লেখক হওয়া - বুদ্ধদেব গুহ


লেখক হওয়া কলকাতা থেকে শ্যামল এসেছিল। আজই ফিরে গেল। ওকে মোতিমহলে খাইয়ে তারপর নিউদিল্লি স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে এলাম। মনটা খুব ভালো লাগছিল। ও চলে গেল বলে নয়, অনেকদিন পরে কাউকে স্টেশনে এসে সি-অফ করলাম বলে। আগে যখন অবকাশ বেশি ছিল, সচ্ছলতা ছিল না, তখন এমন ছোটো ছোটো সুখের বড়ো আনন্দগুলি আমার করায়ত্ত ছিল। আজ ব্যস্ততা বেড়েছে, সচ্ছল হয়েছি, কিন্তু জীবন থেকে উদবৃত্ত সময় গেছে উধাও হয়ে। প্রায়ই মনে হয়, আগে খারাপ থাকলেও এখনকার চেয়ে অনেক বেশি ভালো ছিলাম। ট্রেন ছাড়ার আগে শ্যামল বলল, তুই তো এখন আমাদের গর্ব। আমার এক পিসতুতো শালি আছে যুঁই, সে তো বিশ্বাসই করে না যে তুই আমার বন্ধু। খুব সুন্দরী, সপ্রতিভ মেয়ে। যদি কখনো কলকাতা আসিস একদিন কিন্তু আমার সঙ্গে যেতেই হবে ওদের বাড়ি। নইলে আমার মুখ থাকবে না। আমি বাল্যবন্ধুকেও কৃতার্থ করার ভঙ্গি করে হেসে বললাম, কলকাতা যাই, তখন মনে করিয়ে দিস।

শ্যামল বলল যাইই বলিস, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সরকারি বা বেসরকারি অফিসার যাইই হতিস না কেন এমন পরিচিতি বা সম্মান আর কোনো কিছুতেই পেতিস না। লেখককে কে না চেনে, কে না সম্মান করে? সত্যিই আমরা সকলেই তোকে নিয়ে খুব প্রাউড।

হৌজ-খাস-এ বাড়ি করেছি আমি। সেকেন্ড-হ্যান্ড ফিয়াটও কিনেছি একটা। আমার লেটেস্ট বই খুব ভালো বিক্রি হচ্ছে। অনেকে বলছেন কোনো প্রাইজ-টাইজও পেয়ে যেতে পারি। প্রাইজে অবশ্য আমার প্রয়োজন নেই, পাঠকের হৃদয়ের প্রাইজ পেয়েই আমি খুশি।

বাড়ি ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে লেখার টেবিলে এলাম। সাধারণত রাতেই লিখি। নিরিবিলিতে। গভীর রাত অবধি লিখে আটটা অবধি ঘুমোই। রিমা প্রথম প্রথম রাগ করত কিন্তু এখন বোঝে যে, লেখাই আমার জীবিকা। জীবিকার কারণে কোনো কিছুতেই 'না' বলা চলে না।



রিমা গেছে বাপের বাড়ি। এলাহাবাদে। ওর খুড়তুতো বোনের বিয়ে। আমি বিয়ের দিন সকালে গিয়ে পৌঁছোব ঠিক আছে।

চিঠিগুলো প্রথমে একজায়গা করে তারপর সব ক-টি লেটার ওপেনার দিয়ে খুলে ফেলে তারপরে এক এক করে পড়ি আমি। দিনের শেষে এইই আমার পরম প্রাপ্তি। কত জায়গা

থেকে কত বিভিন্ন বয়সি এবং সমাজের কত বিভিন্ন স্তরের মানুষ যে চিঠি লেখেন! যতই কাজ থাকুক, প্রত্যেক চিঠির জবাব আমি নিজে হাতেই দিই। সময়াভাব এবং ডাকমাশুলের কারণে অসুবিধা যে হয় না, তা নয়। তবুও, দেখি কতদিন পারি এই অভ্যাস বজায় রাখতে।



