সন্ধ্যায় সমকালীন - প্রশান্ত মৃধা


সন্ধ্যায় সমকালীন
প্রশান্ত মৃধা
আলতাফের চায়ের দোকানের সামনে হুডতোলা রিকশা থেকে মাথা বের করে মুনা জানতে চাইল, ‘সজীব ভাই, বিপ্লবরে দেখিচেন?’
সজীব আর ইকু পাশাপাশি দোকানের ভেতরের দিকে বেঞ্চিতে বসা। মুখ সামনের দিকে। তাদের সামনে বসা আশেক আর দেবাশিস। মাঝখানে টেবিল, সেখানে একটু আগে খালি হওয়া চায়ের ছোট্ট গেলাস। সজীব ইকু আর আশেকের হাতে আধপোড়া সিগারেট। সজীব আর ইকু সামনের দিকে মুখ করে বসে থাকায় মুনাকে দেখতে পেল। আশেক আর দেবাশিস দেখল না। মুনা বিপ্লবের খোঁজ জিজ্ঞেস করেই হুডের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছে। রিকশাটাও দাঁড়িয়েছিল একেবারে আলতাফের দোকানের চুলোর সামনে। রিকশাঅলা সেখান থেকে একটু সমানে এগোলো। মুনা আবার গলা বের করছে। তার জিজ্ঞাসায় একপ্রকার উৎকণ্ঠা ছিল। তাতে সজীব হাতে ধরা সিগারেটটা ঠোঁটের কাছে নিয়েও থমকাল।
সামনে তাকায় সে, একই সময়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আশেক আর দেবাশিসের চোখে সজীবের চোখ। মুহূর্তে তারা পেছনে ঘুরে তাকিয়েছে। আর সজীব বলল, ‘না দেহিনি। কেন কী হইচে, ও মুনা?’
ইকু গলা নামিয়ে সজীবের কাছে জানতে চাইল, ‘মাইয়েডা কেডারে, এ সজীব?’
সজীব ইকুর উত্তর না দিয়ে মুনার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে রিকশা থেকে নেমেছে। নামামাত্র রিকশাটা এগিয়ে গেছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মুনা। দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, সে উদ্বিগ্ন। একশ’ ওয়াটের একটা বাল্ব, দোকানময় চা বানানোর চুলোর ধোঁয়াও কিছু আছে। চেষ্টা করেও মুনার মুখ যেন ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না। আবার যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে ঠিকঠাক পড়ে নেয়া যাচ্ছে সে মুখের উদ্বেগ। মুনা দোকানের দরজায় দাঁড়াতেই সজীব একটু দাঁড়ানোর ভঙ্গি মতো করে বসে জানতে চাইল, ‘কী হইচে, বিপ্লবরে পাতিচো না?’
‘না।’ মুনা বলল। যে ‘না’-টা তার মুখে ছিল, সেখান থেকে সহজে খসে পড়ল।
এদিকে ইকু, আশেক আর দেবাশিসের চোখ দেখে বুঝেছে তারা মুনাকে চেনে। সে-ই একমাত্র চেনে না এমেয়েকে। মুনা টেবিলের পাশে দাঁড়ায়। আশেকদেবাশিসের বাঁ দিকে, ইকু আর সজীবের ডান দিকে টেবিলের কোনায়। ইকুকে মুনা বলল, ‘কেমন আছেন, ইকু ভাই?’
ইকু ‘ভালো’ বলে আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে সত্যি মুনাকে চিনতে পারেনি। বিপ্লবকে চেনার চেষ্টা করছে। শহরে ইকুর পরিচিত অন্তত তিনজন বিপ্লব আছে। এক বিপ্লব তার পিঠাপিঠি বড় ভাই রুনুর সঙ্গে পড়ত, তার সঙ্গে ইকুর তুই-তোকারি সম্পর্ক, এই মেয়ে যে সেই বিপ্লবকে খুঁজছে না, তা বুঝতে পেরেছে; অন্য বিপ্লব তাদের ইস্কুলে নিচের ক্লাসে পড়ার সময় একসঙ্গে প্রচুর ফুটবল খেলেছে, মুনাকে দেখে বুঝেছে সেই বিপ্লবকে ও খুঁজছে না, কারণ সেই বিপ্লবের খোঁজে তার সজীবের কাছে আসার কথা না; বাকি যে বিপ্লব সে সজীবদের পাড়াতেই থাকত এক সময়, রামপালে একই গ্রামে বাড়ি, সম্পর্কে সজীবের কেমন যেন ভাই হয়, বয়সে তাদের চেয়ে বেশ ছোট। কিন্তু সেই বিপ্লবের সঙ্গে এই মেয়ের সম্পর্ক কী? আগে যতবার কোনো ছুটিতে শহরে এসেছে, কখনও দেখিনি ওই বিপ্লবের সঙ্গে অথবা একাকী!
