্বনাথ বললে- এই যে মিসেস ভট্টাচার্য, বয়েস আশি,-

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। দেখলাম আমার জ্যাঠাইমার নাম। শ্রীমতী আরতিবালা ভট্টাচার্য, এজ্ এইট্টি, মাসে পনেরো বোতল-

আমি বললাম এই তো আমার জ্যাঠাইমা- একে যে আমি ভাল করে জানি-

বিশ্বনাথ বললে- তা জানিস, বেশ করিস, আমি নিজে গিয়ে এর এনকোয়ারি করেছি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম- আপনি মদ খান? তিনি বললেন-হ্যাঁ বাবা,আমি মদ খাই-

প্যাটেলের কথা শুনে আমি রেগে গেলাম। রেগে চেয়ার থেকে উঠে পড়লাম। বললাম- আর যার সম্বন্ধেই তুই বলিস আমার জ্যাঠাইমার সম্বন্ধে তুই ওকথা বলিসনি, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করব না- জানিস জ্যাঠাইমা চল্লিশ হাজার টাকার প্রপার্টি ছেড়ে দিয়েছে একটা সামান্য মিথ্যে না বলার জন্য!

বলে আর দাঁড়ালাম না। সেখান থেকে উঠে সোজা চলে এলাম জ্যাঠাইমার বাড়িতে।

জ্যাঠাইমা তখন পুজো করছিল। জন্মাষ্টমীর পুজো। জ্যাঠাইমার ঘরে তখন অনেক ভিড়। বোম্বের বিধবা মহিলাদের ভিড়। ব্রাহ্মণ পুরুত পুজো করছে। থরে থরে নৈবেদ্য সাজানো।

আমার কেমন জ্যাঠাইমাকে ভণ্ড মনে হল। মনে হল, এতদিন যা কিছু করে এসেছে জ্যাঠাইমা সব যেন লোক দেখানো।

আমি কিছু না বলে তেতলায় চলে এলাম। কিন্তু মনটা ছট্ ফট্ করতে লাগল। জ্যাঠাইমা কিনা মদ খায়! বাইরের এই পুজো, উপোস, একাদশী, বার-ব্রত সমস্ত কিছু তাহলে জ্যাঠাইমার ভণ্ডামি!

বেশিক্ষণ কিন্তু থাকতে পারলাম না। রাত হলে যখন সবাই বাড়ি চলে গেছে, তখন আমি দোতলায় নামলাম। দেখলাম, জ্যাঠাইমা তখন গুরুদেবের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করছে।

আমাকেই দেখে বলল- কিরে প্রসাদ খাবি?

বললাম- জ্যাঠাইমা, একটা কথা বলব, তুমি মদ খাও?

জ্যাঠাইমা হতবাক হয়ে চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর বললে- আমি মদ খাই? কে বললে তোকে?

-বলবে আবার কে? আমি পুলিশের খাতায় তোমার নাম দেখে এলুম। পনেরো বোতল মদ তোমার মাসে বরাদ্দ- ডাক্তার সার্টিফিকেট দিয়েছে।

-ও, তাই বল! বলে জ্যাঠাইমা হাসল।

-হাসছ কেন? খওনা তুমি?

জ্যাঠাইমা বললে-হ্যাঁ খাই-

বলে জ্যাঠাইমা একটু থামল! তারপর বললে-তা সে তো সবাই খায়-

-সবাই খাই? সবাই মানে?

-মানে সুরমাও খায়। বাড়িতে যে-যে আছে চাকর-বাকর-ঝি সবাই-ই খায়। সবাই পনের বোতল খায়।

-তার মানে?

জামাই পায় মাত্তোর পনেরো বোতল। পনেরো বোতলে কি চলে? তাই আমাদেরই সকলের নামে পারমিট আছে। পুলিশ এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল-আপনি মদ খান? আমি বলেছিলুম-হ্যাঁ-এই পর্যন্ত! পনেরো বোতলে যে জামাই-এর চলে না রে। তাই তো ওই মিথ্যে কথা বলতে হল আমাকে! চল্লিশ হাজার সম্পতির জন্য একদিন মিথ্যে কথা বলতে পারিনি, কিন্তু জামাই-এর জন্য মিথ্যে কথাটা বেমালুম বলে ফেললুম। কী করবো বল্ বাবা! নইলে যে জামাই-এর আমার শরীর খারাপ হয়ে যাবে! ও কি বাঁচবে?

জ্যাঠাইমার কথা শুনে বড় কষ্ট হল। ভাবলাম এ কী হল ইন্ডিয়ার। একজন খাঁটি মানুষও রইলনা আর। জ্যাঠাইমার মত মানুষকেও শেষকালে মিথ্যেবাদী বানিয়ে ছাড়লে! আশি বছরের বুড়ো জ্যাঠাইমাও ভেজাল হয়ে গেল। এর চেয়ে যদি জ্যাঠাইমা সত্যি-সত্যিই পনেরো বোতল মদ খেত, সে-ও যে ভাল ছিল।

পাদটীকা - সৈয়দ মুজতবা আলী


পাদটীকা
সৈয়দ মুজতবা আলী

গত শতকের শেষ আর এই শতকের গোড়ার দিকে আমাদের দেশের টোলগুলো মড়ক লেগে প্রায় সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যায়। পাঠান-মোগল আমলে যে দুর্দৈব ঘটেনি ইংরাজ রাজত্বে সেটা প্রায় আমাদেরই চোখের সামনে ঘটল। অর্থনৈতিক চাপে পড়ে দেশের কর্তাব্যক্তিরা ছেলে-ভাইপোকে টোলে না পাঠিয়ে ইংরেজি ইস্কুলে পাঠাতে আরম্ভ করলেন। চতুর্দিকে ইংরেজি শিক্ষার জয়-জয়কার পড়ে গেল—সেই ডামাডোলে টোল মরল, আর বিস্তর কাব্যতীর্থ বেদান্তবাগীশ না খেয়ে মারা গেলেন।

এবং তার চেয়েও হৃদয়বিদারক হলো তাঁদের অবস্থা, যাঁরা কোনো গতিকে সংস্কৃত, বাংলার শিক্ষক হয়ে হাই স্কুলগুলোতে স্থান পেলেন। এঁদের আপন আপন বিষয়ে অর্থাৎ, কাব্য, অলংকার, দর্শন ইত্যাদিতে এঁদের পাণ্ডিত্য ছিল অন্য শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি, কিন্তু সম্মান এবং পারিশ্রমিক এঁরা পেতেন সবচেয়ে কম। শুনেছি কোনো কোনো স্কুলে পণ্ডিতের মাইনে চাপরাশীর চেয়েও কম ছিল।

আমাদের পণ্ডিতমশাই তর্কালঙ্কার না কাব্যবিশারদ ছিলেন আমার আর ঠিক মনে নেই; কিন্তু এ কথা মনে আছে যে পণ্ডিতসমাজে তাঁর খ্যাতি ছিল প্রচুর এবং তাঁর পিতৃপিতামহ চতুর্দশ পুরুষ শুধু যে ভারতীয় সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন তা নয়, তাঁরা কখনো পরান্ন ভক্ষণ করেননি—পালপরব শ্রাদ্ধনিমন্ত্রণে পাত পাড়ার তো কথাই ওঠে না।

বাঙলা ভাষার প্রতি পণ্ডিতমশাইয়ের ছিল অবিচল, অকৃত্রিম অশ্রদ্ধা-ঘৃণা বললেও হয়তো বাড়িয়ে বলা হয় না। বাঙলাতে যেটুকু খাঁটি সংস্কৃত বস্তু আছে তিনি মাত্র সেইটুকু পড়াতে রাজি হতেন—অর্থাৎ কৃৎ, তদ্ধিত, সন্ধি এবং সমাস। তাও বাঙলা সমাস না। আমি একদিন বাঙলা রচনায় ‘দোলা-লাগা’, ‘পাখী-জাগা’ উদ্ধৃত করেছিলুম বলে তিনি আমার দিকে দোয়াত ছুড়ে মেরেছিলেন। ক্রিকেট ভালো খেলা—সে দিন কাজে লেগে গিয়েছিল। এবং তারপর মুহূর্তেই বি পূর্বক, আ পূর্বক, ঘ্রাধাতুকে উত্তর দিয়ে সংস্কৃত ব্যাঘ্রকে ঘায়েল করতে পেরেছিলুম বলে তিনি আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, ‘এই দণ্ডেই তুই স্কুল ছেড়ে চতুষ্পাঠীতে যা। সেখানে তোর সত্য বিদ্যা হবে।’

কিন্তু পণ্ডিতমশাই যত না পড়াতেন, তার চেয়ে বকতেন ঢের বেশি এবং টেবিলের উপর পা দু’খানা তুলে দিয়ে ঘুমুতেন সবচেয়ে বেশি। বেশ নাক ডাকিয়ে এবং হেডমাস্টারকে একদম পরোয়া না করে। কারণ হেডমাস্টার তাঁর কাছে ছেলেবেলায় সংস্কৃত পড়েছিলেন এবং তিনি যে লেখাপড়ায় সর্বাঙ্গনিন্দনীয় হস্তীমূর্খ ছিলেন সে কথাটি পণ্ডিতমশাই বারম্বার অহরহ সর্বত্র উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতেন। আমরা সে কাহিনী শুনে বিমলানন্দ উপভোগ করতুম, আর পণ্ডিতমশাইকে খুশি করবার পন্থা বাড়ন্ত হলে ঐ বিষয়টি নূতন করে উত্থাপন করতুম।

আমাকে পণ্ডিতমশাই একটু বেশি স্নেহ করতেন। তার কারণ বিদ্যাসাগরী বাঙলা লেখা ছিল আমার বাই; ‘দোলা-লাগা, ‘পাখী-জাগা’ই আমার বর্ণাশ্রম ধর্ম পালনে একমাত্র গোমাংস ভক্ষণ। পণ্ডিতমশাই যে আমাকে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন তার প্রমাণ তিনি দিতেন আমার উপর অহরহ নানাপ্রকার কটুকাটব্য বর্ষণ করে। ‘অনার্য’, ‘শাখামৃগ’, দ্রাবিড়সম্ভূত’ কথাগুলো ব্যবহার না করে তিনি আমাকে সাধারণত সম্বোধন করতেন না; তা ছাড়া এমন সব অশ্লীল কথা বলতেন যে তার সঙ্গে তুলনা দেবার মতো জিনিস আমি দেশ বিদেশে কোথাও শুনিনি। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে পণ্ডিতমশাই শ্লীল অশ্লীল উভয় বস্তুই একই সুরে একই পরিমাণে ঝেড়ে যেতেন, সম্পূর্ণ অচেতন, বীতরাগ এবং লাভালাভের আশা বা ভয় না করে! এবং তাঁর অশ্লীলতা মার্জিত না হলেও অত্যন্ত বিদগ্ধরূপেই দেখা দিত বলে আমি বহু অভিজ্ঞতার পর এখনো মনস্থির করতে পারিনি যে, সেগুলো শুনতে পেয়ে আমার লাভ না ক্ষতি, কোনটা বেশি হয়েছে।

পণ্ডিত মহাশয়ের বর্ণ ছিল শ্যাম। তিন মাসে একদিন দাড়ি-গোঁফ কামাতেন এবং পরতেন হাঁটু-জোকা ধুতি। দেহের উত্তমার্ধে একখানা দড়ি প্যাঁচানো থাকতো—অজ্ঞেরা বলত সেটা নাকি দড়ি নয়, চাদর। ক্লাসে ঢুকেই তিনি সেই দড়িখানা টেবিলের উপর রাখতেন, আমাদের দিকে রোষকষায়িত লোচনে তাকাতেন, আমাদের বিদ্যালয়ে না এসে যে চাষ করতে যাওয়াটা সমধিক সমীচীন সে কথাটা দ্বি’সহস্রবারের মতো স্মরণ করিয়ে দিতে দিতে পা দুখানা টেবিলের উপর লম্বমান করতেন। তারপর যে কোনো একটা অজুহাত ধরে আমাদের এক চোট বকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। নিতান্ত যে দিন কোনো অজুহাতই পেতেন না ধর্মসাক্ষী সে কসুর আমাদের নয়—সেদিন দু’চারটে কৃৎ-তদ্ধিত সম্বন্ধে আপন মনে—কিন্তু বেশ জোর গলায় আলোচনা করে উপসংহারে বলতেন; কিন্তু এই মূর্খদের বিদ্যাদান করবার প্রচেষ্টা বন্ধ্যাগমনের মতো নিষ্ফল নয় কি?’ তারপর কখনো আপন গতাসু চতুষ্পাঠীর কথা স্মরণ করে বিড়বিড় করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে অভিশাপ দিতেন, কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে টানাপাখার দিকে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘুমিয়ে পড়তেন।

শুনেছি, ঋগ্বেদে আছে, যমপত্নী যমী যখন যমের মৃত্যুতে অত্যন্ত শোকাতুরা হয়ে পড়েন তখন দেবতারা তাঁকে কোনো প্রকারে সান্ত্বনা না দিতে পেরে শেষটায় তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাই আমার বিশ্বাস পণ্ডিতমশায়ের টোল কেড়ে নিয়ে দেবতারা তাঁকে সান্ত্বনা দেবার জ্য অহরহ ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। কারণ এ রকম দিনযামিনী সায়ংপ্রাতঃ শিশিরবসন্তে বেঞ্চি চৌকিতে যতত্রত অকাতরে ঘুমিয়ে পড়তে পারাটা দেবতার দান—এ কথা অস্বীকার করার জো নেই।

বহু বৎসর হয়ে গিয়েছে, সেই ইস্কুলের সামনে সুরমা নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে; কিন্তু আজও যখন তাঁর কথা ব্যাকরণ সম্পর্কে মনে পড়ে তখন তাঁর যে ছবিটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটি তাঁর জাগ্রত অবস্থার নয়; সে ছবিতে দেখি, টেবিলের উপর দু’পা-তোলা, মাথা একদিকে ঝুলে পড়া টিকিতে দোলা-লাগা কাষ্ঠাসন শরশয্যায় শায়িত ভারতীয় ঐতিহ্যের শেষ কুমার ভীষ্মদেব। কিন্তু ছিঃ, আবার ‘দোলা-লাগা’ সমাস ব্যবহার করে পণ্ডিতমশায়ের প্রেতাত্মাকে ব্যথিত করি কেন?

সে সময়ে আসামের চিফ-কমিশনার ছিলেন এন ডি বিটসন বেল। সাহেবটির মাথায় একটু ছিট ছিল। প্রথম পরিচয়ে তিনি সবাইকে বুঝিয়ে বলতেন যে তার নাম, আসলে ‘নন্দদুলাল বাজায় ঘণ্টা’। ‘এনডি’তে হয় ‘নন্দদুলাল’ আর বিটসন বেল অর্থ ‘বাজায় ঘণ্টা’—দুয়ে মিলে হয় ‘নন্দদুলাল বাজায় ঘণ্টা’।

সেই নন্দদুলাল এসে উপস্থিত হলেন আমাদের শহরে।

ক্লাসের জ্যাঠা ছেলে ছিল পদ্মলোচন। সেই একদিন খবর দিল লাট সাহেব আসছেন স্কুল পরিদর্শন করতে—পদ্মর ভগ্নিপতি লাটের টুর ক্লার্ক না কি, সে তাঁর কাছ থেকে পাকা খবর পেয়েছে।

লাটের ইস্কুল আগমন অবিশ্রিত আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা নয়। একদিক দিয়ে যেমন বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ কসুর বিনা-কসুরে লাট আসার উত্তেজনায় খিটখিটে মাস্টারদের কাছ থেকে কপালে কিলটা চড়টা আছে, অন্যদিকে তেমনি লাট চলে যাওয়ার পর তিন দিনের ছুটি।

হেডমাস্টারের মেজাজ যখন সক্কলের প্রাণ ভাজা ভাজা করে ছাই বানিয়ে ফেলার উপক্রম করেছে এমন সময় খবর পাওয়া গেল, শুক্কুরবার দিন হুজুর আসবেন।

ইস্কুল শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা আগে আমরা সেদিন হাজিরা দিলুম। হেডমাস্টার ইস্কুলের সর্বত্র চড়কিবাজীর মতন তুর্কি-নাচন নাচছেন। যেদিকে তাকাই সে দিকেই হেডমাস্টার। নিশ্চয়ই তাঁর অনেকগুলো যমজ ভাই আছেন, আর ইস্কুল সামলাবার জন্য সেদিন সব কজনকে রিকুইজিশন করে নিয়ে এসেছেন।

পদ্মলোচন বললে, ‘কমন রুমে গিয়ে মজাটা দেখে আয়।’

‘কেন, কী হয়েছে?’