বেশিই প্রশংসার চিঠি, ভালোলাগার চিঠি। কিছু পুরোনো পাঠক-পাঠিকার লেখা, যাঁদের বেশির ভাগের সঙ্গেই চাক্ষুষ পরিচয় নেই। কিন্তু চিঠির মাধ্যমে যাঁদের সঙ্গে এক আশ্চর্য উষ্ণ সহমর্মিতার উজ্জ্বল হার্দ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে শুধু চিঠিরই মাধ্যমে। খুব ভালো লাগে আমার দিনের এই সময়টুকুতে। দেশ-বিদেশের জানলা খুলে যায় চোখের সামনে। দু কলম লিখতে পারি বলে এক ধরনের নিরুচ্চারিত শ্লাঘাও বোধ করি।

একটি চিঠি খুলেই চমকে গেলাম। হাতের লেখাটি পরিচিত নয়। মেয়েলি। বেশ ভারী, অনেক পাতার।

মান্যবরেষু,

লেখক হয়ে তো খুব নাম ডাক করেছেন। ছিলেন উপোসি ছারপোকা এখন তো পোয়াবারো। লিখুন, লিখে বড়োলোক হোন এসব তো ভালোই। খ্যাতি প্রতিপত্তি-ও বাড়ুক দিনকে দিন। কিন্তু আমার এমন সর্বনাশ না করলেই চলত না আপনার? কোনো ক্ষতি তো করিনি আমি বা আমার স্বামী! অথচ এ আপনার কেমন ব্যবহার?

আপনি আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি সম্বন্ধে কতটুকু জানেন? আমরা দু-জনে বড়োছেলে এবং বৌমা হিসেবে ওঁদের জন্যে কী করি না করি সে সম্বন্ধে, আপনার কোনো ধারণাই নেই। 'আশা' বলে যে গল্পটি আপনি দিল্লির দিগঙ্গন কাগজে মাসখানেক আগে লিখেছিলেন সেটি যে কাদের নিয়ে লেখা তা আমরা আপনার, এবং আমার স্বামীরও, একজন বন্ধুর কাছ থেকেই জানতে পারি। ছিঃ ছিঃ।

আপনি কি জানেন যে, বার্নপুরে আমরা কারো কাছে মুখ দেখাতে পারছি না? পারছি না বহরমপুরেও যেতে। কারণ ওই গল্পর কথা আমার শশুর-শাশুড়ির গোচরেও আনা হয়েছে। আপনি গল্প লিখেই ক্ষান্ত হননি, প্রত্যেককে পাঠিয়েছেনও তা। কি অন্যায় অপরাধ করেছিলাম আমরা আপনার কাছে তা জানতে পারি কি?

ছিঃ ছি। আমার স্বামী ভেবে ভেবে এবং দুঃখে অভিমানে একদিনও রাতে ঘুমোতে পারেন না। তিনি কী অসম্ভব রোগা হয়ে গেছেন যে, তা না দেখলে বুঝতে পারবেন না। আমার স্বামীর কিছু একটা হয়ে গেলে আমি আপনার বিরুদ্ধে পুলিশ কেস করব। একথা জানবেন।

আপনাকে আমি ঘেন্না করি। আপনি লেখক না ছাই। আপনি আমার স্বামীর বন্ধু ননঞ্জ, শত্রু। আপনার মঙ্গল কখনো হবে না।

পুঃ--আমার স্বামী জানেন না যে এ চিঠি আমি লিখেছি আপনাকে। ইতি আপনার অনেক পাঠিকার একজন পাঠিকা।

চিঠিটিতে তারিখ নেই, কোথা থেকে লেখা তাও বলা নেই, লেখিকার নাম পর্যন্ত নেই। খামটা উলটেপালটে দেখলাম। বার্নপুর পোস্ট অফিসের সিল দেওয়া।