সজীব বলল, ‘ফোন দাও। ফোন দিচো?’
‘কতবার,’ মুনা বলল, ‘তার তো দুটো সিম, দুটোই বন্ধ!’
‘বসো,’ সজীব বলল, ‘তোমার সাথে শেষ কহোন কথা হইচে?’
“বিকেলে, তখন সে খুলনায়— রওনা দিচে— ক’ল বাসস্ট্যান্ডে নাইমে আমারে ফোন করবে। তারপর আর কোনো খোঁজ নেই মানুষটার। ভাবলাম এই জায়গায় আড্ডা দিতিচে নাকি, সেই জন্যি খোঁজ করতি আসলাম।”
‘বসো।’ ইকু বলল, ‘এ রাজু,’ সে আলতাফের ছেলেকে ডাকল, ‘ওই চেয়ারডা টাইনে দে, মুইছে দিস।’ তারপর মুনাকে, ‘খুলনাদে বাসে ওঠার পর কথা হইনি তোমার সাথে?’
“হইচে। একবার। ক’ল ফয়সল ভাইর সাতে নাগেরবাজারের দিক যাবে। আমি ফয়সল ভাইরে ফোন করিচি— তার ফোনও বন্ধ—”
এতক্ষণ যেন ঘটনার একপ্রকার সূত্র পাওয়া গেল। মুনা বসেছে। চোখ-মুখের উৎকণ্ঠা কমেনি। কমার কথাও না। বসলেও যে কোনো সময় যেন উঠে যেতে পারে। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, ফয়সলের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে চারজনই এক সঙ্গে প্রায় একে অন্যের দিকে তাকাল। ফয়সল বিপ্লবের ভগি্নপতি, বড়ো বোন বুলার স্বামী। ইকু এইমাত্র বিপ্লবকে ঠিকঠাক শনাক্ত করতে পারল। কিন্তু মেয়েটা কে— বুঝে উঠতে পারেনি। তবে অনুমান করে নিল, বিপ্লবের বউই হবে।
মুনা তাদের পরস্পরের দিকে তাকানোটা খেয়াল করল। এমনকি এইসঙ্গে তার উৎকণ্ঠার বিষয়টাও যে একটু যেন তল পেয়েছে তাদের কাছে। দেবশিস জানায়, সে বাসা থেকে আসার পথে ফয়সলকে নাগেরবাজারের দিক থেকে ফেরিঘাটের দিকে যেতে দেখেছে। দেবশিস ভেবেছিল, জানতে চায় এইদিকে কোথায় যায়। কিন্তু ফয়সলের রিকশা দ্রুত বেরিয়ে গেলে তার আর জানা হয়নি।
সজীব প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দিল, ‘তা-লি মনে হয় ফয়সল ভাইর সাথে আছে।’
মুন বলল, ‘সেই জন্যি দুই জনেরই ফোন বন্ধ থাকপে?’
‘আইসে যাবে। টেনশন কইরো না। মনে হয় এমনি ফোন বন্ধ কইরে রাখিছে—’ ইকু জানতে চাইল, ‘চা খাও?’
‘না, এখন না। আগে বিপ্লবরে খুঁজি, দরকার আছে।’
‘চা খাইয়ে যাও?’ সজীব বলল।
‘না।’
‘ফোন কইরো আমারে— আমার ফোন নম্বর আছে তোমার কাছে?’
‘হু। আমার নম্বর আছে আপনার কাছে?’
সজীব মাথা ঝাঁকাল।
মুনা বেরিয়ে গেল।

আশেকই এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। মুনার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর প্রতিবারই সজীব আর ইকুর সঙ্গে তার কথোপকথন খেয়াল করেছে। মুনা বেরিয়ে যেতেই বলল, ‘এই জায়গা বইসে চা খা’লি বিপ্লব শুনলি ওরে আস্তো রাখপো না— ওই যে বাইরে যে কয়ডা [রাস্তার উল্টোদিকে পুরনো বার কাউন্সিলের সিঁড়িতে] বইসে রইচে তাগো আইসে জিগোবে মুনা এই জায়গায় বইসে চা খাইতে কি-না?’