‘দেখেই আয় না ছাই।’

পদ্ম আর যা করে করুক কখনো বাসি খবর বিলোয় না। হেডমাস্টারের চড়ের ভয় না মেনে কমন রুমের কাছে গিয়ে জানলা দিয়ে দেখি, অবাক কাণ্ড! আমাদের পণ্ডিত মশাই একটা লম্বা হাতা আনকোরা নূতন হলদে রঙের গেঞ্জি পরে বসে আছেন আর বাদবাকি মাস্টাররা কলরব করে সে গেঞ্জিটার প্রশংসা করছেন। নানা মুনি নানা গুণকীর্তন করছেন; কেউ বলছেন, পণ্ডিতমশাই কি বিচক্ষণ লোক, বেজায় সস্তায় দাও মেরেছে (গাঁজা, পণ্ডিতমশায়ের সাংসারিক বুদ্ধি একরত্তি ছিল না), কেউ বলছেন আহা, যা মানিয়েছে (হাতী, পণ্ডিতমশাইকে সার্কাসের সঙের মতো দেখাচ্ছিল), কেউ বলছেন, যা ফিট করেছে (মরে যাই, গেঞ্জির আবার ফিট অফিট কি?)।

শেষটায় পণ্ডিতমশায়ের ইয়ার মৌলভী সায়েব দাড়ি দুলিয়ে বললেন, ‘বুঝলে ভশ্চাচ, এ রকম উমদা গেঞ্জি স্রেফ দু’খানা তৈরি হয়েছিল, তারই একটা কিনেছিল পঞ্চম জর্জ, আর দুসরাটা কিনলে তুমি। এ দুটো বানাতে গিয়ে কোম্পানি দেউলে হয়ে গিয়েছে, আর কারো কপালে এ রকম গেঞ্জি নেই।’

চাপরাশী নিত্যানন্দ দূর থেকে ইশারায় জানাল, ‘বাবু আসছেন।’

তিন লম্ফে ক্লাসে ফিরে গেলুম।

সেকেন্ড পিরিয়ডে বাঙলা। পণ্ডিতমশাই আসতেই আমরা সবাই ত্রিশ গাল হেসে গেঞ্জিটার দিকে তাকিয়ে রইলুম। ইতিমধ্যে রেবতী খবর দিল যে শাস্ত্রে সেলাই করা কাপড় পরা বারণ বলে পণ্ডিতমশাই পাঞ্জাবী শার্ট পরেন না; কিন্তু লাট সায়েব আসছেন, শুধু গায়ে ইস্কুল আসা চলবে না, তাই গেঞ্জি পরে এসেছেন। গেঞ্জি বোনা জিনিস, সেলাই করা কাপড়ের পাপ থেকে পণ্ডিতমশাই কৌশলে নিষ্কৃতি পেয়েছেন।

গেঞ্জি দেখে আমরা এতই মুগ্ধ যে পণ্ডিতমশায়ের গালাগাল, বোয়াল-চোখ সব কিছুর জন্যই আমরা তখন তৈরি কিন্তু কেন জানিনে তিনি তাঁর রুটিন মাফিক কিছুই করলেন না। বকলেন না, চোখ লাল করলেন না, লাট আসছেন, কাজেই টেবিলে ঠ্যাং তোলার কথাও উঠতে পারে না। তিনি চেয়ারের উপর অত্যন্ত বিরস বদনে বসে রইলেন।

পদ্মলোচনের ডর ভয় কম। আহ্লাদে ফেটে গিয়ে বলল, ‘পণ্ডিতমশাই, গেঞ্জিটা কদ্দিয়ে কিনলেন?’ আশ্চর্য, পণ্ডিতমশাই খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলেন না, নির্জীব কণ্ঠে বললেন, ‘পাঁচ সিকে।’

আধ মিনিট যেতে না যেতেই পণ্ডিতমশাই দুহাত দিয়ে ক্ষণে হেথায় চুলকান ক্ষণে হোথায় চুলকান। পিঠের অসম্ভব অসম্ভব জায়গায় কখনো ডান হাত, কখনো বাঁ হাত দিয়ে চুলকানোর চেষ্টা করেন, কখনো মুখ বিকৃত করে গেঞ্জির ভিতর হাত চালান করে পাগলের মতো এখানে ওখানে খ্যাঁস খ্যাঁস করে খামচান।

একে তো জীবন-ভর উত্তমাঙ্গে কিছু পরেননি, তার উপর গেঞ্জি, সেও আবার একদম নূতন কোরা গেঞ্জি।

বাচ্চা ঘোড়ার পিঠে পয়লা জিন লাগালে সে যে-রকম আকাশের দিকে দু’পা তুলে তড়পায়, শেষটায় পণ্ডিতমশায়ের সেই অবস্থা হলো। কখনো করুণ কণ্ঠে অস্ফুট আর্তনাদ করেন, ‘রাধামাধব, এ কী গব্ব-যন্তণা, কখনো এক হাত দিয়ে আরেক হাত চেপে ধরে, দাঁত কিড়মিড় খেয়ে আত্মসম্বরণ করার চেষ্টা করেন—লাট সায়েবের সামনে তো সর্বাঙ্গ আঁচড়ানো যাবে না।

শেষটায় থাকতে না পেরে আমি উঠে বললুম, ‘পণ্ডিত মশাই, আপনি গেঞ্জিটা খুলে ফেলুন। লাট সায়েব এলে আমি জানলা দিয়ে দেখতে পাব। তখন না হয় ফের পরে নেবেন।’

বললেন, ‘ওরে জড়ভরত, গব্ব-যন্তণাটা খুলছি নে, পরার অভ্যেস হয়ে যাবার জন্য।’ আমি হাত জোড় করে বললুম, ‘একদিনে অভ্যেস হবে না পণ্ডিতমশাই, ওটা আপনি খুলে ফেলুন।’

আসলে পণ্ডিতমশাইয়ের মতলব ছিল গেঞ্জিটা খুলে ফেলারই; শুধু আমাদের কারো কাছ থেকে একটু মরাল সাপোর্টের অপেক্ষায় এতক্ষণ বসে ছিলেন। তবু সন্দেহ ভরা চোখে বললেন, ‘তুই তো একটা আস্ত মর্কট—শেষটায় আমাকে ডোবাবি না তো? তুই যদি হুঁশিয়ার না করিস, আর লাট যদি এসে পড়েন?’

আমি ইহলোক পরলোক সর্বলোক তুলে দিব্যি, কিরে, কসম খেলুম।

পণ্ডিতমশাই গেঞ্জিটা খুলে টেবিলের উপর রেখে সেটার দিকে যে দৃষ্টি হানলেন, তাঁর টিকিটি কেউ কেটে ফেললেও তিনি তার দিকে এর চেয়ে বেশি ঘৃণা মাখিয়ে তাকাতে পারতেন না। তারপর লুপ্তদেহটা ফিরে পাওয়ার আনন্দে প্রাণভরে সর্বাঙ্গ খামচালেন। বুক পিঠ ততক্ষণে বেগ্নি রঙের আঁজিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছে।

এরপর আর কোনো বিপদ ঘটল না। পণ্ডিতমশাই থেকে থেকে রাধামাধবকে স্মরণ করলেন, আমি জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলুম, আর সবাই গেঞ্জিটার নাম, ধাম, কোন দোকানে কেনা, সস্তা না আক্রা, তাই নিয়ে আলোচনা করল।

আমি সময়মতো ওয়ার্নিং দিলুম। পণ্ডিতমশাই আবার তাঁর ‘গব্বযন্তণাটা’ উত্তমাঙ্গে মেখে নিলেন।

লাট এলেন; সঙ্গে ডেপুটি কমিশনার, ডাইরেক্টর, ইনসপেক্টর, হেডমাস্টার, নিত্যানন্দ—আর লাট সায়েবের এডিসি ফেডিসি না কি সব বারান্দায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ‘হ্যালো পানডিট’ বলে সায়েব হাত বাড়ালেন। রাজসম্মান পেয়ে পণ্ডিতমশায়ের সর্ব যন্ত্রণা লাঘব হলো। বারবার ঝুঁকে ঝুঁকে সায়েবকে সেলাম করলেন—এই অনাদৃত পণ্ডিত শ্রেণী সামান্যতম গতানুগতিক সম্মান পেলেও যে কি রকম বিগলিত হতেন তা তাঁদের সে সময়কার চেহারা না দেখলে অনুমান করার উপায় নেই।

হেডমাস্টার পণ্ডিতমশায়ের কৃৎ-তদ্ধিতের বাই জানতেন, তাই নির্ভয়ে ব্যাকরণের সর্বোচ্চ নভঃস্থলে উড্ডীয়মান হয়ে বিহঙ্গ’ শব্দের তত্ত্বানুসন্ধান করলেন। আমরা জন দশেক এক সঙ্গে চেঁচিয়ে বললুম, ‘বিহায়স পূর্বক গম ধাতু খ’ লাট সায়েব হেসে বললেন, ‘ওয়ান এ্যাট ও টাইম, প্লিজ’। লাট সাহেব আমাদের বলল, ‘প্লিজ একি কাণ্ড।’ তখন আবার আর কেউ রা কাড়ে না। হেডমাস্টার শুধালেন ‘বিহঙ্গ’, আমরা চুপ, —তখনো প্লিজের ধকল কাটেনি। শেষটায় ব্যাকরণে নিরেট পাঁঠা যতেটা আমাদের উত্তর আগ শুনে নিয়েছিল বলে ক্লাসে নয়, দেশে নাম করে ফেলল—আমরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম।

লাট সায়েব ততক্ষণে হেডমাস্টারের সঙ্গে ‘পণ্ডিত’ শব্দের মূল নিয়ে ইংরেজিতে আলোচনা জুড়ে দিয়েছেন। হেডমাস্টার কি বলেছিলেন জানিনে, তবে রবীন্দ্রনাথ নাকি পণ্ডিতদের ধর্মে জয়শীলতার প্রতি বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, যার সব কিছু পণ্ড হয়ে গিয়েছে সেই পণ্ডিত!

ইংরেজ শাসনের ফলে আমাদের পণ্ডিতদের সর্বনাশ, সর্বস্ব পণ্ডের ইতিহাস হয়তো রবীন্দ্রনাথ জানতেন না,—না হলে ব্যঙ্গ করার পূর্বে হয়তো একটু ভেবে দেখতেন।

সে কথা থাক। লাট সায়েব চলে গিয়েছেন, যাবার পূর্বে পণ্ডিতমশায়ের দিকে একখানা মোলায়েম নড করাতে তিনি গর্বে চৌচির হয়ে ফেটে যাবার উপক্রম। আনন্দের আতিশয্যে নতুন গেঞ্জির চুলকুনির কথা পর্যন্ত ভুল গিয়েছেন। আমরা দু তিনবার স্মরণ করিয়ে দেবার পর গেঞ্জিটা তাঁর শ্রীঅঙ্গ থেকে ডিগ্রেডেড হলো।

তিন দিন ছুটির পর ফের বাঙলা ক্লাস বসেছে। পণ্ডিতমশাই টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে ঘুমুচ্ছেন, না শুধু চোখ বন্ধ করে আছেন ঠিক ঠাহর হয়নি বলে তখনো গোলমাল আরম্ভ হয়নি।

কারো দিকে না তাকিয়েই পণ্ডিতমশাই হঠাৎ ভরা মেঘের ডাক ছেড়ে বললেন, ‘ওরে ও শাখামৃগ!’

নীল যাহার কণ্ঠ তিনি নীলকণ্ঠ—যোগরূঢ়ার্থে শিব। শাখাতে যে মৃগ বিচরণ করে সে শাখামৃগ, অর্থাৎ বাঁদর-ক্লাসরূঢ়ার্থে আমি। উত্তর দিলুম, ‘আজ্ঞে।’

পণ্ডিতমশাই শুধালেন, ‘লাট সায়েবের সঙ্গে কে কে এসেছিল বল তো রে।’

আমি সম্পূর্ণ ফিরিস্তি দিলুম। চাপরাশী নিত্যানন্দকেও বাদ দিলুম না।

বললেন, ‘হলো না। আর কে ছিল?’ বললুম ‘ঐ যে বললুম, এক গাদা এডিসি না প্রাইভেট সেক্রেটারি না আর কিছু সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা তো ক্লাসে ঢোকেননি’।

পণ্ডিতমশাই ভরা মেঘের গুরু গুরু ডাক আরো গম্ভীর করে শুধালেন, ‘এক কথা বাহান্ন বার বলছিস কেন রে মূঢ়? আমি কালা না তোর মতো অলম্বুষ?’

আমি কাতর হয়ে বললুম, আর তো কেউ ছিল না পণ্ডিতমশাই, জিজ্ঞেস করুন না পদ্মলোচনকে, সে তো সবাইকে চেনে?’

পণ্ডিতমশাই হঠাৎ চোখ মেরে আমার দিকে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘ওঃ, উনি আবার লেখক হবেন। চোখে দেখতে পাসনে, কানা, দিবান্ধ-রাত্র্যন্ধ হলেও না হয় বুঝতুম। কেন? লাট সায়েবের কুকুরটাকে দেখতে পাসনি? এই পর্যবেক্ষণ শক্তি নিয়ে—

আমি তাড়াতাড়ি বললুম, ‘হাঁ, হাঁ, দেখেছি। ও তো এক সেকেন্ডের তরে ক্লাসে ঢুকেছিল।’

পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘মর্কট এবং সারমেয় কদাচ এক গৃহে অবস্থান করে না। সে কথা যাক। কুকুরটার কি বৈশিষ্ট্য ছিল বল তো?’

ভাগ্যিস মনে পড়ল। বললুম, আজ্ঞে, একটা ঠ্যাং কম ছিল বলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল।’

‘হুঁ’ বলে পণ্ডিতমশাই আবার চোখ বন্ধ করলেন।

অনেকক্ষণ পর বললেন, ‘শোন। শুক্রবার দিন ছুটির পর কাজ ছিল বলে অনেক দেরিতে ঘাটে গিয়ে দেখি আমার নৌকার মাঝি এক অপরিচিতের সঙ্গে আলাপ করছে। লোকটা মুসলমান, মাথায় কিস্তিটুপী। আমাকে অনেক সেলাম টেলাম করে পরিচয় দিল, সে আমাদের গ্রামের মিম্বর উল্লার শালা; লাট সায়েবের আরদালি, সায়েবের সঙ্গে এখানে এসেছে, আজকের দিনটা ছুটি নিয়েছে তার দিদিকে দেখতে যাবে বলে। গাটে আর নৌকা নেই। আমি যদি মেহেরবানি করে একটু স্থান দিই।’

পণ্ডিতমশায়ের বাড়ি নদীর ওপারে, বেশ খানিকটা উজিয়ে। তাই তিনি বর্ষাকালে নৌকোয় যাতায়াত করতেন আর সকলকে অকাতরে লিফট দিতেন।

পণ্ডিতমশায় বললেন, ‘লোকটার সঙ্গে কতাবার্তা হলো। লাট সায়েবের সব খবর জানে, তোর মতো কানা নয়, সব জিনিস দেখে, সব কথা মনে রাখে। লাট সায়েবের কুকুরটার একটা ঠ্যাং কি করে ট্রেনের চাকায় কাটা যায় সে খবরটাও বেশ গুছিয়ে বলল।’

তারপর পণ্ডিতমশাই ফের অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর আপন মনে আস্তে আস্তে বললেন, ‘আমি, ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী একুনে আমরা আটজনা।’

তারপর হঠাৎ কথা ঘুরিয়ে ফেলে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মদনমোহন কি রকম আঁক শেখায় রে?’

মদনমোহনবাবু আমাদের অঙ্কের মাস্টার—পণ্ডিতমশায়ের ছাত্র। বললুম, ‘ভালই পড়ান।’

পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘বেশ বেশ! তবে শোন। মিম্বর উল্লার শালা বলল, লাট সায়েবের কুত্তাটার পিছনে মাসে পঁচাত্তর টাকা খরচা হয়। এইবার দেখি, কি রকম আঁক শিখেছিস। বলতো দেখি, যদি একটা কুকুরের পেছনে মাসে পঁচাত্তর টাকা খরচ হয়, আর সে কুকুরের তিনটে ঠ্যাং হয় তবে ফি ঠ্যাঙের জন্য কত খরচ হয়?’