হঠাৎই আমার বুকে যেন কেউ ছুরি বসিয়ে দিল। এমন কষ্ট হতে লাগল বুকের মধ্যে যে, কী বলব। চেয়ার ছেড়ে উঠে আমি খাবার টেবিলে গিয়ে জল ঢেলে খেলাম। তবুও অস্বস্তি গেল না। একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে বসলাম ইজিচেয়ারে।

পুজো এসে গেছে। বেশ হিম হিম ভাব এখন সন্ধ্যের পর। বাইরে হ্যালোজেন ভেপার ল্যাম্পের বুড়ি--কমলারঙা আলোর ভাসা পথটা সফদারজাঙ্গ-এর দিকে চলে গেছে।

ভাবতে ভাবতে সিগারেটে আঙুল পুড়ে গেল যখন, তখন হুঁশ হল। আবারও একটা সিগারেট ধরালাম।

লেখক হয়েছি কি না জানি না। লেখালেখি করি এইই পর্যন্ত। এই লেখালেখির কারণেই মোটামুটি সুখের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছি আজ পনেরো বছর হল। সরকারি চাকরি । কাজ ছিল না তেমন, উন্নতির সম্ভাবনাও নয়, তবে বাঁধা মাইনে। তবে উপরিও ছিল, যারা নিত, তাদের জন্যে। নাম-সই করা আর বাকি সময়ে রাজনীতি, খেলা, সিনেমা সাহিত্যের আলোচনা অফিসেরই কাজের সময়টুকুতে। পেনসন পর্যন্ত ছিল। সেখানে কাজ ছাড়া আর কোনো কিছু করতেই অসুবিধা ছিল না। অনেকেই বলেছিলেন যে অমন বিনা-কাজের না-যাওয়া চাকরি কেউ ছাড়ে? ওটাও থাক। লেখাও থাক।

তবু, ছেড়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করতাম যে, লেখা ব্যাপারটা পার্ট-টাইমের নয়। পার্ট-টাইম স্টেনো-টাইপিস্ট হওয়া যায়, অ্যাকাউন্টেন্ট অথবা ডাক্তারওঞ্জ, কিন্তু লেখক নয়। আমাদের পূর্বসূরিদের মধ্যে অধিকাংশই তো ছিলেন হোল-টাইম লেখক।

কিন্তু রিমা জানে আর আমিই জানি, চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর কতখানি আর্থিক ও মানসিক কষ্টর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল আমাদের।

যখন হোল-টাইম লেখক ছিলাম না, তখন দূর থেকে লেখার জগতকে মনে হত দেবলোকের কোনো সভা। সরস্বতীর বরপুত্রদের মিলনস্থলই বুঝি। সেই জগতেই সব পিছুটান ছেড়ে এসে ঢুকে পড়ার পরই হাড়ে হাড়ে জানতে পেলাম সেই জগতের ক্ষুদ্রতা, নীচতা।

সাহিত্যের জগতেও অন্য যে কোনো জীবিকারই মতো একে অন্যকে মাড়িয়ে যাওয়া, ঠেলে ফেলার প্রবণতা, এখানেও ঈর্ষা, দ্বেষঞ্জ, এখানেও অসুস্থ অর্থ এবং যশের কাঙালপনা আছে তা আগে একেবারেই জানা ছিল না।

সাহিত্য-জগৎ আমাকে ক্লিষ্ট করেছে, বিমর্ষ করেছে, হতাশও করেছে। কারণ, এইই আমার জীবিকা। হয়তো সব জীবিকাই করে।

অনেক, অনেক অনেকই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে এসে আমি লেখক হয়েছি। মানে, হওয়ার চেষ্টা করছি আর কী! তবু এই চিঠির কষ্টটা আমাকে যেন একেবারে বিবশ করে দিল। চিঠিটি পড়া শেষ করে কোনোই সন্দেহ থাকল না যে এটি আমার বন্ধুপত্নী লিলির লেখা।