‘কেন?’ সজীব জানতে চাইল, ‘আমাগো সাতে চা খালি কী হবে?’
‘পুরুষতন্ত্র—’
আশেক এভাবে কথা বলে। শুনে, হো হো হো করে হাসল ইকু। রাজু চায়ের গেলাস ধুচ্ছিল। ফিরে তাকাল। ইকু বলল, ‘এ রাজু ফিরে দেহিস কী? চা দে— আমারে রঙ চা। আর সিগারেট আন।’
ইকুর কথা শেষ হতেই আশেক বলল, ‘নিজে যেহানে যা করুক। মাল খাইয়ে পইড়ে থাকুক আর ফান্টু খাক, আর ঝন্টু ডলতি ডলতি হাতের তালু সমান বানাইয়ে ফেলুক আর যাই করুক— দরকার হলি মাগিবাড়ি যাক কোনো সমস্যা নেই— বউ পরপুরুষের সাথে বইসে চা খাইচে তাতে যত সমস্যা।’
ফান্টু অর্থাৎ ফেনসিডিল, ঝন্টু অর্থাৎ গাঁজা। স্থানীয় নেশাখোররা এভাবে বলে, যারা এতে অভ্যস্ত নয় কিন্তু বিষয়টা জানে, তারাও নিজেদের ভেতরে এভাবে বলে। আশেকের কথা শুনে রাজু হাসল, ‘আশেক কাকু, আস্তে—’
ইকু আবার হাসল। হো হো শব্দ তুলে। সেই ফাঁকে সজীব প্রায় স্বগতোক্তি করল, ‘আমার সাতে বইসে চা খা’লিও পর পুরুষ?’
‘নয়তো কী? শরিয়ত মোতাবেক আপনি তো তাই? নাকি? যতই আপনি বিপ্লবরে ন্যাংটা কাল দে চেনেন— আপনার ছোটো বুন সুপ্তি আর মুনা খুলনা ভার্সিটিতে এক সাথে পড়ূক— তাতে কী আসে যায়? বউ তো বাড়ির বউ— হোক এই শহরের মাইয়ে কিন্তু আলতাফের চার দোকানে বইসে চা খাইছে— তা বিপ্লবের মতো মানুষ সহ্য করবে কী করে? মুনার ঠেঙানির ভয় আছে না?’
ইকু আবার শব্দ তুলে হাসে। সজীব বলে, ‘তোর হইচে কী, বোকাচোদার মতো হাসতিচিস কেন?’
‘এ বুদ্ধিচোদা, আমি বোকাচোদার মতন হাসলাম কহোন? সব বুইজে আমি আসলে বোকাচোদা সাইজে গেইচি— হাসতিচি জ্ঞানীর মতন। আমার কতখানিক জ্ঞান লাভ হলো, তুই বুঝদি পারতিচিস? দেবা [দেবাশিস] যা কওয়ার মুনারে কইয়ে দিচে— আসল কথা। আর আমিও যা বোঝার বুইঝে গেইচি—’
‘এ কী বুজিচিস তুই?’ সজীব জানতে চায়।
‘ইহু— এহোন কওয়া যাবে না।’
‘কেন?’