আমি ভয় করছিলুম পণ্ডিতমশাই একটা মারাত্মক রকমের আঁক কষতে দেবেন। আরাম বোধ করে তাড়াতাড়ি বললুম, ‘আজ্ঞে, পঁচিশ টাকা।’ পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘সাধু, সাধু!’

তারপর বললেন, ‘উত্তম প্রস্তাব। অপিচ আমি, ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী একুনে আটজন। আমাদের সকলের জীবন ধারণের জন্য আমি মাসে পাই পঁচিশ টাকা। এখন বল তো দেখি, তবে বুজি তোর পেটে কত বিদ্যে, এই ব্রাহ্মণ পরিবার লাট সায়েবের কুকুরের ক’টা ঠ্যাঙের সমান?’

আমি হতবাক।

‘বল না।’

আমি মাথা নীচু করে বসে রইলুম। শুধু আমি না, সমস্ত ক্লাস নিস্তব্ধ।

পণ্ডিতমশাই হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘উত্তর দে।’

মূর্খের মতো একবার পণ্ডিতমশায়ের মুখের দিকে মিটমিটিয়ে তাকিয়েছিলুম। দেখি, সে মুখ লজ্জা, তিক্ততা, ঘৃণায় বিকৃত হয়ে গিয়েছে।

ক্লাসের সব ছেলে বুঝতে পেরেছে—কেউ বাদ যায়নি—পণ্ডিতমশাই আত্ম অবমাননার কি নির্মম পরিহাস সর্বাঙ্গে মাখছেন, আমাদের সাক্ষী রেখে।

পণ্ডিতমশাই যেন উত্তরের প্রতীক্ষায় বসেই আছেন। সেই জগদ্দল নিস্তব্ধতা ভেঙে কতক্ষণ পরে ক্লাস শেষের ঘণ্টা বেজেছিল আমার হিসেব নেই।

এই নিস্তব্ধতার নিপীড়নস্মৃতি আমার মন থেকে কখনো মুছে যাবে না।

‘নিস্তব্ধতা হিরণ্ময়’ ‘Silence is golden’ যে মূর্খ বলেছে তাকে যেন মরার পূর্বে একবার একলা-একলি পাই।

বইপোকা - কানাই কুণ্ডু


বইপোকা
কানাই কুণ্ডু

বইপোকারা বই পড়ে না। চশমাও পরে না। এটা জেনেও সবাই সুমনকে কেন যে বইপোকা বলে! সুমন বই খায় না, পড়ে।মানুষের নানা অভ্যেস থাকে। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, সিনেমা দেখে, বেড়াতে যায়, খেতে ভালবাসে, রুস্তমি করে, পাড়ার দাদা হয়। আবার কেউ গান গায়, গপ্পো কবিতা লেখে, নাটক করে, সংসারও করে। সুমন এ সব কিছুই করে না, পড়ে। যত পুরনো তত আগ্রহ। এই অভ্যেসে সে কলেজ ষ্ট্রিট যায়, শ্যামবাজার, চৌরঙ্গি পাড়া, ফ্রি স্কুল ষ্ট্রিট বা গোলপার্ক। ফুটপাথে বিছানো নানা নতুন পুরনো বই। নতুনে সুমনের আগ্রহ নেই। কেবল পুরনো খোঁজে। মলাট ফর্দাফাই। হলদেটে পাতা পোকায় কুটো করা। টাইটেল পেজ নেই। নেই লেখকের নাম বা শেষের পাতা। অথবা ছেঁড়া পাতা সেলোটেপে জড়ানো।

এ ভাবেই ডিফো সুইফট ব্রন্টি থেকে শলোকভ টলস্টয়। পদাবলি থেকে মধুসূদন হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্র বিহারীলাল অক্ষয়কুমার বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র তারকনাথ। অথবা হোমার বায়রন টেনিসন। এর আগে এগোয় না। পরের প্রজন্মের লেখকদের বই পুরনো হলেও দাম বেশি। ব্যতিক্রম কেবল উইয়ের মানচিত্র আঁকা একটি সঞ্চয়িতা। সুমনের মাসিক বরাদ্দ চল্লিশ টাকা। চার-পাঁচটার বেশি হয় না। আজকাল দাম আরও চড়ছে। সুমন পাঁচেই সন্তুষ্ট। এতেই একটা মাস কেটে যায়। শেষের দিকে ফাঁকা থাকলে আগের কেনা বই ওল্টায়।

সকালের এজমালি কাগজ হাতে আসতে সাড়ে আট। তাও পাতা ভাগ করে পড়তে নটা। কেউ কেউ আলাদা কাগজ নেয়। আমার রুমের নতুন ছোকরা জয়ন্ত নেয় টেলিগ্রাফ। বিজ্ঞাপন দেখে চাকরি বদল করে। বামার গপ্পো বাতিক আছে। সে নেয় আনন্দবাজার। নটার পরে নীচতলার চৌবাচ্চায় স্নান ইত্যাদির হুড়োহুড়ি। দু’ মুঠো গিলে বেরিয়ে পড়া।

সুমন দশটায় তৈরি হয়। আগে পরের ঝগড়া নেই, নির্বিকার। বি বি গাঙ্গুলি ধরে হেঁটে বি বা দী বাগ। একই চেয়ার টেবলে এক খাতা থেকে অন্য খাতায় টোকাটুকিতে একুশটা বছর। অথচ এরই জন্যে গ্রাজুয়েশনে প্রথম বিভাগ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা! ছুটির পর আবার হাঁটতে হাঁটতে নানা বইয়ের খোঁজ খবর। তালিকা তৈরি। মাসের মাইনে পেলে এক সপ্তাহ ধরে কেনাকাটা। দোকানদাররা তাকে চেনে। পুরনো বই তুলে রাখে। সুমনের পছন্দ না হলে অন্য খদ্দেরকে বিক্রি করে।

একবার কেনাকাটায় তার সঙ্গী ছিলাম। ভাইঝি যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য পড়ে। বাইরনের বই দরকার। সুমন বুদ্ধি দিয়েছিল, নতুন কিনবেন কেন? তিনশো টাকা দাম। আমার সঙ্গে চলুন। পুরনো কিনে দেব সস্তায়।

অফিস পাড়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গি, পার্ক ষ্ট্রিটের মোড়, ভবানীপুর, রাসবিহারীতে এসে আমার ধৈর্য এবং ক্ষমতা স্তিমিত। সুমন আশ্বাস দেয়, ঠিক পাওয়া যাবে। আর একটু এগোলেই গড়িয়াহাট, গোলপার্ক। কত পুরনো বইয়ের দোকান, এদিকে আবার বেশির ভাগই ইংরেজি বই।

বললাম, কোথাও একটু বসি। চা খাই।

আগে বইটা পাওয়া যায় কি না দেখি। অকারণে খরচা করবেন?

তার অসীম ধৈর্য এবং বিনীত পথ হাঁটায় আমি বিরক্ত। ভাবি, কলেজ ষ্ট্রিটের দোকান থেকে নতুন কেনাই ঠিক ছিল। কেন যে সুমনকে বলতে গেলাম! অগত্যা পথ হাঁটি। কিছুই দেখি না। দেশপ্রিয় পার্ক পেরিয়ে লেক ভিউ’র ফুটপাথে বইটা পাওয়া গেল। পুরনো হলুদ পাতার বই। মাঝারি ডায়রির আকৃতি। সাধারণ ম্যাটমেটে বোর্ডে নতুন করে বাঁধাই। ওপরে কালো কালিতে হাতে লেখা: বায়রন’স পোয়েমস। কবিতা তখনও পোয়েট্রি হয়নি। প্রিফেসের পাতা থেকে শুরু। দ্বিতীয় মুদ্রণের প্রিফেসে প্রকাশ কাল ১৮১৩। শেষের পাতায় একটি ফুলের ছবি সহ লেখা: টেম্পল প্রেস, লেচওয়ার্থ, গ্রেট ব্রিটেন। ব্রিটেন তখন গ্রেট ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর বই একবিংশ শতাব্দীর ফুটপাথে! দাম জিজ্ঞাসা করতে বলল, পঁচিশ টাকা। তবে ওনার খাতিরে কুড়ি।

সেই দিন থেকে সুমন আমার চোখে ভিন্ন এবং একা।

উত্তরে বা দক্ষিণে সুমনের পত্রচিত্র এমনই পদাতিক। মেসে ফেরে প্রায় আটটায়। হাত মুখ ধুয়ে শুকনো মুড়ি এবং চা। তেলেভাজা রোল টোস্ট ওমলেট নাকি পেটে সয় না। অন্য বোর্ডাররা বলে, পেটে নয়, পকেটে সয় না। হাড় কেপ্পন। দাড়িটা পর্যন্ত কাটে না!

তাকে রোগাই বলা যায়। লম্বা। চোখে চশমা। কাঁচা পাকা চুল। পায়ে প্লাস্টিক ফোমের চটি। খানসামার মতো খাটো পাজামা। পাঞ্জাবি কখনও গেরুয়া অথবা সাদা। শীতে বাড়তি খদ্দরের ডানা ছাঁটা কোট। মেসে লুঙ্গি গেঞ্জি।

অবনীদা মেসের মালিক। নাম বদলে গেস্ট হাউস করেছেন। আমরা বোর্ডার ছিলাম। এখন সবাই পেয়িং গেস্ট। তিনি সকালে আসেন, রাত্রে পারিবারিক ফ্ল্যাটে ফিরে যান। মহাত্মা গান্ধী রোডে তিনতলা পুরনো বাড়িতে এই গেস্ট হাউস। নীচে রাস্তার দিকের ঘরে দোকান ভাড়া দিয়েছেন। পাশের গলিতে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। নীচেই চৌবাচ্চা, বাথরুম ইত্যাদি। টানা বারান্দা। ওপরের দুই তলায় তিনটি করে বড় বড় কামরা। প্রতি কামরায় চারটি তক্তপোশ। মাঝে হাঁটা চলার জায়গা। ইদানীং পুরনো তুলোর গদি বদলে কয়্যারফোমের ম্যাট্রেশ এবং বালিশ। রাস্তার দিকে কয়েকটা বিশাল জানলা। প্রায় প্রতিটায় দু-চারটে খড়খড়ি ভাঙা। সপ্তাহে একদিন চাদর বদল হয়। ছাদের চিলেকোঠায় রান্না। নীচের বারান্দা ঘিরে ডাইনিং। তবুও এই ছয় কামরার চল্লিশ জনই পুরনো অভ্যাস এবং পরম্পরায় একে মেস বলে থাকি।

প্রতি তক্তপোশের মাথার দিকে কিছুটা জায়গা ছাড়া। সেখানে কারও আলমারি, সেলফ, র্যাক বা টেবিল নিজের পয়সায় কেনা। কোনও বোর্ডার চলে গেলে, পুরনো দামে সস্তায়। যেমন উমাপতি তক্তপোশে বসে টেবিল টেনে ছাত্রদের খাতা দেখে, নম্বর দেয়। তাপস ভাল চাকরি করে। তার টেবিল এবং আয়না লাগানো আলমারি। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই কাজ সারে। বামাচরণের টুল আছে। মাথার দেওয়ালে বারো মাসের লম্বা ক্যালেণ্ডার। সেখানে সে জামা প্যান্ট ঝুলিয়ে রাখে। সুবোধের খাটের নীচে কালো ঢাউস ট্রাঙ্ক। সুমনের পাশে নাইলনের দড়ি টাঙানো। সেখানে তার লুঙ্গি গেঞ্জি পাজামা। নীচে ইটের ওপর পাতা তক্তায় বইয়ের পিরামিড। পড়াশোনা তক্তপোশে। প্রতি কামরায় ঝুলে কালো হয়ে যাওয়া দুটি পাখা, তিনটি টিউব। কারও রেডিও, ট্রানজিস্টার বা টেপরেকর্ডার। তাপসের কেবল টিভি, রঙিন এবং ছোট। কেউ গান শোনে, টিভি দেখে, কেউ বা তাস খেলে। সুমন পড়ে।

আর এই পড়া নিয়েই সেদিন ক্যাচাল। বিরক্তি থেকে কলহ। আলোটা নিবিয়ে দিন না মশাই। কটা বাজে দেখেছেন?

আলো তো সবই নেবানো, শান্তভাবে বলে সুমন।

আপনার টেবিল ল্যাম্পটাও বন্ধ করুন।

আর দেড় পৃষ্ঠা।

সময় যায়। কলহ চিৎকারে পরিণত হয়। উমাপতি উঠে ল্যাম্পের সুইচ বন্ধ করে। বামাচরণ চোখের ওপরে থেকে রুমাল সরায়। সুবোধ কাগজ ভাঁজ করে রাখে।

মেসের একটা শৃঙ্খলা আছে। সেই নিয়মে সবাইকে অবনীদার অফিস ঘরে বৃহস্পতিবার উপস্থিত থাকতে হয়। আমাকেও। উমাপতি শুরু করে, আপনি পয়সা আগাম নেন, অথচ গেস্টদের অসুবিধার খবর নেন না।

অবনীদা থই পান না। আপনারা না বললে, বুঝব কী করে।

রাতের বিশ্রাম আর দু’ মুঠো খাবারের জন্যে মেসে থাকা, সুবোদের যোগান।

এটা মেস নয়।

দুটো কথার একই মানে। বেশ, গেস্ট হাউস। কিন্তু বিশ্রামে...

হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটল কেন?

রাত্রে ঘুমোতে না পারলে, বিশ্রাম হয় কেমন করে। উমাপতির রাগত অভিযোগ।

কে ঘুমোতে দেয় না? ওহ্‌, সুমন।

আরে দাদা, রাত দুটো পর্যন্ত আলো জ্বালিয়ে রাখে, বলে বামাচরণ।

তাপস বলে, কীসের এত পড়া। এই যে উমাদা, স্কুলে ছাত্র পড়ান। তাকেও তো এত পড়তে দেখি না।

উমাপতির অবজ্ঞা, বোধহয় বানান করে পড়ে। মগজে কিছু ঢোকে বলে মনে হয় না।

সুমনের নির্হিংস সাফাই, আপনারা গান শোনেন, টিভি দেখেন, তাস খেলেন। আমি তো বিরক্ত হই না। মগজ জ্ঞান এ সব প্রসঙ্গ না তোলাই ভাল।

তাপস তেড়ে আসে, উমাদার চেয়ে আপনি বেশি বোঝেন?

তেমন দাবি আমি করিনি। উনি নিশ্চয়ই বেশি বোঝেন। তবে সেদিন এক ছাত্রের খাতায় ভুল লিখতে দেখেছি।

উমাপতি চিৎকার করে প্রতিবাদ জানায়, ভুল লিখেছি? আমি?

তেমন কিছু নয়। হোমারের জন্মস্থান আয়োনিয়া লিখেছিলেন।

তাই তো।

না। তা নয়। গ্রিসের সাতটি শহরকে তার জন্মস্থান অনুমান করা হয়। জন্মসালও ৭০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ নয়। তার জন্ম তারিখ আজও নিরূপিত হয়নি। এমনকী ওডিসি যে তাঁরই রচনা, এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। সবই অনুমানভিত্তিক।

উমাপতি থমকে যায়। এই তথ্য আমার জানা নেই। প্রয়োজন হয় না। আমি ইংরাজি ভার্সান পড়েছি। রিউ-র সম্পাদনা।

এই র্যু কে?

বিলেতের কোনও পণ্ডিত।

র্যু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের দায়িত্বে বোম্বাইতে এসেছিলেন। এমনকী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারাঠা ইনফ্যান্ট্রির সৈনিক হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন কিছুকাল।

উমাপতির অহমিকা গুঁড়িয়ে যায়। স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে বলে চলে যায়।

আজকাল সুমনের সঙ্গে দেখা হয় না। সে মেসে থেকেও প্রায় নেই। ওপরের চিলেকোঠার খুপরিতে আগে যেখানে রান্না হত, ওটাই তার আস্তানা। নীচের বারান্দার একাংশ ঘিরে এখন কিচেন। একদিন তাকে দেখতে গেলাম। তক্তপোশে আধশোয়া। হাতে মলাট ছেঁড়া বই। আমাকে দেখে উঠে বসল। মাথার দিকে বেশ উপরে একমাত্র ঘুলঘুলি বা জানালা। সিলিং-এ ঝোলানো তেল কালিতে বিবর্ণ দুই ব্লেডের ডি সি পাখা, দেওয়ালের হোল্ডারে বাল্‌ব এবং সুমনের মাথার পাশে বইয়ের তাকের ওপর টেবিল ল্যাম্প। তক্তার ওপরে বইয়ের পাহাড়। পাশে বসে বলি, নতুন কী পড়লে সুমন?