আমরা তিন বন্ধু ছিলাম। বড়ো কাছের বন্ধু। তিনজনেই কলকাতায় পড়তাম ইউনিভার্সিটিতে। হিন্দু হস্টেলে থাকতাম। লিলির স্বামী সুগতই সবদিক দিয়ে ভালো ছিল আমাদের মধ্যে।

পড়াশুনোয় ভালো। রাশভারি। এবং প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব ছিল তার। অথচ রসিকও ছিল অত্যন্ত। বহরমপুরের ছেলে। অতি ভালোমানুষ। ওকে দেখে ছোটোবেলা থেকেই আমার ধারণা হয়ে গেছিল যে, বহরমপুরের লোকমাত্রেই ভালোমানুষ।

দ্বিতীয়জন ছিল শ্যামল। যে শ্যামল আজ চলে গেল। শ্যামল সরকার। আর ছিলাম তৃতীয় আমি। এই অধম আশিস কর। বন্ধুরা ডাকত, আকর বলে।

আমরা তিনজনেই ভালো ফুটবল খেলতাম। সুগত ইউনিভার্সিটির ফুটবল টিমের ক্যাপটেন ছিল। রাইট-ইন-এ খেলত। চমৎকার। বলের উপর এমন কন্ট্রোল বাঘা-বাঘা খেলোয়াড়দেরও দেখিনি।

সেই সব রঙিন জার্সি-পরা, খোলা-হাওয়ার, পরিশ্রমজনিত ঘামের-গন্ধের দিনগুলি হারিয়ে গেছে। আর আসবে না কখনো। তার সঙ্গে হারিয়ে গেছে ছাত্রাবস্থার অনাবিল, নিঃস্বার্থ, উজ্জ্বল সব বন্ধুত্ব। জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ামাত্রই যেন মানুষের মাপ ছোটো হতে থাকে। সেই ক্ষয়রোগে বড়ো বড়ো মানুষ নুনের পুতুলের মতো গলে গলে ছোটো হয়ে যায় চোখের সামনে। তাদের সংসারের দায়-দায়িত্ব বাড়ে, টাকা বাড়ে অথবা কমে। অহং বাড়ে, অথবা হীনমন্যতা। ঈর্ষা বাড়ে, দম্ভ বাড়ে, পরশ্রীকাতরতা ও দৈন্যঞ্জ, রোজগার বাড়ার বা কমার সঙ্গে সঙ্গে। আর তার ভিতরের মানুষটা লিলিপুট হয়ে যেতে থাকে ক্রমশ।

মনে পড়ল, সুগতর বিয়েতে আমি বরযাত্রীও গেছিলাম। বার্নপুরেই বড়ো চাকরি করতেন লিলির বাবা। বিয়েটা ঠিকও হল এই কারণেই। বাবাই বি এস সি পাশ ভাবি জামাইকে একটি প্রমিসিং চাকরি জুটিয়ে দিলেন বার্নপুরে। চমৎকার পরিবার, খুব হাসিখুশি নম্র-স্বভাবা মেয়ে লিলি। বড়োলোক বাবা-মা'র একমাত্র মেয়ে। আদুরে খেয়ালি। বিয়ের পর আমরাই ফিরে গেলাম আবার বর-বউকে নিয়ে বহরমপুরে সুগতদের আদি বাড়ি।

সুগতরা এক বোন এক ভাই। সুগতর বাবা-মা এখন অত্যন্তই বৃদ্ধ। মেসোমশায়ের বয়স প্রায় আশি হতে চলল, মাসিমার বয়সও সত্তর টত্তর হবে। বোন সীমা, বিয়ের তিনবছর পর বিধবা হয়ে ফিরে আসে। বাবা-মাকে দেখাশোনা করে। বাড়িতে একটি গানের স্কুলও করেছে। কলকাতার গীতবিতান না দক্ষিণী, কোথাকার ডিপ্লোমা ছিল। বাড়িতে কিছু মেয়েও আসে গান শিখতে। তাতে কিছু রোজগার হয়। মেসোমশায় ইনকামট্যাক্স অফিসার ছিলেন। সৎ, কড়া অফিসার। রিটায়ার করার আগে ও পরে যা প্রভিডেন্ড ফান্ড টান্ড পান তা মেয়ে ও ছেলের বিয়েতে পুরোটাই তুলে ফেলেন। সুগতর মুখেই শুনেছি আমি যে, মেসোমশাই মাসিমাকে বলতেন, ছেলে আর মেয়েই দেখবে আমাদের বুড়োবয়সে। ওরা ছাড়া আমাদের আর কেইই বা আছে! ওরাই-তো আমার ইনসিউরেন্স।