‘আগে দেবার কথা শুইনে লই— তারপর ক’বানে—’
দেবাশিস গলা নামিয়েছে বলে, ‘আমার আর কথা কী, যা কওয়ার কইচি।’
দেবাশিসের এ কথার অর্থ সজীব কিছুই বোঝেনি। ইকুও না। তবে, আশেকের মুখ দেখে তারা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পেরেছে ঘটনাটা কী? হয়তো দেবাশিস আর আশেক বিষয়টা কিছুটা হলেও জানে। তাই স্বাভাবিক। ইকু বহুদিন ধরে ঢাকায় থাকে। সজীব থাকে খুলনায়। এসেছে সুপ্তির বিয়ের ব্যাপারে, কথা হচ্ছে এ জন্য। ইকু এসেছে এনজিওর কাজে। দেবশিস ঢাকায় যায় আসে। ঢাকায় গেলে ভাইয়ের বাসায় থেকে কীসব কোচিং করে। বিদেশে যাবে। আশেক সার্বক্ষণিক পার্টি কর্মী। এমন না যে তাদের এ মুহূর্তের এখানে বসা খুব হিসেবে করে।
সন্ধ্যা হয়েছে, ইকু আর সজীব আলতাফের চায়ের দোকানে এসেছে, সেখানেই বসাছিল দেবাশিস আর আশেক— আড্ডা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ হলো বসেছে। চা খেয়েছে একপ্রস্থ। এর ভেতরে মুনা আসায় তাদের আলোচনা ঘুরে গেছে। হয়তো ইকুর জন্যই এখন মুনা আর বিপ্লবকে নিয়ে আগ্রহী তারা। কিন্তু দেবাশিসের শেষ বিকেলে ফয়সলকে দেখা আর সে কথা মুনাকে বলার ভেতর দিয়ে তারা বুঝতে পারল— আশেক আর দেবাশিস কিছু একটা অনুমান করছে, আর বিষয়টা তাই। আশেক সে কথা ইঙ্গিতে বলেওছে। হয়তো তাদের দু’জনের চেয়ে ওরা বয়সে ছোট বলে কথার অনেকখানিকই রেখেঢেকে বলছে।
ইকু বলল, ‘দেবা, কী হইচে— কী ক’তিলে [বলছিলে]?’ বলেই রাজুকে বলল, ‘এ রাজু, যা কয়ডা সিগারেট নিয়ে আয়।’ এরপর সজীবকে, ‘এ সজীব, এই মেয়ের সাথে, কী যেন নাম মুনা— বিপ্লবের বিয়ে হইতে কবে?’
‘তা বছরখানেক,’ আশেক বলল, ‘বিয়ে আর কী? বিপ্লব জোর কইরে উঠয়ে নিয়ে আইচে।’
‘মানে?’ ইকু ধন্ধে পড়ল। সজীব সবই জানে। সুপ্তির কাছে শুনেছে।
‘মানে আর কী? ওরা তো আগে বাগেরহাট থাকত। তারপর মুনা খুলনা ভার্সিটিতে চান্স পালি ওরা খুলনা চইলে যায়। ওর ছোটভাই জিলা ইস্কুলে ভর্তি হইচে। এই সময় বিপ্লবের সাথে প্রেম... কিন্তু মুনার বাপ তো বিপ্লবের চৌদ্দগুষ্টি ভালো কইরে চেনে... আর দিনে দিনে মুনাও বুঝদি পারছি বিপ্লব নেশা করে... মনে হয় রাজি ছিল না বিয়ে করতি...’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী? একদিন গল্লামারি যাইয়ে উঠোইয়ে নিয়ে আইচে... ফয়সল ভাই আর বিপ্লব... সাথে বাগেরহাটের আর কয়জন কৃতী সন্তান... এহোন তো মুনার ক্যারিয়ার শেষ... দিন শেষে বিপ্লব কোথায় আছে খুইচে বেড়ায়?’
‘এর সাথে সজীবের কাছে এইভাবে এইসব কওয়ার সম্পর্ক কী?’
‘আছে। সেই জায়গায় তো কবি নীরব... চা খাতি সমস্যা নেই... কিন্তু—’
এবার সজীব ধাঁধায় পড়ল। একেবারে অবুঝ চোখে সে আশেকের দিকে তাকাল। সন্ধ্যাটা এখন বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে। বাসায় কোনো কাজ আছে কি-না কে জানে। সুপ্তি ফোন করলেই সে উঠে যাবে। কিন্তু সুপ্তি ফোন করছে না। আম্মা সুপ্তিকে নিয়ে হরিণখানা গেছে বড় খালার বাসায়। হয়তো ফেরেনি। এসব ভেতরে ভেতরে ভেবে নিয়ে সজীব আশেকের মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু আশেক কথা থামিয়েছে। দেবাশিস বলল, ‘মেয়েটা আছে মহাসমস্যায়... কয় মাসে কী হইয়ে গেইচে... এহোন তাকানো যায় ওর মুখের দিকে... আগে কী সুন্দর দেখতি ছেলো...