ঠিক বলতে পারব না।

হাতে বই। অথচ বলতে পারবে না! নামের পাতাও ছেঁড়া?

তা নয়। একটা চটি বই। নাম কলকেতার হাট হদ্দ। ১৮৬৪-তে ছাপা। লেখকের নাম নেই। ঝরঝরে চলিত ভাষা। পুরনো কলকাতাকে জীবন্ত পাওয়া যায়। অনামে কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা মনে হয়।

কিন্তু এই আলো হাওয়াহীন ঘরে তুমি যে অসুস্থ হয়ে পড়বে।

আলো তো আছে। ওপরের জানালা দিয়ে হাওয়াও আসে।

কিছুদিন না হয় বাইরে কোথাও ঘুরে এসো। দেশ গ্রামে কেউ নেই শুনেছি। দূরে কাছে আত্মীয়স্বজনও নেই? দিঘা পুরী দার্জিলিং তো পা বাড়ালেই।

ওই পয়সায় পঁচিশটা বই হবে। দেশ বিদেশের অনেক বইও আছে। ওতেই আমার দেখাশোনা জানা।

মনে পড়ে কে যেন ওকে পোকা বলেছিল এবং কিপ্টে।

সুমন এখন দিব্যি আছে। অনেক রাত পর্যন্ত বই পড়ে। তাকে নিয়ে কোনও কৌতূহল বা বিরক্তি নেই। আমরাও নিয়মিত অফিস যাই, মেসে ফিরি। আমার প্রতি শুক্রবার বা ছুটির দিনে অফিস থেকে সোজা দুবরাজপুর যাওয়া আছে। সেখানে মা বউ ছেলে মেয়ে। সোমবার অফিসে হাজিরা। সন্ধ্যায় মেসে ফেরা। এই আবর্তে জীবনের অনেকগুলো বছর খরচ হয়ে যায়। বুড়ো হই।

সিঁড়ি বেয়ে সেদিনও দোতলায় ওঠার মুখে থমকে দাঁড়ালাম। অবনীদার ঘরে ভিড় কেন! দুই পুলিশকেও দেখতে পাচ্ছি। ভেতরে আসতে উমাপতিকে বলতে শুনি, কার ভেতরে কী লুকিয়ে আছে অবনীদা, আপনি কী করে বলবেন। এ রকম হতেই পারে। কারও পক্ষে এত বই কেনা সম্ভব!

সবই তো ছেঁড়া, পোকায় কাটা।

হলই বা পুরনো বই, তার দাম নেই?

প্রসঙ্গ যখন বই, নিশ্চয়ই সুমনকে নিয়ে আবার গোলমাল। আমি আগ্রহী হই, পুলিশ অফিসার বলে, পরশু রাতে এক বিখ্যাত পুরনো বইয়ের দোকানের শাটার ভেঙে চুরি হয়। ফ্রি স্কুল ষ্ট্রিটের এক হকারের কাছে কয়েকটা চোরাই বই পাওয়া যায়। সেই হকার বলেছে, দুটো বই সে নাকি এই মেসের একজনকে বিক্রি করেছে। আমরা তদন্তে এসেছি।

আমি প্রতিবাদ করি, আপনারা ভুল জায়গায় এসেছেন। বই পুরনো মানেই চোরাই নয়।

কালপ্রিট এই মেসের কথাই বলেছে। ভাল বই পেলে সে নাকি এখানে খবর দিতে আসত।

সুবোধ বলে, আমি দু-তিনজনকে আসতে দেখেছি।

উমাপতি বলে, আমিও।

অফিসার আমার দিকে তাকায়। আমরা ভুল জায়গায় আসিনি। চলুন, আপনাকে থানায় যেতে হবে।

অবনী বলেন, না না, উনি নন। বই যে কেনে, সে ফেরেনি এখনও। তার তো বিগত দশ-বারো বছর ধরে বই কেনার অভ্যাস। সবই পুরনো।

অফিসার গম্ভীর। তা হলে তো এক গভীর চক্রান্ত। এতদিন ধরে কেনাবেচার কারবার করছেন। তাও আমাদের নাকের ডগায়!

সে বই বিক্রি করে না।

নিশ্চয়ই করেন। আপনারা জানেন না।

আমরা তাকে কখনও বই বিক্রি করতে দেখিনি।

তাপস আমাকে শুধরে দেবার চেষ্টা করে, এ ভাবে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, সত্যেনদা। আমি ওকে বই নিয়ে বেরোতে দেখেছি।

ইতিমধ্যে সুমন আসে। হাতে দুটো পুরনো বই। সোজা উপরে যাচ্ছিল। উমাপতি পুলিশ অফিসারকে বলে, ওই যে আপনার আসামি।

আমি সুমনকে ডাকি। জানতে চাই, সম্প্রতি ফ্রি স্কুল ষ্ট্রিটের কোনও দোকান থেকে বই কিনেছ?

কোন দোকান থেকে কখন কী বই কিনি ঠিক মনে থাকে না, বলে সুমন।

পুলিশ অফিসার জানতে চায়, সব পুরনো?

সবই পুরনো।

রবার স্ট্যাম্প আছে?

কোনওটায় নাম লেখা, কোথায়ও বা সই তারিখ, কোথায়ও আণ্ডারলাইন, ফুট নোট। রবার স্ট্যাম্পও থাকতে পারে।

আমরা দেখতে চাই।

ওপরে চলুন।

অবনীদাকে সঙ্গে নিয়ে আমিও ওপরে যাই। সুমনের ঘরের দরজায় দড়ির ফাঁস। অফিসার বলে, এই ভাবে দরজা বন্ধ রাখেন। চুরি হয় না!

আমাদের পরস্পরে আস্থা আছে। তালার দরকার হয় না।

অফিসার কিছুটা যেন বিব্রত। মাথা নিচু। দড়ির ফাঁস খুলে অন্ধকার ঘর। ভ্যাপসা গন্ধ। সুমন আলো জ্বালায়। বিছানায় ছড়ানো বই। মাথার দিকের তক্তায় বইয়ের পাহাড়। অফিসার বলে, করেছেন কী মশাই। এই ছাইভষ্ম এখন ঘাঁটতে হবে!

সুমন উত্তর দেয় না। অফিসার কনস্টেবলকে বলে, স্ট্যাম্প মারা বই সব বের করো।

কনস্টেবল পাহাড় ভাঙে। পাতা উল্টে স্ট্যাম্প খোঁজে। জঞ্জাল সরানোর কায়দায় নীচ থেকে ওপরে তোলে। মলাট খসে। ছেঁড়া পাতা উড়ে যায়। অসহায় কাতরতায় সুমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো মনে মনে কাঁদছে। কোনও প্রতিবাদ নেই দেখে আহত হচ্ছে।

উমাপতিরা মজা দেখে। নিজেদের মধ্যে মন্তব্য চালাচালি। সব লটের দরে কেনা। এত বই তো আগে দেখিনি। বাংলা বইও চুরি হয়েছে?

অফিসার উত্তর দেয় না। এগারোখানা রবার স্ট্যাম্প দেওয়া বই পাওয়া যায়। কোথাও বোধোদয় লাইব্রেরি, শহীদ নগর পাঠাগার, হারবার্ট কলিনস, হেমন্ত পুস্তকালয়, ম্যাসাচুসেট ইউনিভার্সিটি বা বাপুজি সংঘ। ইংরাজি নামের স্ট্যাম্প দেওয়া বই অফিসার নিয়ে বলে, এগুলো আমি সিজ করলাম। কাগজে লিখে উমাপতির হাতে দিয়ে বলে, সই করুন। আপনি উইটনেস।

না না, আমি ব্যস্ত মানুষ। কোর্ট কাছারি করার সময় পাব না। এনাকে দিন, বলে আমার দিকে কাগজ বাড়িয়ে দেয়।

বই কবে ফেরত পাব, আমি জানতে চাই।

থানা থেকে ইন্ট্যাক্ট ফেরত পাবেন, যদি চোরাই না হয়।

কোন থানা?

আমহার্স্ট ষ্ট্রিট। আপনি সঙ্গে চলুন। বলে সুমনকে ডাকে।

কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?

থানায়।

কেন?

চুরি যাওয়া বই পাওয়া গেছে। ছাড়িয়ে আনতে হলে আপনারাও আসুন। বড়বাবুকে বলে জামিন করিয়ে নেবেন।

কিন্তু ওগুলো যে চুরি যাওয়া বই তার প্রমাণ?

প্রমাণ হবে আদালতে।

থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা গেলেও কোর্টকাছারি রোধ করা যায়নি। বছর দেড়েকের টানাপোড়েন। কাউন্সিলর এম এল এ-র কাছে ধর্না, উকিল মুহুরি হাজিরার হা পিত্যেশ। তবু শেষ রক্ষা হল না। অন্তত দুটি বই যে চোরাইয়ের অন্যতম সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত। চোরের অপরাধ কবুল, ফুটপাথের দোকানদারের স্বীকৃতি, নিরপরাধ অজ্ঞানতায় তার কাছ থেকে সুমনের বই কেনা এবং পার্ক লেনের বই বিক্রেতা হারবার্ট কলিনসের মালিকের শনাক্তকরণের ফলে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড।

মাঝে মাঝে দেখা করতে যাই। সুমনের কোনও বিমর্ষতা নেই। বরং বলে, আপনি কেন কষ্ট করে আসেন। এখানে আমার কোনও অসুবিধা নেই। জেলারকে বই চাইলে পড়তে দেয়। সারা রাত আলো জ্বলে। কেউ আলো নেবানোর কথা বলে না। অনেক রাত্রি পর্যন্ত পড়তে পারি।

বাইরে দাঁড়িয়ে আমি একা ভাবি, এই সংসারে কোনটা যে কার জেলখানা!

সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ মাঘ ১৪০৯ রবিবার ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৩

বৃদ্ধাশ্রম - অভিজিৎ তরফদার


বৃদ্ধাশ্রম
অভিজিৎ তরফদার

সকাল থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ছুটির দিনে দুপুরের জমাট ঘুম, সব উপেক্ষা করেও শান্তনু যে বেরিয়ে পড়ল তার প্রধান কারণ অবশ্যই উৎপল। বাবা মারা যাবার পর ভাগ-বাঁটোয়ারা শেষে দীপার প্রাপ্য যে দেড় কাঠা জমি পড়েছে, সেখানে তাড়াতাড়ি কিছু খাড়া না করতে পারলে জমিটা বেদখল হয়ে যাবে। অথচ, উঠে যাওয়ার মতো সামান্য একটা ষ্ট্রাকচারেও লাখ ছয়েকের ধাক্কা। অতএব উৎপলকে বধ করা ছাড়া উপায় নেই। উৎপল বেশ কিছু দিন ধরেই বলছে, রবিবার দেখে চলে আয়। আসার আগে একটা ফোন করে দিস। গেলে খারাপ লাগবে না। উৎপল নারাজ হলে, বলা তো যায় না, তার চেয়ে একটাই তো দিন, দিলই নাহয় উৎপলকে।

দ্বিতীয় কারণ, যে জন্য দীপার সঙ্গে শুকনো ঝগড়াও হয়ে গেল সাতসকালে, দীপার কাতুকাকা। দীপার সঙ্গে শান্তনুর ব্যাপারটায় যত দূর সম্ভব কাঠি করেছিলেন ভদ্রলোক। ষোলো বছরেও ভোলেনি শান্তনু। এখন বউ মরে যাবার পর, নিঃসন্তান কাতুকাকা যখন-তখন উদয় হন। গলায় মধু ঢেলে, ‘হ্যাঁ বাবা শান্তনু,’ বলতে বলতে দরজা ঠেলে ঢোকেন, মাংস-পরোটা না খেয়ে ওঠেন না। পিত্তি জ্বলে যায় শান্তনুর। আজ কাতুকাকা সন্ধেয় আসবেন, ফোনে খবর পাঠিয়েছেন। অতএব এই সুযোগ। রাগারাগির চোটে ছাতাটা ফেলে এল শান্তনু। অবশ্য বৃষ্টি ধরে গিয়েছে অনেক ক্ষণ। একটা রোদ গোছের লাজুক আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারারও চেষ্টা করছে।

উৎপল অপেক্ষা করছিল। ‘দেরি করে এলি, সন্ধ্যা হয়ে গেলে বেড়ানোটাই মাটি’, বলে গাড়ি স্টার্ট করল নিজেই। ‘ড্রাইভার রবিবার ছুটি নেয়, তা ছাড়া প্র্যাকটিসটা রাখা ভাল’, বলতে বলতে গড়িয়া পার হয়ে দক্ষিণে তুলে দিল গাড়ি।

কলকাতার এত কাছে এতখানি সবুজ? পাকা রাস্তা থেকে মোরামে উঠেছে গাড়ি। চাকার নীচে ভেজা মোরামের চপচপে আওয়াজ, ব্যাঙের ডাক, পাখির কিচির-মিচির। গাছের পাতায় বিকেলের আলোর পিছলে যাওয়া। পুকুরভর্তি পানা, শালুক ফুলের ফুটে থাকা। ভেজা মাটি, বুনো গাছগাছড়া, অজানা ফুল, উৎপলের ফ্রেঞ্চ পারফিউম; এক আশ্চর্য ককটেল। খানা-খন্দে পড়ে গাড়ি টাল খাচ্ছিল। শান্তনুর মনে হচ্ছিল এস্টিম নয়, মোষের গাড়িতে বসে দুই বন্ধু গ্রামের রাস্তায় অভিযানে বেরিয়েছে।

স্বপ্ন? যে-কোনও দিবাস্বপ্নের মতোই এটাও ছিঁড়ে গেল। সামনে পাঁচিল, পাঁচিলে গেট, গেটে লোহার দরজা। কেউ কি গাড়ির আওয়াজ পেয়েছিল? প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গেট খুলে গেল। উর্দি-পরা দারোয়ান ছাড়াও মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক গেট অবধি এসে সঙ্গ দিলেন। উৎপল আলাপ করিয়ে দিল, মহাদেববাবু, এখানকার কেয়ারটেকার।

ভেতরেও অনেকখানি ফাঁকা জায়গা, পুকুর, নারকোলগাছ, আমগাছ, তেঁতুলগাছ; এক পাশে কিচেন গার্ডেন। শেষে দোতলা বাড়ি, খুব পুরনো নয়, সামনে সিমেন্টের চাতাল, এক পাশে টিউবওয়েল।

মহাদেব ও উৎপলের কথা কানে আসছিল শান্তনুর।—‘জ্বর’, ‘ভুল বকছে’, ‘এখানে রাখা ঠিক হবে না’। উৎপল ডাক্তার। জেনারেল প্র্যাকটিশনার। ভাল প্র্যাকটিস। এই বৃদ্ধাশ্রমটায় রবিবার রবিবার আসে। ফ্রি-সার্ভিস? ও-ই বলতে পারবে।

চাতাল পার হয়ে দু’ধাপ সিঁড়ি, বাঁ দিকে অফিসঘর। শান্তনুকে বসিয়ে ফ্যান চালিয়ে মহাদেব উৎপলকে নিয়ে চলে গেলেন। টেবিল-চেয়ার কাঠের আলমারি ছাড়াও এক পাশে নেয়ারের খাট। মহাদেব কি এ ঘরেই রাত্রিবাস করেন?