মাঝে মাঝে চিঠি পেতাম সুগতর, বার্নপুর থেকে। তার চেয়েও বেশি খবর গত পাঁচ বছর হল পাচ্ছি শ্যামলেরই মাধ্যমে। কারণ, শ্যামল ই সি এল-এর বড়ো সাহেব এখন। আসানসোলেরই কাছে ওর হেডকোয়াটার্স। শ্যামল বলত, বুঝলি আকর, সুগতটা একটা অমানুষ হয়ে গেছে। লিলির বাঁদর। লিলির কথায় ওঠে বসে। একেবারে ঘরজামাই হয়ে গেছে।

নিজের অতবড়ো কোয়ার্টার থাকা সত্ত্বেও শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনার জন্যে শ্বশুরবাড়িতেই থাকে। বাড়িটা তো ওইই পাবে।

তা, কী আর করবে! একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করেছে। উপায়ই বা কী? স্ত্রীর মা-বাবাকেও তো ফেলে দিতে পারে না। তুই হলে, তুইও হয়তো অমনই করতিস।

সেটা বুঝি। তবু তা বলে, শ্যামল বলত, নিজের বাবা-মাকেও কি ফেলে দেওয়া উচিত?

শ্যামল মাঝে মাঝেই অফিসের কাজে দিল্লিতে আসে। ওবেরয় হোটেলে ওঠে। আমাকে আর রিমাকে খেতেও ডাকে প্রায়ই। মোগলাই বা চাইনিজ। আমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন করলে আসতেই চাইত না। বুঝতে পারতাম, ওকে নানাভাবে খাতির করার লোক আছে দিল্লিতে অনেকই। ওর চারধারে নানা ধরনের লোক ঘুর ঘুর করত। বাইরে এয়ার কন্ডিশন্ড মার্সিডিস গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত চবিবশ ঘন্টা।

শ্যামল এসেছিল গতমাসেরও প্রথমে। সেবার যা বলে গেল সুগত সম্বন্ধে তা শুনে মনে বড়োই ব্যথা পেয়েছিলাম। ওর চলে যাওয়ার পরও অনেক দিন পর্যন্ত ওই ঘটনা মাথার মধ্যে ঘুরত। শেষে, নাম স্থান-কাল-পাত্র সব বদলে একটি গল্প লিখে পাঠিয়ে দিলাম দিগঙ্গন-এ। দিল্লির 'দিগঙ্গন' যে অতদূরে বার্নপুরে সগতর হাতে এত তাড়াতাড়ি পড়বে তা ভাবিনি। পড়লেও এই লেখা পড়ে বড়োজোর নিজের জীবনের ঘটনার সঙ্গে মিল খুঁজে পেতে পারত, কিন্তু ওর বাবা-মায়ের অসহায়তার কথা শ্যামলের মুখে শুনে যে আমি ওই গল্প লিখেছি একথা মনে করার