‘দেবা আস্তে কথা ক’— বিপ্লবের বউরে তুই সুন্দর কইচিস— দেখা গেল তোর চোখ খুইচে নিয়ে গেইচে— তা আবার আমার মতো বামপন্থির পাশে বইসে কইচিস— সরকারি দলের নেতার বউ—’
‘ও নেতা নাকি?’ ইকু জানতে চায়।
‘পাতি— তয় নেশাখোরগো নেতা। নেশাখোরগো এট্টা সর্বদলীয় সার্কেল আছে— সেই সার্কেলের নেতৃত্ব দেয়—’
কিন্তু এতে সজীবের কাছে মুনার আসার রহস্য ঘোচে না। ইকুর মতো প্রায় কিছুই না জানলেও সজীব শহরের বর্তমান পরিস্থিতির কিছু জানে। জানে বিপ্লব আর মুনার সম্পর্কেও। কিন্তু আশেক যে ইঙ্গিত দিল এইমাত্র তার কোনো কিছুই সে বুঝতে পারল না। ফলে, সজীব আশেককে বলল, ‘আমার কাছে এভাবে বিপ্লবের খোঁজ জানতে চাওয়ার কারণ কী, আশেক?’
আশেক কোনো কথা বলল না। চুপ করে থাকল। দেবাশিসের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘এ দেবা, ক— কী সম্পর্ক?’

তবে, মুনা আলতাফের চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে নাগেরবাজারের দিকে গেছে। সে কিছুটা হলেও জানে কোথায় ফয়সল অথবা বিপ্লবকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ফয়সলের বন্ধু হাবলু বাসায় নেই। হাবলুর ফোনও বন্ধ। আর বিপ্লব এইদিকে মাঝে মাঝে কুতুবের বাসায় আসে, কিন্তু মুনা কুতুবের বাসা চেনে না। সে বিপ্লব আর কুতুবের বন্ধু টগরকে ফোন করে। টগর তাকে কুতুবের নম্বর এসএমএস করে। সেই নম্বরে কুতুবকে ফোন করলে কুতুব জানায়— সে এখন আড়তে, নাগেরবাজার। বিপ্লবের সঙ্গে দুপুরের পরে তার আর কোনো কথা হয়নি। তবে, কুতুব এখনই খুঁজতে বের হচ্ছে কোথায় বিপ্লব আছে। কিন্তু মুনা জানে কুতুব খুঁজতে বের হবে না বিপ্লবকে। এক কাজ একজন মানুষ কয়দিন পর পর করবে কেন? আর যদি করেও তা আরও পরে, এখন কুতুব আড়ত থেকে বের হবে না।
এই সময় সজীবকে ফোন করে মুনা। বলে : সজীব ভাই, আমি নাগেরবাজার আইচি। বিপ্লবরে কোথাও পালাম না। এখন বাসায়ও যা’তি পারতিচি না। আমার শাশুড়ি আইজকে আমারে ভীষণ গালাগালি করিচে। যা বলিছে তা আপনারে এখন বলতি পারব না। সামনাসামনি দেখা হলি ক’বানে—’
বিপ্লব মাঝখানে একবার ‘হু’ বলল। তারপর মুনা আবার বলে যায় : বিপ্লবরে না নিয়ে আমি বাসায় ঢুকতি পারব না। আপনি দেইখেন তো বারের সামনে যারা বইসে আছে তাগো মধ্যি কেউ বিকেলে কি সন্ধ্যার পরে বিপ্লবরে দেহিচে কি-না। একটু খোঁজ নেন... প্লিজ...’
মুনার গলা ধরে এসেছে। বিপ্লব বলল, ‘হ্যালো মুনা, শোনো...’
মুনা বলে চলে, ‘আপনারে ওই সময় কিছু কথা ক’তি চাইলাম, কিন্তু আপনার সামনে সবাই, সেই জন্যি ক’তি পারলাম না। আচ্ছা পরে ক’বানে— আমি দেখি বিপ্লব রেললাইনের ওদিকে গেইচে নিকি?’
সজীব ফোন রাখতেই আশেক সজীবের দিকে তাকাল। তারপর আশেকের দিকে। ইকু বুঝতে পারল না, কিন্তু বোঝার চেষ্টা করল। আশেক বলল, ‘কী মুনার ফোন?’
ইকু প্রসঙ্গটা পাল্টাতে চাচ্ছিল। পাল্টেওছিল। কিন্তু মুনার এই ফোনে আবার তারা প্রায় অজানিতে আগের পরিস্থিতিতে ঢুকল।
সজীব ‘হু’ বলতেই আশেক বলল, ‘কইনেই [বলেছি না], মুনা আপনারে ফোন করবে— জানতাম—’
‘কেন?’ ইকু জিজ্ঞাসা করল। সজীব আশেকের আচরণে আর দেবাশিসের সায়ে একটু হকচকিয়ে গেছে। বুঝতে পারছে না, এখন কী বলবে।
আশেক বলল, ‘এ দেবা, এই বড় ভাই দুজনরে বুঝোইয়ে ক— কেন ফোন করিছে। কয়দিন বাদে বাদে শহরে আসে আর জানে তো না যে মাইয়ে-ঝি-বউ এখন কী পদের জিনিসে পরিণত হইচে?’