বারান্দায় বেরিয়ে এল শান্তনু। টানা বারান্দার এক প্রান্তে বাথরুম। বারান্দার পাশে সারি সারি ঘর। বেশির ভাগই ভেতর থেকে বন্ধ। যে ঘরটার দরজা খোলা, দু’খানা রক্তহীন নির্লোম পা বারান্দায় ছড়ানো। শরীরটা যেহেতু ভেতরে, পায়ের মালিককে দেখা যাচ্ছে না। কোনও ঘরে বন্ধ দরজার আড়ালে ক্যাসেটে গান বাজছে। কান পাততে অবাক হয়ে গেল শান্তনু।—‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বলো তো’।
—না, এখানে রাখা ঠিক হবে না। তাড়াতাড়ি শিফ্‌ট করাই ভাল।
উৎপল। অন্যমনস্ক ছিল শান্তনু, দেখতে পায়নি। মহাদেববাবুও অফিসঘরে। গলা শোনা গেল।
—বাড়িতে তা হলে একটা খবর দিই।
—কোথায় খবর দেবেন? দুই ছেলেই তো বিদেশে।

চমকে উঠল শান্তনু। উঁকি মেরে দেখল। লাল পাড় সাদা শাড়ি, অভিজাত চেহারার এক ভদ্রমহিলা উৎপলের মুখোমুখি।
উৎপলকে হতাশ দেখাচ্ছিল, ‘কিন্তু এত জ্বর, কথাবার্তাও ঠিকঠাক বলছেন না। ভর্তি না করলে বিপদ হতে পারে।’
রেজিস্টার ওলটাচ্ছিলেন মহাদেব। পাতা খুঁজে একটা নম্বর বের করে ডায়াল করলেন। দু’তিন বার চেষ্টা করে নামিয়ে রাখলেন। ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হাওড়ার ও দিককার। কেউ ফোন ধরছে না’।

নম্বরটা জেনে নিয়ে উৎপলও ফোন করল। নো রিপ্লাই। ছেলেরা বাইরে থাকলেও তাদের নম্বর নিশ্চয়ই আছে। এক জনের পাওয়া গেল। উৎপল মোবাইল থেকে চেষ্টা করল। লাগল না। ভদ্রমহিলা উৎপলদের দেখছিলেন। বললেন, কী হল? বাড়ির কারওকে না পাওয়া গেলে অবিনাশবাবু এখানেই থাকবেন? চিকিৎসা হবে না?

কথা খুঁজছিল উৎপল। মহাদেব বললেন, ‘চিকিৎসা নিশ্চয়ই হবে। ওষুধপত্র যা এখানেই দেওয়া সম্ভব...’
—থামুন। ও সব আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। আটকাচ্ছে কোথায়? শুধু অনুমতি? নাকি টাকাপয়সাও?
—ধরুন দুটোই।

উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা। চেয়ার ঠেলে গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন। কিছু ক্ষণ পর একটা খাম এনে মহাদেবের হাতে দিয়ে বললেন, ‘পাঁচ হাজার আছে।’ তার পর উৎপলের দিকে তাকালেন চন্দ্রমল্লিকা। হ্যাঁ, মহাদেব একটু আগেই বলেছেন, উনি চন্দ্রমল্লিকা। ‘দেখবেন, চিকিৎসার যেন ত্রুটি না হয়।’

এ বারে উৎপল ড্রাউভ করছে। সামনের সিটে একা, পেছনে অবিনাশ চৌধুরী, আধশোয়া, শান্তনুর কোলে মাথা। বিরলকেশ মাথাটি আগুনের মতো গরম। হাতের পাতায় আটকে রেখেছে শান্তনু, যাতে গড়িয়ে না পড়ে যায়। বিড়বিড় করে কী সব বলার চেষ্টা করছেন অবিনাশ। ঘড়ঘড়ে গলার আওয়াজ, চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। একটা নোংরা গন্ধ বেরোচ্ছে অবিনাশের শরীর থেকে। উৎপলও নিশ্চয় পাচ্ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘কনট্রোল নেই, কাপড়েই সব করে ফেলছেন।’ গলা তুলে শান্তনু বলল, ‘এ সি অফ করে জানলাগুলো খুলে দিবি উৎপল?’

ছুটির দিন বলেই দ্রুত গাড়ি চালাতে পারছিল উৎপল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই একটা নার্সিংহোমে পৌঁছে গেল। ট্রলিতে অবিনাশকে তুলে পেছন পেছন ভেতরে গেল উৎপল। এ-দিক ও-দিক দেখতে দেখতে শান্তনু বুঝল, বাজেট নার্সিংহোম, খুব একটা খরচ পড়বে না। মাঝে এক বার লোডশেডিং হল। মশার কামড় খেতে খেতে শান্তনু যখন চলে আসবে কি না ভাবছে, উৎপল এল।

—আমাকে কিছু ক্ষণ থাকতে হবে মনে হচ্ছে রে। একা যেতে পারবি তুই?
ঘাড় নাড়ল শান্তনু। ‘কী মনে হচ্ছে, বাঁচবে?’
—দেখা যাক চেষ্টা করে।
উৎপল ফিরতে যাবে, সেলফোন বেজে উঠল।— ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ভর্তি হয়ে গেছেন। ট্রিটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। না না, এখুনি চিন্তার কিছু নেই। ঠিক আছে। আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব।’
শান্তনু দাঁড়িয়ে পড়েছিল। উৎপল হাসল, ‘চন্দ্রমল্লিকা।’

বেরিয়ে শান্তনু দেখল, টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি, মেঘ সন্ধ্যাকে ডেকে এনেছে তাড়াতাড়ি। রিকশা ধরে বাস রাস্তায় পৌঁছতে পৌঁছতে বৃষ্টি বাড়তে শুরু করল। মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানের পাশে গরম ফুলুরি ভাজা হচ্ছিল। পেটে আলসার ধরা পড়ার পর থেকে নিষিদ্ধ খাবারগুলোর প্রতি আসক্তি বেড়েছে শান্তনুর। আজও গুটি গুটি এগোচ্ছিল। হঠাৎ নজরে পড়ল যে বাসটা এখান থেকে সোজা বাড়ির চৌহদ্দি অবধি পৌঁছে দেবে, সেটারই একখানা ফাঁকা সংস্করণ বাস-স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে লোক ডাকাডাকি করছে। ছুটে গিয়ে নিজেকে গুঁজে দিল শান্তনু।

বসার জায়গা পেয়ে গেল, তবে পেছন দিকে। বেশিটাই বাইপাস ধরে দৌড়য়। অতএব ঝাঁকুনির আশঙ্কা কম। তেমন জোরে বৃষ্টি পড়ছে না যে, জানলা বন্ধ রাখতে হবে। পাশের ভদ্রলোককে বলে জানলা খুলে দিতেই ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখ মুখ জুড়িয়ে গেল। দিনটাকে চোখের সামনে মেলে ধরল শান্তনু।

আজ তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উৎপলকে খুশি করা। উৎপল কি খুশি হয়েছে? হয়েছে বোধহয়। উৎপলের অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকলে যা যা করত, শান্তনু তার চেয়ে কম কিছু করেনি। ধরাধরি করে গাড়িতে তুলেছে, ভারী মাথাটা কোলে নিয়ে বসে থেকেছে, যাতে পড়ে না যায় হাত দিয়ে আগলে রেখেছে, সিট থেকে ঝুলে পড়লে টেনে সোজা করেও দিয়েছে। আর এ সবই করেছে স্বেদ কফ মূত্র পুরীষ মিশ্রিত এক পূতিগন্ধের অনুষঙ্গে। ভাবতেই গন্ধটা নাকে উঠে এল শান্তনুর। মনটা সরাতে শান্তনু পথের দৃশ্যগুলো কল্পনা করার চেষ্টা করল। ব্যাঙের ডাক, শালুক ফুল, মাটির গন্ধ আসছে না, ব্যর্থ হয়ে বৃদ্ধাশ্রম, চন্দ্রমল্লিকা।

বৃদ্ধাশ্রমের দৃশ্যটা মনে পড়ল শান্তনুর। ব্যারাকের মতো সারি সারি ঘর। প্রত্যেক ঘরে এক জন করে বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা। রক্তহীন দু’খানা পা-ও নজরে পড়েছিল শান্তনুর। একটি গানের কলি ছাড়া সমস্তটাই মৃত্যুর মতো নিঃস্তব্ধ। শান্তনু নিশ্চিত, ওই গান বৃদ্ধাশ্রমের কোনও অর্বাচীন কর্মচারীর যন্ত্রপ্রসূত। জীবনের সমস্ত লক্ষণ ওই আশ্রমে অনুপস্থিত।

তা হলে চন্দ্রমল্লিকা কেন? এক জন মৃত্যুপথযাত্রী সহবাসীর অসুখে অতখানি উদ্বেগ? টাকা দিয়েই হাত মুছে ফেলেননি। পরে ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন। অবিনাশ কি চন্দ্রমল্লিকার প্রেমিক? বৃদ্ধ ও বৃদ্ধার প্রেম! না কি তাঁরা পূর্বপরিচিত? চন্দ্রমল্লিকাই পারলেন মন থেকে মৃত্যুকে মুছে দিতে। ঘুমিয়ে পড়ল শান্তনু। ঘুম ভেঙে গেল তীক্ষ্ণ চিৎকারে, ‘ছাড়ুন, আমি কিন্তু লোক ডাকব।’ হঠাৎ ঘুম ভাঙলে যা হয়, শান্তনু প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। তার পর নিজেকে গুছিয়ে নিতে নিতে দেখল বাস প্রায় ফাঁকা, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি এবং ভেতরে অভিনীত হচ্ছে একটি পরিচিত নাট্যদৃশ্য।

যেহেতু মেয়েটি বসে আছে ড্রাইভারের পিছনের সিটে, একদম সামনে, সব কথা ভাল করে শোনা যাচ্ছিল না। টিমটিমে আলোয় ভাল করে দেখাও যাচ্ছিল না সকলকে। তবু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটি বাড়ি ফিরছে। আজকাল অনেক কল সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এমনকী অফিসও রবিবার খোলা থাকে। সে রকমই কিছুতে কাজ করে হয়তো। তিনটে ছেলে সুযোগ নেবার চেষ্টা করছে। সামনের জন পা ফাঁক করে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মেয়েটার কথায় হ্যা হ্যা করে হেসে এক পাক ঘুরে নিল। তার পর গলা তুলে বলল, ‘লোক? এই সব লোক? এই ঢ্যামনাগুলো? ডাক। যত জোরে পারিস ডাক। দেখি কে তোকে বাঁচাতে আসে।’

শান্তনু দেখল তার সহযাত্রীরা কেউ জানলার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বাইরেটা দেখতে ব্যস্ত, কেউ ঘুমের ভান করে নিমীলিত চক্ষু, কেউ বা পয়সা গুনে ভাড়া মিটিয়ে দেবার উদ্যোগ করছে।

শান্তনুর মনে পড়ল, তারও ভাড়া দেওয়া হয়নি। হাত নেড়ে কনডাকটরকে ডাকল। আর তখনই মনে হয় কোনও প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দেবার জন্য সামান্য থেমেছিল বাস, নিজের সিট থেকে ছিটকে উঠে দরজা দিয়ে নেমে গেল মেয়েটা।

একটা সমবেত আওয়াজ উঠল তিন জনের গলা থেকে। ‘রোককে রোককে’ বলতে বলতে ঘন্টি বাজিয়ে বাস স্লো করে ওরাও নেমে গেল পেছন পেছন। জানলার পাল্লা নামিয়ে শান্তনু দেখল, অন্ধকার রাস্তা, একটা দুটো দোকানের ঝাঁপ খোলা, রাস্তা জনমানবহীন, বৃষ্টি ঝরে চলেছে অঝোরে। ছাট আসছিল। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে বাইরের ভেতরে আসা আটকে দিল শান্তনু।

যেখানে নামবার কথা তার পরের স্টপে বাস থেকে নামল শান্তনু। উঠেছিল ঠিকঠাক, কিন্তু হাঁটু দুটোয় জোর এত কম, আর পা-দুখানা এত ভারী, পা টেনে টেনে দরজা অবধি পৌঁছতেই বাস এগিয়ে গেল।

নেমে প্রথমেই পেছন দিকে তাকাল শান্তনু। দূরে, যত দূর দেখা যায়, জমাট অন্ধকার। কান পাতল, শোনার চেষ্টা করল। কোনও একঘেয়ে আওয়াজ ছাড়া চার পাশ লক্ষণীয় রকম নিস্পন্দ। এক মুহূর্ত দাঁড়াল। তার পর নিজেকে বোঝাল, না, তার কিছু করবার নেই।

বড় রাস্তা নয়, নিজের অগোচরেই কখন গলির পথ ধরেছে, খেয়াল পড়ল যখন বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। আসতে আসতে মনে হল, বাসের পাঁচ জন সহযাত্রী, তারই মতো, কিছু ঘটে গেলে উঠে গিয়ে বাধা দিতে পারত মনে হয় না। সে দিক থেকে মেয়েটা ঠিকই করেছে। বড় রাস্তায়, হোক অন্ধকার, হোক বৃষ্টি, ডাক দিলে অন্তত জনা পঞ্চাশ লোক বেরিয়ে আসবেই। তা ছাড়া এই সময় পুলিশের হল্লাগাড়ি টহল দেয়। মুখোমুখি পড়ে গেলে ছেলেগুলো পালাতে পথ পাবে না। না, মেয়েটার বুদ্ধি আছে এবং এ যাত্রা বেঁচে গেল বলেই মনে হয়।

ভাবতে ভাবতেই শান্তনু দেখল পায়ের জোর ফিরে আসছে। বৃষ্টিতে ঠাণ্ডায় যে কাঁপুনিটা ভেতরে ভেতরে কাবু করে ফেলছিল, সেটাও অনেকখানি কমে গেল। দরজায় কড়া নাড়ার সময় তো দেখল, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। দরজা খুলল দীপা। মৌ? পায়ের কাঁপুনিটা ফিরে আসছে।

রান্নাঘরে ঢুকছিল দীপা। না ঘুরেই বলল, ‘নন্দিনীর বাড়ি গিয়েছিল। বৃষ্টিতে আটকে পড়েছে। রাত হয়ে গেছে। ফোন করে আসতে বারণ করে দিলাম।’ ভাল করে স্নান করল শান্তনু। মড়া ছুঁলে ছোটবেলায় মাথায় জল ঢেলে তবে বাড়িতে ঢুকতে দিত মা। মাথা মুছল শুকনো তোয়ালেতে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বুকের পাকা চুল গুনল। বেগুন ভাজা আর অমলেট দিয়ে একথালা খিচুড়ি সাঁটিয়ে মুখ ধুয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টি কমেনি এতটুকু। কাল কলকাতা ভাসাবে। লাইটপোস্টগুলোর আলো একটু এগিয়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা কি বাড়ি ফিরে গেছে? চিন্তাটা সরাবার চেষ্টা করল শান্তনু।

চন্দ্রমল্লিকা, চন্দ্রমল্লিকা। মেয়েটাকে সরানোর একটাই উপায়, চন্দ্রমল্লিকা। কত বয়েস হবে চন্দ্রমল্লিকার? উনি কি বিবাহিতা? স্বামী বেঁচে আছেন চন্দ্রমল্লিকার? সিঁদুর ছিল কি? অবিনাশ চৌধুরী, পদবি লিখতে হয়েছিল রেজিস্টারে। চন্দ্রমল্লিকার পুরো নাম কী যেন? মহাদেব বলেছিলেন।

হঠাৎই গন্ধটা নাকে এল শান্তনুর। অবিনাশের গন্ধ। মৃত্যুর গন্ধ। এমনকী চন্দ্রমল্লিকাও তাড়াতে পারছেন না, এত তীব্র, এত বিস্তৃত সেই গন্ধের পরিধি। ঘরে ঢুকল শান্তনু। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাতে ক্রিম ঘষছিল দীপা। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল শান্তনু, টানল নিজের দিকে। চুলের গন্ধ, ক্রিম, কসমেটিকস, পাউডারের গন্ধ।

শান্তনুর চুলে বিলি কাটতে কাটতে দীপা বলল, ‘রাগ করে বেরিয়ে গেলে, ছাতাটাও নিয়ে গেলে না। কাকভেজা হয়ে তো ফিরলে, এ বারে ঠাণ্ডা লাগিয়ে অসুখ না বাধাও। তা কোথায় যাওয়া হয়েছিল শুনি?’ দীপার স্তনসন্ধিতে মুখ ডুবিয়ে শান্তনু জবাব দিল, ‘ছাড়ো তো! উৎপলটার পাল্লায় পড়ে....। যত সব বুড়োবুড়িদের কাণ্ড!’