সুগতর বিধবা বোন, সীমা হঠাৎই কোনো অজ্ঞাতকারণে আত্মহত্যা করেছে। শ্যামলই বলেছিল। একটি বড়ো মেহগনি গাছ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে। মাসিমা মেসোমশায়কে দেখাশোনার জন্যে একজনও চাকর ছিল না। মাসিমা এখন নাকি নিজেই রান্না করেন। হাই ব্লাডপ্রেসার, ব্লাডসুগারের রোগী। মেসোমশায় তো বলতে গেলে অথর্বই। সুগত মা-বাবাকে দেখাশোনা তো করেই না, মাসে দু-মাসে একশো করে টাকাও পাঠায় না নাকি। মেসোমশায়ের সামান্য পেনসনে ওষুধপত্রর কথা ছেড়েই দিলাম, বুড়ো বুড়িকে না-খেয়েই থাকতে হয়। অথচ সুগতর বাড়িতে লন, কিচেন-কার্ডেন, আয়া, বেয়ারা, বাবুর্চি, গাড়ি, ড্রাইভার, কোনো কিছুরই অভাব নেই। শ্যামল বলছিল,আশ্চর্য! তবু মাসিমা মেসোমশাই পাড়া প্রতিবেশীর কাছে ছেলে বা ছেলে-বউ সম্বন্ধে একটিও খারাপ কথা বলেন না, বলেননি কখনো কারো কাছে। উলটে বরং সবসময় প্রশংসাই করেন।

আমি বলেছিলাম, এমনই যদি ঘটনা, তবে আমি আর তুই মেসোমশাইকে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাই না কেন? এ মাস থেকে এক-শো টাকা করে পাঠাব।

শ্যামল বলল, মাথা খারাপ। সুগত আর লিলি মাইন্ড করবে না তা ছাড়া অন্যর যা দায় তা শুধু শুধু নিজেদের মাথায় চাপানোই বা কেন? সুগত তো তোর চেয়ে অনেকই ওয়েল-অফ যার যার দায়, যার যার কপাল তাকে একাই বইতে এবং সইতে দেওয়া উচিত।

লিলি বড়ো মিষ্টি মেয়ে। আমার সঙ্গেও খুবই মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। কত মজা, কত গান, কত হাসি। সেই লিলিরই লেখা এই চিঠিটা! ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল।

শ্যামল না জানালে ওদের এটা জানার কথাই ছিল না। একজন লেখকের মনে যা কিছু দাগ কাটে, যে-কোনো ঘটনা, তাই নিয়েই তো তিনি লেখেন। এমন কত গল্পই তো লিখেছি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, যাতে যাদের নিয়ে লেখা তারা বুঝতে না পারে। গল্পে আমি সুগত বা লিলিকে বিন্দুমাত্র ছোটোও করতে চাইনি। বরং যা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম তা এই প্রজন্মের হৃদয়হীনতা এবং বয়স্কদের আশ্চর্য অসহায়তা। আমি একজন লেখক হিসেবে, দূর থেকে, নিরাসক্তভাবে পাঠকদের কাছে তাই-ই পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। লেখক তো পাঠকদের অছিই। পাঠকদের ক্ষতি করা বা দুঃখ দেওয়া কখনো কোনো লেখকেরই ইচ্ছে নয়। পাঠকরা রোজই যা দেখেন, জানেন, শোনেন তাইই আবার দেখেন বা জানেন না বা শোনেনও না। এইখানেই লেখকের ভূমিকা। লেখকের স্বাভাবিক অন্তর্দৃষ্টিতে তিনি যা দেখেন বা জানেন বা শোনেন, পাঠকের কোনো ইন্দ্রিয়তেই সেসব ধরা পড়ে না হয়তো। পড়লেও, পাঠক তা প্রকাশ করে বলতে পারেন না, লেখক পারেন। এইটুকুই তফাত! আমার সুগত বা লিলির সঙ্গে কোনো ঝগড়া নেই। আমিও কি নিজের মা বাবাকে খুব একটা দেখাশোনা করতে পেরেছি এতদূর দিল্লিতে বসে? তাঁরা থাকতেন কলকাতায়। কলকাতায় থাকলেও কি খুব একটা পারতাম? আমার দাদারা অবশ্য ছিলেন কলকাতায়। তাঁদের মধ্যেও একধরনের গা-ঠেলাঠেলি মনোবৃত্তি দেখি। পকেটে কেউই হাত দিতে চান না। মানুষের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে খরচ করার ইচ্ছার কোনোরকম সাযুজ্য যে আদৌ আছে তা এখন আর মনে হয় না। দাদাদের মধ্যের এই পিপুফিশু মনোবৃত্তিতে বাবা-মায়ের যথেষ্ট অসুবিধা এবং অনাদরই হত বলে আমার বিশ্বাস। যতখানি করতে চাই, তার কতটুকুই বা করতে পেরেছি?