‘কী হইচে?’ ইকু বলে।
‘কী আর? বিপ্লব ভাইরে রাতে ফোন করবে। কবে তারে পারলি কিছু টাকা ধার দিতি। নয়তো ফ্লেক্সি করতি। দেহা গেল কাইলকে ক’ল ওরে খুলনা নিয়ে যা’তি—’
ইকু বিস্মিত, ‘তাই নাকি?’
সজীব চুপ। তার বোনের বান্ধবী। অনেক দিন ধরে চেনে। সে এই মুহূর্তে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চায় না।
‘তাই নাকি? তাই ঘটে।’ ইকু বলে।
আশেক সিরিয়াস ছেলে, তার কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো কথা নেই। কিন্তু একটু আগের ঘটনার সঙ্গে এখন ইকু আর সজীব কোনোভাবে চিন্তার দৌড় মেলাতে পারে না। পরস্পরের দিকে তাকায়। ইকু সজীবকে বলে, ‘এ সজীব কয় কী? ঘটনা এরকম নাকি? এতদূর? বুড়ো হইয়ে গেলাম নাকি? কিছুই তো বুঝি না।’
দেবাশিস বলে, ‘বুড়ো হবে কেন? বুড়ো হলি কী আর এত কিছু হয় আপনাগো নিয়ে?’
আশেক বলল, ‘দেখলেন না কীভাবে কেমন আছে ইকু ভাই জানতে চাইল!’
‘ধুস, কী কও এই সমস্ত—’
‘সত্যি— দেইহেন— আপনারা বড় ভাই, আপনাগো সাতে ইয়ার্কি মারি নাকি? দেইহেন— গরিবের কতা কহোন বাসি হলি তারপর ফলে—’
‘এ রাজু, চা দে—’ ইকু বলে সজীবের দিকে তাকাল, ‘চা খা আর একবার টেনশন করিস না— রিয়েলিটি— বাস্তবতা—
‘না। পরাবস্তবতা—’
ইকু আবার গলা ছেড়ে হাসল। সজীব শুকনো মুখে। সুপ্তি কেন ফোন করছে না ভাবল। তারপর বলল, ‘ইকু, পরাবাস্তবতা অর্থ যেন কী?’
‘কোনো অর্থ নেই— চা খান—’ দেবাশিস এবার আশেককে বলল, ‘তুই এট্টু ভালো কইরে বুঝোইয়ে দে—’
‘বুঝোনোর কিছু নেই। সময় হলি আপনিই বুঝে যাবেন।’
সজীবের ফোন আসে। সুপ্তি ফোন করেছে। সজীব বলে, ‘আসতিচি।’ ফোনটা পকেটে রেখে ওঠামাত্র সজীবের কাছে মুনা ফোন করে, ‘সজীব ভাই, কথা আছে আপনার সঙ্গে—’ সজীব বলে, ‘মুনা, আমি এখন ব্যস্ত— তুমি পরে ফোন করো।’ মুনা বলে, ‘আচ্ছা, রাতে ফোন করবানে—’
ইকু আশেকের দিকে তাকায়। সজীব উঠে যায়, ‘আমি এট্টু বাসার দিক গেলাম। ইকু আধঘণ্টা বাদে আমারে ফোন করিস— ফ্রি থাকলি আসপানে— তুই কোথায় আছিস আমারে জানাস?’
সজীব বেরিয়ে যেতেই আশেক বলে, ‘দেইখেন ইকু ভাই, মুনা সজীব ভাইরে কী কয়। যা কইচি তাই ঘটপে।’
ইকু বিস্ময়ের সঙ্গে আশেক আর দেবাশিসের দিকে চেয়ে থাকে।

মুনা পরে সজীবকে আবার ফোন করে, সন্ধ্যাটা পুরোপুরো রাতে পরিণত হওয়ার আগেই। আর, আশেক যা যা বলেছিল, প্রায় তাই বলে। সজীব ফোন করে বলে ইকুকে।
সৌজন্যে : সমকাল, ২৩/৮/১৩

0 comments:

Post a Comment