সৌজন্যে: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪ রবিবার ২৭ মে ২০০৭

হুজুর কেবলা - আবুল মনসুর আহমদ


হুজুর কেবলা
আবুল মনসুর আহমদ

এমদাদ তার সবগুলি বিলাতি ফিনফিনে ধুতি, সিল্কের জামা পোড়াইয়া ফেলিল; ফ্লেঙে ব্রাউন রঙের পাম্পসুগুলি বাবুর্চিখানার বঁটি দিয়া কোপাইয়া ইলশা-কাটা করিল। চশমা ও রিস্টওয়াচ মাটিতে আছড়াইয়া ভাঙিয়া ফেলিল; ক্ষুর স্ট্রপ, শেভিংস্টিক ও ব্রাশ অনেকখানি রাস্তা হাঁটিয়া নদীতে ফেলিয়া দিয়া আসিল; বিলাসিতার মস্তকে কঠোর পদাঘাত করিয়া পাথর বসানো সোনার আংটিটা এক অন্ধ ভিক্ষুককে দান করিয়া এবং টুথক্রিম ও টুথব্রাশ পায়খানার টবের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া দাঁত ঘষিতে লাগিল।

অর্থাৎ এমদাদ অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করিল! সে কলেজ ছাড়িয়া দিল।

তারপর সে কোরা খদ্দরের কলি্লদার কোর্তা ও সাদা লুঙ্গি পরিয়া মুখে দেড় ইঞ্চি পরিমাণ ঝাঁকড়া দাড়ি লইয়া সামনে-পিছনে সমান-করিয়া চুলকাটা মাথায় গোল নেকড়ার মতো টুপি কান পর্যন্ত পরিয়া চটিজুতা পায়ে দিয়া যেদিন বাড়ি মুখে রওনা হইল, সেদিন রাস্তার বহুলোক তাকে সালাম দিল।

সে মনে মনে বুঝিল, কলিযুগেও দুনিয়ায় ধর্ম আছে।
কলেজে এমদাদের দর্শনে অনার্স ছিল।
কাজেই সে ধর্ম, খোদা, রসুল কিছুই মানিত না। সে খোদার আরশ, ফেরেশতা, ওহি, হযরতের মেরাজ লইয়া সর্বদা হাসি ঠাট্টা করিত।

কলেজ ম্যাগাজিনে সে মিল, হিউম, স্পেন্সার, কোমতের ভাব চুরি করিয়া অনেকবার খোদার অস্তিত্বের অসারতা প্রমাণ করিয়াছিল।
কিন্তু খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করিয়া এমদাদ একেবারে বদলাইয়া গেল।

সে ভয়ানক নামাজ পড়িতে লাগিল। বিশেষ করিয়া নফল নামাজে সে একেবারে তন্ময় হইয়া পড়িল।

গোলগাল করিয়া বাঁশের কঞ্চি কাটিয়া সে নিজ হাতে এক ছড়া তসবিহ তৈরি করিল। সেই তসবির ওপর দিয়া অষ্টপ্রহর অঙ্গুলি চালনা করিয়া সে দুইটা আঙুলের মাথা ছিঁড়িয়া ফেলিল।

কিন্তু এমদাদ টলিল না। সে নিজের নধর দেহের দিকে চাহিয়া বলিল : হে দেহ, তুমি আমার আত্মাকে ছোট করিয়া নিজেই বড় হইতে চাহিয়াছিলে! কিন্তু আর নয় সে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে তসবিহ চালাইতে লাগিল।

দুই
-----

দিন যাইতে লাগিল।

ক্রমে এমদাদ একটা অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিল।
বহু চেষ্টা করিয়াও সে এবাদতে তেমন নিষ্ঠা আনিতে পারিতেছিল না। নিজেকে বহু শাসাইল, বহু প্রক্রিয়া অবলম্বন করিল; কিন্তু তথাপি পোড়া ঘুম তাকে তাহাজ্জতের নামাজ তরক করিতে বাধ্য করিতে লাগিল।

অগত্যা সে নামাজে বসিয়া খোদার নিকট হাত তুলিয়া কাঁদিবার বহু চেষ্টা করিল। চোখের পানির অপেক্ষায় আগে হইতে কান্নার মতো মুখ বিকৃত করিয়া রাখিল। কিন্তু পোড়া চোখের পানি কোনোমতেই আসিল না।

সে স্থানীয় কংগ্রেস ও খেলাফত কমিটির সেক্রেটারি ছিল।

সেখানে প্রত্যহ সকাল-বিকালে চারিপাশের বহু মওলানা-মওলবি সমবেত হইয়া কাবুলের আমিরের ভারত-আক্রমণের কত দিন বাকি আছে তার হিসাব করিতেন এবং খেলাফত নোট-বিক্রয়লব্ধ পয়সায় প্রত্যহ পান ও জরদা এবং সময় সময় নাশতা খাইতেন।

ইহাদের একজনের সুফি বলিয়া খ্যাতি ছিল। তিনি এক পীর সাহেবের স্থানীয় খলিফা ছিলেন এবং অনেক রাত পর্যন্ত ‘এলহু, এলহু’ করিতেন।

অল্পদিন পূর্বে ‘এস্তেখারা’ করিয়া তিনি দেখিয়াছিলেন যে চারি বৎসরের মধ্যে কাবুলের আমির হিন্দুস্থান দখল করিবেন।

তাঁহার কথায় সকলেই বিশ্বাস করিয়াছিল; কারণ মেয়েলোকের উপর জিনের আসর হইলে তিনি জিন ছাড়াইতে পারিতেন।

এই সুফি সাহেবের নিকট এমদাদ তার প্রাণের বেদনা জানাইল।

সুফি সাহেব দাড়িতে হাত বুলাইয়া মৃদু হাসিয়া ইংরাজি-শিক্ষিতদের উদ্দেশ্য করিয়া অনেক বাঁকাবাঁকা কথা বলিয়া উপসংহারে বলিলেন : হকিকতান যদি আপনি রুহের তরক্কি হাসেল করিতে চান, তবে আপনাকে আমার কথা রাখিতে হইবে। আচ্ছা; মাস্টার সাহেব, আপনি কার মুরিদ?

এমদাদ অপ্রতিভভাবে বলিল : আমি ত কারো মুরিদ হই নাই।

সুফি সাহেব যেন রোগ নির্ণয় করিয়া ফেলিয়াছিলেন এইভাবে মাথা নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন : হ-ম, তাই বলুন। গোড়াতেই গলদ। পীর না ধরিয়া কি কেহ রুহানিয়ত হাসেল করিতে পারে? হাদিস শরিফে আসিয়াছে : [এইখানে সুফি সাহেব বিশুদ্ধরূপে আইন গাইনের উচ্চারণ করিয়া কিছু আরবি আবৃত্তি করিলেন এবং উর্দুতে তার মানে মতলব বয়ান করিয়া অবশেষে বাংলায় বলিলেন] : জয্বা ও সলুক খতম করিয়া ফানা ও বাকা লাভে সমর্থ হইয়াছেন এরূপ কামেল ও মোকাম্মেল, সালেক ও মজ্যুব পীরের দামন না ধরিয়া কেহ জমিরের রওশনি ও রুহের তরক্কি হাসেল করিতে পারে না।

হাদিসের এই সুস্পষ্ট নির্দেশের কথা শুনিয়া এমদাদ নিতান্ত ঘাবড়াইয়া গেল।
সে ধরা-গলায় বলিল : কী হইবে আমার তাহা হইলে সুফি সাহেব?

সুফি সাহেব এমদাদের কাঁধে হাত রাখিয়া বলিলেন : ঘাবড়াইবার কোনো কারণ নাই। কামেল পীরের কাছে গেলে এক দিনে তিনি সব ঠিক করিয়া দিবেন।
স্বস্তিতে এমদাদের মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।

সে আগ্রহাতিশয্যে সুফি সাহেবের হাত চাপিয়ে ধরিয়া বলিল : কোথায় পাইব কামেল পীরে? আপনার সন্ধানে আছে?

উত্তরে সুফি সাহেব সুর করিয়া একটি ফারসি বয়েত আবৃত্তি করিয়া তার অর্থ বলিলেন : জওহরের তালাশে যারা জীবন কাটাইয়াছে, তারা ব্যতীত আর কেহ জওহরের খবর দিতে পারে? হাজার শোকর খোদার দরগায়, বহু তালাশের পর তিনি জওহর মিলাইয়াছেন।

সুফি সাহেবের হাত তখনো এমদাদের মুঠার মধ্যে ছিল। সে ত আরো জোরে চাপিয়া ধরিয়া বলিল : আমাকে লইয়া যাইবেন না সেখানে?

সুফি সাহেব বলিলেন : কেন লইয়া যাইব না? হাদিস শরিফে আসিয়াছে : (আরবি ও উর্দু) যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আসিতে চায়, তার সাহায্য করো।

সংসারে একমাত্র বন্ধন এবং অভিভাবক বৃদ্ধা ফুফুকে কাঁদাইয়া একদিন এমদাদ সুফি সাহেবের সঙ্গে পীর-জিয়ারতে বাহির হইয়া পড়িল।

তিন
----

এমদাদ দেখিল : পীর সাহেবের একতলা পাকা বাড়ি। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অন্দরবাড়ির সব ক’খানা ঘর পাকা হইলেও বৈঠকখানাটি অতি পরিপাটি প্রকাণ্ড খড়ের আটচালা।

সে সুফি সাহেবের পিছনে পিছনে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিল। দেখিল : ঘরে বহু লোক জানু পাতিয়া বসিয়া আছেন। বৈঠকখানার মাঝখানে দেয়াল ঘেঁষিয়া অপেক্ষাকৃত উচ্চ আসনে মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি-বিশিষ্ট একজন বৃদ্ধ লোক তাকিয়া হেলান দিয়া আলবোলায় তামাক টানিতেছেন।

এমদাদ বুঝিল : ইনিই পীর সাহেব।

‘আসসালামু আলাইয়াকুম’ বলিয়া সুফি সাহেব সোজা পীর সাহেবের নিকট উপস্থিত হইয়া হাঁটু পাতিয়া বসিলেন। পীর সাহেব সম্মুখস্থ তাকিয়ার উপর একটি পা তুলিয়া দিলেন। সুফি সাহেব সেই পায়ে হাত ঘষিয়া নিজের চোখে, মুখে ও বুকে লাগাইলেন।

তৎপর সাহেব তাঁর হাত বাড়াইয়া দিলেন। সুফি সাহেব তা চুম্বন করিয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন এবং পিছাইয়া-পিছাইয়া কিছুদূর গিয়া অন্য সকলের ন্যায় জানু পাতিয়া বসিলেন।

পীর সাহেব এতক্ষণে কথা বলিলেন : কিরে বেটা, খবর কী? তুই কি এরই মধ্যে দায়েরায়ে হকিকতে মহব্বত ও জযবায়েযাতি-বনাম হোব্বে এশক হাসেল করিয়া ফেললি নাকি?

পীর সাহেবের এই ঠাট্টায় লজ্জা পাইয়া সুফি সাহেব মাথা নিচু করিয়া মাজা ঈষৎ উঁচু করিয়া বলিলেন : হযরত, বান্দাকে লজ্জা দিতেছেন!

পীর সাহেব তেমনি হাসিয়া বলিলেন : তা না হইলে নিজের চিন্তা ছাড়িয়া অপরের রুহের সুপারিশ করিতে আমার নিকট আসিলে কেন? কই, তোর সঙ্গী কোথায়? আহা! বেচারা বড়ই অশান্তিতে দিনপাত করিতেছে।

এই বলিয়া পীরসাহেব চক্ষু বুজিলেন এবং প্রায় এক মিনিট কাল ধ্যানস্থ থাকিয়া চক্ষু মেলিয়া বলিলেন : সে এই ঘরেই হাজির আছে দেখিতেছি।

উপস্থিত মুরিদগণের সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করিতে লাগিল। এমদাদ ভক্তি ও বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া একদৃষ্টে পীর সাহেবের দিকে চাহিয়া রহিল। মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি-গোঁফের ভিতর দিয়া পীর সাহেবের মুখ হইতে এক প্রকার জ্যোতি বিকীর্ণ হইতে লাগিল।

সুফি সাহেব এমদাদকে আগাইয়া আসিতে ইশারা করিলেন। সে ধীরে ধীরে পীর সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সুফি সাহেবের ইঙ্গিতে অনভ্যস্ত হাতে কদমবুসি করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

পীর সাহেব ‘বস্ বেটা, তোর ভালো হইবে। আহা, বড় গরিব!’ বলিয়া আলবোলার নলে দম কষিলেন।

সুফি সাহেব আমতা আমতা করিয়া বলিলেন : হযরত এর অবস্থা তত গরিব নয়। বেশ ভালো তালুক সম্পত্তি—

পীর সাহেব নলে খুব লম্বা টান কষিয়াছিলেন; কিন্তু মধ্যপথে দম ছাড়িয়া দিয়া মুখে ধোঁয়া লইয়াই বলিলেন : বেটা, তোরা আজিও দুনিয়ার ধন-দওলত দিয়া ধনী-গরিব বিচার করিস। এটা তোদের বুঝিবার ভুল। আমি গরিব কথায় দুনিয়াবি গোরবৎ বুঝাই নাই। মুসলমানদের জন্য দুনিয়ার ধন-দওলত হারাম। এই ধন-দওলত এনসানের রুহানিয়ত হাসেলে বাধা জন্মায়, তার মধ্যে নফসানিয়ত পয়দা করে।

আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছেন : (আরবি ও উর্দু) বেশক দুনিয়ার ধন-দওলত শয়তানের ওয়াস-ওয়াসা, ইহা হইতে দূরে পলায়ন করো। কিন্তু দুনিয়ার মায়া কাটানো কি সহজ কথা? তোদের আমি দোষ দিই না। তোদের অনেকেই এখন যেকেরের দরজাতেই পড়িয়া আছিস। যেকরে জলি ও যেকরে খফি এই দুই দরজার যেকের সারিয়া পরে ফেকেরের দরজায় পৌঁছিতে হয়। ফেকের হইতে যহুর এবং যহুর হইতে মোরাকেবা-মোশাহেদার কাবেলিয়ত হাসেল হয়। খোদার ফজলে আমি আরেফিন, সালেহিন ও সিদ্দিকিনের মোকামাতের বিভিন্ন দায়েরার ভিতর দিয়া যেভাবে এলমে লাদুনি্নর ফলেজ হাসেল করিয়াছি, তোদের কলব অতটা কুশাদা হইতে অনেক দেরি—অনেক—

—বলিয়া তিনি হুক্কার নলটা ছাড়িয়া দিয়া সোজা হইয়া বসিলেন এবং চোখ বুজিয়া ধ্যানস্থ হইলেন।

কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়া থাকিয়া হাসিয়া উঠিলেন এবং চিৎকার করিয়া বলিলেন : কুদরতে-ইয্দানি, কুদরতে-ইয্দানি। মুরিদরা সব সে চিৎকারে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলেন।

কিন্তু কেউ কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিলেন না।

পীর সাহেব চিৎকার করিয়াই আবার চোখ বুজিয়াছিলেন। তিনি এবার ঈষৎ হাসিয়া চোখ মেলিয়া বলিলেন : আমরা কত বৎসর হইল এখানে বসিয়া আছি?

জনৈক মুরিদ বলিলেন : হযরত, বৎসর কোথায়? এই না কয়েক ঘণ্টা হইল।

পীর সাহেব হাসিলেন। বলিলেন : অনেক দেরি—অনেক দেরি। আহা বেচারারা চোখের বাহিরে আর কিছুই দেখিতে পায় না।

অপর মুরিদ বলিলেন : হুজুর কেবলা, আপনার কথা মোটেই বুঝিতে পারিলাম না। পীর সাহেব মৃদু হাসিয়া বলিলেন : অত সহজে কি আর সব কথা বোঝা যায় রে বেটা? চেষ্টা কর্, চেষ্টা কর্।

মুরিদটি ছিলেন একটু আবদেরে রকমের। তিনি বায়না ধরিলেন : না কেবলা, আমাদিগকে বলিতেই হইবে। কেন আপনি বৎসরের কথা জিজ্ঞাসা করিলেন?