সুগতকে ছোটো করতে আমি চাইনি। সত্যিই নয়। সুগতকে নয়, বরং আমাকে, শ্যামলকে, আমাদের প্রজন্মর সকলকেই ছোটো করতে চেয়েছিলাম। আমাদের ওই প্রজন্মর স্বার্থপরতা সম্বন্ধে সচেতন করতে চেয়েছিলাম। যাতে এই লেখাটি পড়ে একটু ভাবেন এই প্রজন্মর সবাই, তাইই চেয়েছিলাম। যদি মাসিমা মেসোমশাইদের বয়সি কেউ এ লেখাটি পড়েন তাহলেও তাঁরা জানতে পারেন তাঁদের ছেলের বয়সি কেউ তাঁদের অসহায়তাকে মন দিয়ে ছুঁতে পেরেছে, সহানুভূতির হাত বুলিয়েছে তাঁদের গায়ে। কিছু করতে পারুক আর নাইই পারুক।

কী আমি করব এখন? একদিকে আমার বাল্যবন্ধু, সুন্দরী সখী, বন্ধুপত্নী লিলি অন্যদিকে আমি একজন লেখক। আমার লেখকসত্তা। লেখা বলতে এবং লেখক বলতে আমি কী বুঝি বা সাহিত্য সম্বন্ধে আমার প্রত্যয় কতটুকু এবং কী তারই পরীক্ষা এখন।

নীচে তাকিয়ে দেখি, বড়ো অ্যাশট্রেটা সিগারেটের টুকরোতে ভর্তি হয়ে গেছে। লিলির চিঠি নিয়ে কী করব কিছুই ঠিক করে উঠতে পারলাম না।



আজ সকালের ডাকে সুগতরও একটি চিঠি এল। ইনল্যান্ড লেটার-এ। ওর সুন্দর স্মার্ট হস্তাক্ষরে লেখা। লিখেছে .

আকর,

শ্যামল আমাদের কাছে দিল্লির 'দিগঙ্গন' বলে একটি পত্রিকা পাঠিয়েছিল আসানসোল থেকে। এবং গত উইক-এন্ডে এসেওছিল আমাদের এখানে। সেই পত্রিকাতে তোর একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে। পড়লাম।

ও বলল যে, তুই আমাকে ও লিলিকে নিয়ে এবং আমার বাবা-মাকে নিয়েই এই লেখা লিখেছিস। বারবারই পড়লাম লেখাটি। তুই সত্যিই আমাদের এই জেনারেশনকে সুন্দর করে তুলে ধরেছিস। কিন্তু আমাদের কথায় বলি যে, আমাদের খারাপত্ব-ভালোত্বর চেয়ে বড়ো কথা আমাদের অসহায়তাও। এই অসহায়তা, আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মার অসহায়তার চেয়েও ভীষণ। যদিও একই গল্পে সব ক-টি পয়েন্ট-অফ-ভিউ প্রোজেক্ট করা যায় না, তবুও আশা করব ভবিষ্যতে আমাদের এই অসহায়তা নিয়েও কিছু লিখবি। এই ইনফ্লেশান, এই ব্রোকেন-ডাউন, ফ্র্যাগমেন্টেড ফ্যামিলি, ছেলেমেয়েদের এই এক্সপেনসিভ শিক্ষা-ব্যবস্থা এবং আরও নানা কিছুতে এই সমস্যা বড়ো তীব্রই হয়ে উঠেছে। যা করা উচিত অথবা যা করতে চাই বাবা মায়ের জন্যে তার কতটুকুই বা করতে পারি বল?