পীর সাহেব বলিলেন : ও কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিস না। তার চেয়ে অন্য কথা শোন্। এই যে সাদুল্লাহ (সুফি সাহেবের নাম) একটি ছেলেকে আমার নিকট মুরিদ করিতে লইয়া আসিল, আমি সে কথা কী করিয়া জানিতে পারিলাম? আজ তোমরা তাজ্জব হইতেছ। কিন্তু ইন্শাআল্লাহ, যখন তোমরা মোরাকেবায়ে নেসবতে বায়নান্নাসে তালিম লইবে, তখন অপরের নেসবত সম্বন্ধে তোমাদের কলব আয়নার মতো রওশন হইয়া যাইবে। আল্গরয ইহাও খোদার এক শানে আযিম। সাদুল্লাহ যখন আমার দস্তবুসি করে, তখন তার মুখের দিকে আমার নজর পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার রুহ সাদুল্লাহর রুহের দিকে মুতাওয়াজ্জোহ হইয়া গেল। সেখানে আমি দেখিলাম, সাদুল্লাহর রুহ আর একটা নতুন রুহের সঙ্গে আলাপ করিতেছে। উহাতেই আমি সব বুঝিয়া লইলাম। আল্লাহু আযিমুশশান।

বলিয়া পীর সাহেব একজন মুরিদকে হুক্কার দিকে ইঙ্গিত করিলেন।

মুরিদ হুক্কার মাথা হইতে চিলিম লইয়া তামাক সাজিতে বাহির হইয়া গেল। পীর সাহেব বলিলেন : তোরা আমার নিজের নুৎফার ছেলের মতো। তথাপি তোদের নিকট হইতে আমাকে অনেক গায়েবের কথা গোপন রাখিতে হয়। কারণ তোরা সে সমস্ত বাতেনি কথা বরদাশ্ত করিতে পারবি না। যেকের ও ফেকের দ্বারা কলব কুশাদা করিবার আগেই কোনো বড়রকমের নূরে তজলি্ল তাতে ঢালিয়া দিলে তাতে কলব অনেক সময় ফাটিয়া যায়। এলমে লাদুনি্ন হাসেল করিবার আগেই আমি একবার লওহে-মাওফুযে উপস্থিত হইয়াছিলাম। তখন আমি মাত্র দায়েরায়ে হকিকতে লাতা আইউনে তালিম লইতেছিলাম। সায়েরে নাযাবির ফয়েজ তখনো আমার হাসেল হয় নাই। কাজেই আরশে-মওয়াল্লার পরদা আমার চোখের সামনে হইতে উঠিয়া যাইতেই আমি নূরে ইয্দানি দেখিয়া বেহুঁশ হইয়া পড়িলাম। তারপর আমার জেসমের মধ্যে আমার রুহের সন্ধান না পাইয়া আমার মুর্শেদ কেবলা—তোরা তো জানিস আমার ওয়ালেদ সাহেবই আমার মুর্শেদ লওহে-মাহফুজ হইতে আমার রুহ আনিয়া আমার জেসমের মধ্যে ভরিয়া দেন এবং নিজের দায়রার বাহিরে যাওয়ার জন্য আমাকে বহুৎ তম্বিহু করেন। কাজেই দেখিতেছিস, কাবেলিয়ত হাসেল না করিয়া কোনো কাজে হাত দিতে নাই। খানিকক্ষণ আগে আমি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম : আমরা কত বৎসর যাবৎ এখানে বসিয়া আছি? শুনিয়া তোরা অবাক হইয়াছিলি। কিন্তু এর মধ্যে যে ঘটনা ঘটিয়াছে, তা শুনিলে তো আরো তাজ্জব হইয়া যাইবি। সে জন্যই সে কথা বলিতে চাই নাই। কিন্তু কিছু কিছু না বলিলে তোরা শিখবি কোথা হইতে? তাই সে কথা বলাই উচিত মনে করিতেছি। সাদুল্লাহ এখানে আসিবার পর আমি আমার রুহকে ছাড়িয়া দিয়াছিলাম। সে তামাম দুনিয়া ঘুরিয়া সাত হাজার বৎসর কাটাইয়া তারপর আমার জেসমে পুনরায় প্রবেশ করিয়াছে। এই সাত হাজার বৎসরে কত বাদশাহ ওফাত করিয়াছে, কত সুলতানাৎ মেস্মার হইয়াছে, কত লড়াই হইয়াছে, সব আমার সাফসাফ মনে আছে। সেরেফ এইটুকুই বলিলাম; ইহার বেশি শুনিলে তোদের কলব ফাটিয়া যাইবে।

ইতিমধ্যে তামাক আসিয়াছিল।

পীর সাহেব নল হাতে লইয়া ধীরে ধীরে টানিতে লাগিলেন।

সভা নিস্তব্ধ রহিল। কলব ফাটিয়া যাইবার ভয়ে কেহ কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিল না।

এমদাদ পীর সাহেবের কথা কান পাতিয়া শুনিতেছিল। কৌতূহল ও বিস্ময়ে সে অস্থিরতা বোধ করিতে লাগিল।

সে স্থির করিল, ইহার কাছে মুরিদ হইবে।

চার
----

পীর সাহেব অনেক নিষেধ করিলেন। বলিলেন : বাবা, সংসার ছাড়িয়া থাকিতে পারবে না, তাসাউওয়াফ বড় কঠিন জিনিস ইত্যাদি।

কিন্তু এমদাদ তাওয়াজ্জোহ লইল।

পীর সাহেব নিজের লতিফায় যেকের জারি করিয়া সেই যেকের এমদাদের লতিফায় নিক্ষেপ করিলেন।

সে দিবানিশি দুই চোখ বুজিয়া পীর সাহেবের নির্দেশমতো ‘এলহু এলহু’ করিতে লাগিল।

পীর সাহেব বলিয়াছিলেন : খেলওয়াৎ-দর-অঞ্জুমান দ্বারা নিজের কলবকে স্বীয় লতিফার দিকে মুতাওয়াজ্জোহ করিতে পারিলে তার কলবে যাতে আহাদিগয়তের ফয়েজ হাসেল হইবে এবং তার রুহ ঘড়ির কাঁটার ন্যায় কাঁপিতে থাকিবে।

কিন্তু এমদাদ অনেক চেষ্টা করিয়াও তার কলবকে লতিফায় মুতাওয়াজ্জোহ করিতে পারিল না। তৎপরিবর্তে তার চোখের সামনে পীর সাহেবের মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি ও তাঁর রুপা-বাঁধানো গড়গড়ার ছবি ভাসিয়া উঠিতে লাগিল।

ফলে তার কলবে যাতে আহাদিগয়তের ফয়েজ হাসেল হইয়া তার রুহকে ঘড়ির কাঁটার মতো কাঁপাইবার পরিবর্তে ফুফু-আম্মার স্মৃতি বাড়ি যাইবার জন্য তার মনকে উচাটন করিয়া তুলিতে লাগিল।

দিন যাইতে লাগিল।

অনাহারে-অনিদ্রায় এমদাদের চোখ দুটি মস্তকের মধ্যে প্রবেশ করিল। তার শরীর নিতান্ত দুর্বল ও মন অত্যন্ত অস্থির হইয়া পড়িল।

সে বুঝিল, এইভাবে আরো কিছুদিন গেলে তার রুহ বস্তুতই জেস্ম হইতে আযাত হইয়া আলমে-আমরে চলিয়া যাইবে।

সে স্থির করিল : পীর সাহেবের কাছে নিজের অক্ষমতার কথা নিবেদন করিয়া সে একদিন বিদায় হইবে।

কিন্তু বলি বলি করিয়াও কথাটা বলিতে পারিল না।

একটা নতুন ঘটনায় সে বিদায়ের কথাটা আপাতত চাপিয়া গেল! দূরবর্তী একস্থানে মুরিদগণ পীর সাহেবকে দাওয়াত করিল।

প্রকাণ্ড বজরায় এক মণ ঘি, আড়াই মণ তেল, দশ মণ সরু চাউল, তিনশত মুরগি, সাত সের অম্বুরি তামাক এবং তেরো জন শাগরেদ লইয়া পীর সাহেব ‘মুরিদানে’ রওয়ানা হইলেন।

পীর সাহেবের ভ্রমণবৃত্তান্ত ইংরাজিতে লিখিয়া কলিকাতায় সংবাদপত্রে পাঠাইবার জন্য এমদাদকেও সঙ্গে লওয়া হইল। নদীর সৌন্দর্য, নদীপারের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এমদাদের কাছে বেশ লাগিল।

পীর সাহেব গন্তব্যস্থানে উপস্থিত হইলেন।

তিনি মুরিদগণের নিকট যে অভ্যর্থনা পাইলেন, তাহা দেখিলে অনেক রাজা-বাদশাহ রাজত্ব ছাড়িয়া মোরাকেবা-মোশাহেদায় বসিতেন।

পীর সাহেব গ্রামের মোড়লের বাড়িতে আস্তানা করিলেন।
বিভিন্ন দিন বিভিন্ন মুরিদের বাড়িতে বিরাট ভোজ চলিতে লাগিল।

পীর সাহেবের একটু দূরে বসিয়া গুরুভোজন করিয়া এমদাদ এত দিনের কৃচ্ছ্রসাধনার প্রতিশোধ লইতে লাগিল। ইহাতে প্রথম প্রথম তার একটু পেটে পীড়া দেখা দিলেও শীঘ্রই সে সামলাইয়া উঠিল এবং তার শরীর হৃষ্টপুষ্ট ও চেহারা বেশ চিকনাই হইয়া উঠিতে লাগিল।

পীর সাহেবের ভাত ভাঙিবার কসরত দেখার সুযোগ ইতিপূর্বে এমদাদের হয় নাই। এইবার সে ভাগ্যলাভ করিয়া এমদাদ বুঝিল : পীর সাহেবের রুহানিশক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন, তাঁর হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে বেশি।
সন্ধ্যায় পুরুষদের জন্য মজলিশ বসিত।

রাতে এশার নামাজের পর অন্দরমহলে মেয়েদের জন্য ওয়াজ হইত। কারণ অন্য সময় মেয়েদের কাজে ব্যস্ত থাকিতে হয়।

সেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ ছিল।

স্ত্রীলোকদিগকে ধর্মকথা বুঝাইতে একটু দেরি হইত। কারণ মেয়েলোকদের বুদ্ধিসুদ্ধি বড় কম—তারা নাকেল-আকেল।

কিন্তু বাড়িওয়ালার ছেলে রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমন সম্বন্ধে পীর সাহেবের ধারণা ছিল অন্যরকম। মেয়ে-মজলিশে ওয়াজ করিবার সময় তিনি ইহারই দিকে ঘন ঘন দৃষ্টিপাত করিতেন।

তিনি অনেক সময় বলিতেন : তাসাউওয়াফের বাতেনি কথা বুঝিবার ক্ষমতা এই মেয়েটার মধ্যেই কিছু আছে। ভালো করিয়া তাওয়াজ্জোহ দিলে তাকে আবেদা রাবেয়ার দরজায় পৌঁছাইয়া দেওয়া যাইতে পারে।

এশার নামাজের পর দাঁড়িয়া চিরুনি ও কাপড়ে আতর লাগানো সুন্নত এবং পীর সাহেব সুন্নতের একজন বড় মো’তেকাদ ছিলেন।

ওয়াজ করিবার সময় পীর সাহেবের প্রায়ই জযবা আসিত।
সে জযবাকে মুরিদগণ ‘ফানাফিল্লাহ’ বলিত।

এই ফানাফিল্লাহর সময় পীর সাহেব ‘জ্বলিয়া গেলাম’ ‘পুড়িয়া গেলাম’ বলিয়া চিৎকার করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িতেন। এই সময় পীর সাহেবের রুহ আলমে-খাল্ক্ হইতে আলমে-আমরে পৌঁছিয়া রুহে ইয়াদানির সঙ্গে ফানা হইয়া যাইত এবং নূরে ইয়াদানি তার চোখের উপর আসিয়া পড়িত। কিন্তু সে নূরের জলওয়া পীর সাহেবের চক্ষে সহ্য হইত না বলিয়া তিনি এইরূপ চিৎকার করিতেন।

তাই জযবার সময় একখণ্ড কালো মখমল দিয়া পীর সাহেবের চোখ-মুখ ঢাকিয়া দিয়া তাঁর হাত-পা টিপিয়া দিবার ওসিয়ত ছিল।

এইরূপ জযবা পীর সাহেবের প্রায়ই হইত।

—এবং মেয়েদের সামনে ওয়াজ করিবার সময়েই একটু বেশি হইত।
এইসব ব্যাপারে এমদাদের মনে একটু খটকার সৃষ্টি হইল।

কিন্তু সে জোর করিয়া মনকে ভক্তিমান রাখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।

সে চেষ্টায় সফল হইবার আগেই কিন্তু ও-পথে বাধা পড়িল। প্রধান খলিফা সুফি বদরুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে পীর সাহেবকে প্রায়ই কানাকানি করিতে দেখিয়া এমদাদের মনের খটকা বাড়িয়া গেল। তার মনে পীর সাহেবের প্রতি একটা দুর্নিবার সন্দেহের ছায়াপাত হইল।

এমন সময় পীর সাহেব অত্যন্ত অকস্মাৎ একদিন ঘোষণা করিলেন : তিনি আর দু-এক দিনের বেশি সে অঞ্চলে তশরিফ রাখিবেন না।

এই গভীর শোক সংবাদে শাগরেদ-মুরিদগণের সকলেই নিতান্ত গম্গিন হইয়া পড়িল।

জনৈক শাগরেদ সুফি সাহেবের ইশারায় বলিলেন : হুজুর কেবলা, আপনি একদিন বলিয়াছিলেন : এবার এ অঞ্চলের মুসলমানগণকে কেরামতে-নেসবতে বায়নান্নস দেখাইবেন? তা না দেখাইয়াই কি হুজুর এখান হইতে তশরিফ লইয়া যাইবেন? এখানকার মুরিদগণের অনেকেই বলিতেছেন : হুজুর মাঝে মাঝে কেরামত দেখান না বলিয়া উম্মি মুরিদগণের অনেকেই গোমরাহ হইয়া যাইতেছে। মাওলানা লকবধারী ঐ ভণ্ডটা ও-পাড়ার অনেক মুরিদকে ভাগাইয়া নিতেছে; সে নাকি বৎসর বৎসর একবার আসিয়া কেরামত দেখাইয়া যায়।

পীর সাহেব গম্ভীর মুখে বলিলেন : (আরবি ও উর্দু) আল্লাহই কেরামতের একমাত্র মালিক, মানুষের সাধ্য কী কেরামত দেখায়? ওসব শয়তানের চেলাদের কথা আমার সামনে বলিও না। তবে হ্যাঁ, মোরাকেবায়ে-নেসবতে বায়নান্নাস-এর তরকিব দেখাইব বলিয়াছিলাম বটে, কিন্তু তার আর সময় কোথায়?

সমস্ত সাগরেদ ও মুরিদগণ সমস্মরে বলিয়া উঠিল : না হুজুর, সময় করিতেই হইবে, এবার উহা না দেখিয়া ছাড়িব না।

অগত্যা পীর সাহেব রাজি হইলেন।

স্থির হইল, সেই রাতেই মোরাকেবা বসিবে।

সারা দিন আয়োজন চলিল।

রাত্রে মৌলুদের মহফেল বসিল। হযরত পয়গম্বর সাহেবের অনেক অনেক মোওয়াজেযাত বর্ণিত হইল।

মৌলুদ শেষে খাওয়াদাওয়া হইল এবং তৎপর মোরাকেবার বৈঠক বসিল।

পাঁচ
----

পীর সাহেব বলিলেন : আজ তোমাদের আমি যে মোরাকেবার তরকিব দেখাইব, ইহা দ্বারা যেকোনো লোকের রুহের সঙ্গে কথা বলিতে পারি। আমি যদি নিজে মোরাকেবায় বসি, তবে সেই রুহ গোপনে আমার সঙ্গে কথা বলিয়া চলিয়া যাইবে। তোমরা কিছুই দেখিতে পাইবে না। তোমাদের মধ্যে একজন মোরাকেবায় বসো, আমি তার রুহের দিকে তোমরা যার কথা বলিবে তার রুহের তাওয়াজ্জোহ দেখাইয়া তার রুহের ফয়েজ হাসিল করিব। তৎপর তোমরা যে কেউ তার সঙ্গে কথা বলিতে পারিবে। তোমাদের মধ্যে কে মোরাকেবায় বসিবে?

সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করিতে লাগিল।

কেউই কোনো কথা বলিল না, মোরাকেবায় বসিতে কেউই অগ্রসর হইল না।

এমদাদ দাঁড়াইয়া বলিল : আমি বসিব।

পীর সাহেব একটু হাসিলেন।

বলিলেন : বাবা, মোরাকেবা অত সোজা নয়। তুই আজিও যে করে খফা-আম করিস নাই, মোরাকেবায় বসিতে চাস?

—বলিয়া তিনি হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।

দেখাদেখি উপস্থিত সকলেই হাসিয়া উঠিল।

লজ্জায় এমদাদের রাগ হইল। সে বসিয়া পড়িল।

পীর সাহেব আবার বলিলেন : কি, আমার মুরিদগণের মধ্যে আজিও কারো এতদূর রুহানি তরক্কি হাসেল হয় নাই, যে মোরাকেবায় বসিতে পারে? আমার খলিফাদের মধ্যেও কেহ নাই?

বলিয়া তিনি শাগরেদদের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন।

প্রধান খলিফা সুফি সাহেব উঠিয়া বলিলেন : হুজুর কেবলা কি তবে বান্দাকে হুকুম করিতেছেন? আমি তো আপনার আদেশে কতবার মোরাকেবায়-নেসবতে বায়নান্নাসে বসিয়াছি। কোনো নতুন লোককে বসাইলে হইত না?
সুফি সাহেব আরো অনেকবার বসিয়াছেন শুনিয়া মুরিদগণের অন্তরে একটু সাহসের উদ্রেক হইল।

তারা সকলে সমস্বরে বলিল : আপনিই বসুন, আপনিই বসুন।

অগত্যা পীর সাহেবের আদেশে সুফি সাহেব মোরাকেবায় বসিলেন।

পীর সাহেব উপস্থিত দর্শকদের দিকে চাহিয়া বলিলেন : কার রুহের ফয়েজ হাসিল করিব?

মুরিদগণের মুখে কথা যোগাইবার আগেই জনৈক সাগরেদ বলিল : এই মাত্র মৌলুদ-শরিফ হইয়াছে, হযরত পয়গম্বর সাহেবের মোয়াজেযা বয়ান হইয়াছে। তাঁরই রুহ আনা হোক।

সকলেই খুশি হইয়া বলিল : তাই হউক, তাই হউক।

তাই হইল।

সুফি সাহেব আতর-সিক্ত মুখমণ্ডলের গালিচায় তাকিয়া হেলান দিয়া বসিলেন। চারিদিকে আগরবাতি জ্বালাইয়া দেওয়া হইল। মেশক্ যাফরান ও আতরের গন্ধে ঘর ভরিয়া গেল।

পীর সাহেব তাঁর প্রধান খলিফার রুহে শেষ পয়গম্বর হযরত মোহাম্মদের রুহ-মোবারক নাযেল করিবার জন্য ঠিক তাঁর সামনে বসিলেন।

শাগরেদরা চারিদিক ঘিরিয়া বসিয়া মিলিত কণ্ঠে সুর করিয়া দরুদ পাঠ করিতে লাগিল। পীর সাহেব কখনো জোরে কখনো বা আস্তে নানা প্রকার দোয়া কালাম পড়িয়া সুফি সাহেবের চোখে-মুখে ফুঁকিতে লাগিলেন।

কিছুক্ষণ ফুঁকিবার পর শাগরেদগণকে চুপ করিতে ইঙ্গিত করিয়া পীর সাহেব বুকে হাত বাঁধিয়া একদৃষ্টে সুফি সাহেবের বুকের দিকে চাহিয়া রহিলেন।

সুফি সাহেবের বুকের দুইটা বোতাম খুলিয়া তাঁর বুকের খানিকটা অংশ ফাঁক করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। পীর সাহেব তাঁর দৃষ্টি সেইখানেই নিবদ্ধ করিলেন।

অল্পক্ষণের মধ্যেই সুফি সাহেবের শরীর কাঁপিতে লাগিল। কম্পন ক্রমেই বাড়িয়া গেল। সুফি সাহেব ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলিতে লাগিলেন এবং হাত-পা ছুড়িতে ছুড়িতে মূর্ছিতের ন্যায় বিছানায় লুটাইয়া পড়িলেন।

পীর সাহেব মুরিদগণের দিকে চাহিয়া বলিলেন : বদর বাবাজির একটু তগ্লিফ হইল! কী করিব? পরের রুহের উপর অন্য রুহের ফয়েজ হাসেল আসানির সঙ্গে করে বেল্কুল না-মোমকেন। যা হউক, হযরতের রুহ তশরিফ আনিয়াছেন। তোরা সকলে উঠিয়া কেয়াম কর।

—বলিয়া তিনি স্বয়ং উঠিয়া পড়িলেন। সকলেই দাঁড়াইয়া সমস্ব্বরে পড়িতে লাগিল : ইয়া নবি সালাম আলায় কা ইত্যাদি।

কেয়াম ও দরুদ শেষ হইলে অভ্যাসমতো অনেকেই বসিয়া পড়িল।

পীর সাহেব ধমক দিয়া বলিলেন : হযরতের রুহে পাক এখনো এই মজলিশে হাজির আছেন, তোমরা কেহ বসিতে পারিবে না। কার কী সওয়াল করিবার আছে করিতে পারো।

এমদাদ একটা বিষয় ধাঁধায় পড়িয়া গেল। সে ইহাকে কিছুতেই সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে পারিল না।

—মাথায় এক ফন্দি আঁটিয়া অগ্রসর হইয়া বলিল : কেবলা, আমি কোনো সওয়াল করিতে পারি?

পীর সাহেব চোখ গরম করিয়া বলিলেন : যাও না, জিজ্ঞাসা করো না গিয়া!

—বলিয়া কণ্ঠস্বর অপেক্ষাকৃত মোলায়েম করিয়া আবার বলিলেন : বাবা সকলের কথাই যদি রুহে পাকের কাছে পৌঁছিত, তবে দুনিয়ার সব মানুষই ওলি-আল্লাহ হইয়া যাইত।

এমদাদ তথাপি সুফি সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিল : আপনি যদি হযরত পয়গম্বর সাহেবের রুহ হন, তবে আমার দরুদ-সালাম জানিবেন।

হযরতের রুহ কোনো জবাব দিল না।

পীর সাহেব এমদাদের কাঁধে হাত দিয়া তাকে একদিকে ঠেলিয়া দিয়া বলিলেন : অধিক্ষণ রুহে পাকে রাখা বেআদবি হইবে। তোমাদের যদি কাহারও সিনা সাফ হইয়া থাকে, তবে আসিয়া যেকোনো সওয়াল করিতে পারো।

—বলিতেই পীর সাহেবের অন্যতম খলিফা মওলানা বেলায়েতপুরী সাহেব অগ্রসর হইয়া ‘আসসালামো আলায়কুম ইয়া রসুলুল্লাহ’ বলিয়া সুফি সাহেবের সামনে দাঁড়াইলেন।

সকলে বিস্মিত হইয়া শুনিল সুফি সাহেবের মুখ দিয়া বাহির হইল : ওয়া আলায়কুমস্ সালাম, ইয়া উম্মতি।

মওলানা সাহেব বলিলেন : হে রেসালাত-পনা, সৈয়দুল কাওনায়েন, আমি আপনার খেদমতে একটা আরজ করিতে চাই।

আওয়াজ হইল : শিগগির বলো, আমার আর দেরি করিবার উপায় নাই।

মওলানা : আমাদের পীর দস্তগিরত কেবলা সাহেব নূরে-ইয-দানির জওয়াশা সহ্য করিতে পারেন না, ইহার কারণ কী? তার আমলে কি কোনো গলদ আছে?

কঠোর সুরে উত্তর হইল : হ্যাঁ আছে।

পীর সাহেব শিহরিয়া উঠিলেন। তিনি কাঁদো কাঁদো সুরে নিজেই বলিলেন : কী গলদ আছে, ইয়া রাসুলুল্লাহ? আমার পঞ্চাশ বৎসরের রঞ্জ-কশি কি তবে সব পণ্ড হইয়াছে?

—বলিয়া পীর সাহেব কাঁদিয়া ফেলিলেন।

সুফি সাহেবের অচেতন দেহের মধ্যে হইতে আওয়াজ হইল : হে আমার পিয়ারা উম্মত, ঘাবড়াইও না। তোমার উপর আল্লাহর রহমত হইবে। তুমি মারফত খুঁজিতেছ। কিন্তু শরিয়ত ত্যাগ করিয়া কি মারফত হয়?

পীর সাহেব হাত কচলাইয়া বলিলেন : হুজুর, আমি কবে শরিয়ত অবহেলা করিলাম?

উত্তর হইল : অবহেলা করো নাই, কিন্তু পালনও করো নাই। আমি শরিয়তে চার বিবি হালাল করিয়াছি। কিন্তু তোমার মাত্র তিন বিবি। যারা সাধারণ দুনিয়াদার মানুষ তাদের এক বিবি হইলেও চলিতে পারে। কিন্তু যারা রুহানি ফয়েজ হাসিল করিতে চায়, তাদের চার বিবি ছাড়া উপায় নাই! আমি চার বিবির ব্যবস্থা কেন করিয়াছি, তোমরা কিছু বুঝিয়াছ? চার দিয়াই এ দুনিয়া, চার দিয়াই আখেরাত। চারদিকে যা দেখ সবই খোদা চার চিজ দিয়া পয়দা করিয়াছেন। চার চিজ দিয়া খোদাতায়ালা আদম সৃষ্টি করিয়া তার হেদায়েতের জন্য চার কেতাব পাঠাইয়াছেন। সেই হেদায়েত পাইতে হইলে মানুষকে চার এমামের চার তরিকা মানিয়া চলিতে হয়। এইভাবে মানুষকে চারের ফাঁদে ফেলিয়া খোদাতায়ালা চার কুরসির অন্তরালে লুকাইয়া আছেন। এই চারের পরদা ঠেলিয়া আল্মে-আমরে-নূরে-ইযদানিতে ফানা হইতে হইবে, দুনিয়াতে চার বিবির ভজনা করিতে হইবে।

পীর সাহেব সকলকে শুনাইয়া হযরতের রুহের দিকে চাহিয়া বলিলেন : এই বৃদ্ধ বয়সে আবার বিবাহ করিব?

—তুমি বৃদ্ধ? আমি ষাট বৎসর বয়সে নবমবার বিবাহ করিয়াছিলাম।

পীর সাহেব মিনতি ভরা কণ্ঠে বলিলেন : না রেসালাত-পনা : আমি আর বিবাহ করিব না।

—না করো, ভালোই। কিন্তু তোমার রুহানি কামালিয়ত হাসেল হইবে না, তুমি নূরে-ইযদানির জওয়ালা বরদাশ্ত করিতে পারিবে না। তোমার মুরিদানের কেহই নফসানিয়তের হাত এড়াইতে পারিবে না।

পীর সাহেব হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিলেন : আমি নিজের জন্য ভাবি না ইয়া রসুলুল্লাহ; কিন্তু যখন আমার মুরিদগণের অনিষ্ট হইবে, তখন বিবাহ করিতে রাজি হইলাম। কিন্তু আমি এক বুড়িকে বিবাহ করিব।

—তুমি তওবা আসতাগফার পড়ো। তুমি খোদার কলম রদ করিতে চাও? তোমার বিবাহ ঠিক হইয়া আছে। বেহেশতে আমি তার ছবি দেখিয়া আসিয়াছি।

—সে কে, ইয়া রসুলুল্লাহ?

—এই বাড়ির তোমার মুরিদের ছোট ছেলে রজবের স্ত্রী কলিমন।

—ইয়া রসুলুল্লাহ, আমি মুরিদের স্ত্রীকে বিবাহ করিব? সে যে আমার বেটার বউয়ের শামিল।

—ইয়া উম্মতি, আমি আমার পালিত পুত্র যায়েদের স্ত্রীকে নিকাহ করিয়াছিলাম, আর তুমি একজন মুরিদের স্ত্রীকে নিকাহ করিতে পারিবে না?

—ইয়া রসুলুল্লাহ, সে যে সধবা।

—রজবকে বলো স্ত্রীকে তালাক দিতে। কলিমন তোমার জন্যই হালাল। এ মারফতি নিকায় ইদ্দত পালনের প্রয়োজন হইবে না। আমি আর থাকিতে পারি না। চলিলাম। অররহহুমাতুল্লাহ আলায়কুম, ইয়া উম্মতি।

মূর্ছিত সুফি সাহেব একটা বিকট চিৎকার করিলেন। পীর সাহেবের অপর-অপর শাগরেদরা তাঁকে সজোরে পাখার বাতাস করিতে লাগিল।

মুরিদগণের সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও পীর সাহেব মাথা নাড়িয়া বলিতে লাগিলেন : চাই না আমি রুহানি কামালিয়ত। আমি মুরিদের বউকে বিবাহ করিতে পারিব না।

গ্রাম্য মুরিদগণ আখেরাতের ভয়ে পীর সাহেবের অনেক হাত-পায়ে ধরিল। পীর সাহেব অটল।

এই সময় প্রধান খলিফা সুফি সাহেব স্মরণ করাইয়া দিলেন : এই নিকাহ না করিলে কেবল পীর সাহেবের একারই রুহানি লোকসান হইবে না, তাঁর মুরিদগণের সকলের রুহের উপরও বহুত মুসিবত পড়িবে।

তখন পীর সাহেব অগত্যা নিজের রেজামন্দী জানাইয়া দাড়িতে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিতে লাগিলেন : ছোবহান আল্লাহ! এ সবই কুদরতে এলাহি! তাঁরই শানে আজিম! আল্লাহপাক নিজেই কোরান মজিদে ফরমাইয়াছেন : (আরবি ও উর্দু)....।

বাপ-চাচা পাড়া-পড়শির অনুরোধে, আদেশে, তিরস্কারে ও অবশেষে উৎপীড়নে তিষ্টিতে না পারিয়া রজব তার এক বছর আগে বিয়া-করা আদরের স্ত্রীকে তালাক দিল এবং কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছিতে মুছিতে বাড়ির বাহির হইয়া গেল।

কলিমনের ঘন-ঘন মূর্ছার মধ্যে অতিশয় ত্রস্ততার সঙ্গে শুভকার্য সমাধান হইয়া গেল।

এমদাদ স্তম্ভিত হইয়া বরবেশে সজ্জিত পীর সাহেবের দিকে চাহিয়া ছিল। তার চোখ হইতে আগুন ঠিকরাইয়া বাহির হইতেছিল।

এইবার তার চেতনা ফিরিয়া আসিল। সে একলাফে বরাসনে উপবিষ্ট পীর সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাঁর মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি ধরিয়া হেঁচকা টান মারিয়া বলিল : রে ভণ্ড শয়তান! নিজের পাপ-বাসনা পূর্ণ করিবার জন্য দুইটা তরুণ প্রাণ এমন দুঃখময় করিয়া দিতে তোর বুকে বাজিল না?

আর বলিতে পারিল না। শাগরেদ-মুরিদরা সকলে মার মার করিয়া আসিয়া এমদাদকে ধরিয়া ফেলিল এবং চড়-চাপড় মারিতে লাগিল।

এমদাদ গ্রামের মাতব্বর সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিল : তোমরা নিতান্ত মূর্খ। এই ভণ্ডের চালাকি বুঝিতে পারিতেছ না? নিজের শখ মিটাইবার জন্য সে হযরত পয়গম্বর সাহেবকে লইয়া তামাশা করিয়া তাঁর অপমান করিতেছে। তোমরা এই শয়তানকে পুলিশে দাও।

পীর সাহেবের প্রতি এমদাদের বেয়াদবিতে মুরিদরা ইতিপূর্বে একটু অসন্তুষ্ট হইয়া ছিল। এবার তার মস্তিষ্কবিকৃতি সম্বন্ধে তারা নিঃসন্দেহ হইল। মাতব্বর সাহেব হুকুম করিলেন : এই পাগলটা আমাদের হুজুর কেবলার অপমান করিতেছে। তোমরা কয়েকজন ইহাকে কান ধরিয়া গ্রামের বাহির করিয়া দিয়া আসো।
ভূলুণ্ঠিত পীর সাহেব ইতিমধ্যে উঠিয়া আসতাগফেরুল্লাহ পড়িতে পড়িতে তাঁর আলুলায়িত দাড়িতে আঙুল দিয়া চিরুনি করিতেছিলেন। মাতব্বর সাহেবের হুকুমের পিঠে তিনি হুকুম করিলেন : দেখিস বাবারা, ওকে বেশি মারপিট করিস না। ও পাগল। ওর মাথা খারাপ। ওর বাপ ওকে আমার হাতে সঁপিয়া দিয়াছিল। অনেক তাবিজ দিলাম। কিন্তু কোনো ফল হইল না। খোদা যাকে সাফা না দেন, তাকে কে ভালো করিতে পারে?