গল্প হিসেবে খুবই ভালো হয়েছে। কিন্তু শ্যামল এটাতে পার্সোনাল মাত্রা যোগ না করলেই ভালো করত। আসলে লিলি খুবই আপসেট হয়ে পড়েছে। এবং হয়ে থাকবেও হয়তো বেশ কিছুদিন। অফ অল পার্সনসঞ্জ, তুই ওর অতি প্রিয় আকরদাও যে এমন দুঃখ দিতে পারিস ওকে, পুরো ব্যাপার না জেনেশুনে, নেহাত ওকেই ছোটো করার জন্যে, একথাটা ও ভাবতেই পারছে না। আফটার অল, তুই লেখক বলে, তোর সম্বন্ধে এক বিশেষ ভলোলাগা ও অ্যাডমিরেশন ছিল লিলির চিরদিনই! তোর হয়তো মনে নেই, আমি আর লিলি যেদিন বার্নপুর থেকে বহরমপুরে আমাদের বাড়িতে প্রথমবার এলাম বিয়ের পর বউ নিয়ে তখন তুই একাই গান গেয়েছিলি। আমার আত্মীয়স্বজনরা, লিলি এবং বিশেষ করে মা এখনও সেই গানের কথা বলেন, দীর্ঘ আঠারো বছর পরও। 'তোমার আনন্দ ঐ এল দ্বারে এলো এলো এলো গো ওগো পরবাসী।' এই গান না? তোর সঙ্গে লিলির সম্পর্ক আঠারো বছরের। আর আমার ছাবিবশ বছরের।

শ্যামল কেন যে এরকম করল, আমি জানি না। এসব কথা হয়তো শ্যামলই তোকে বলেছিল। আমার মন বলছে। ও যদি এতই জানে তো আমাকে বন্ধু হিসেবে বকতে পারত। রাগ করতে পারত। জানতে পারত, পুরো ঘটনা কী? আসামিকেও তো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেওয়া উচিত? বল?

তোর লেখাতে কোনো ম্যালিস নেই। তুই যে নিছক সাহিত্য হিসেবেই ব্যাপারটা নিয়েছিস তা আমি পড়েই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই-ই যে, শ্যামল খুব সম্ভব দিল্লির ওই ম্যাগাজিনের অনেকগুলি কপি কিনে বা জেরোক্স করে লিলির এবং আমার পরিচিত ও অর্ধপরিচিত সকলের কাছেই পাঠিয়েছে।

কারণ?

কারণ নিশ্চয়ই আছে। সেটা তোর কাছে চুকলি করতে চাই না কারণ আমার চরিত্রর সঙ্গে

শ্যামলের চরিত্রের তফাত আছে। শ্যামলের যা আয় তার সঙ্গে ওর লাইফ-স্টাইল ও সম্পত্তির কোনোই সাযুজ্য নেই। আকর, এই যুগে এই সময়ে আমরা সকলেই হয়তো মারজিনালি সৎ বা অসৎ। জীবনের সব ক্ষেত্রেই। কিন্তু শ্যামল আউট-এন্ড-আউট অসৎ হয়ে গেছে। ও যে আমার বাড়িতে আসে এটা এখানের আমার অনেক বন্ধুরই পছন্দ নয়। তা ছাড়া, যা কানাঘুসোতে শুনি, উৎকোচের সঙ্গে উৎকট সব দুশ্চারিত্রিক ব্যাপার স্যাপারেও জড়িয়ে পড়ছে। ও বোধ হয় সুন্দর সব কিছু নষ্ট করে আনন্দ পায় আজকাল। তার মধ্যে সুন্দর সম্পর্কও পড়ে।

যাই-ই হোক, আকর, আমার বন্ধু খুবই কম। বুড়ো বয়সে অ্যাকোয়েন্টেস হয়, বন্ধু হয় না। তাই আমি তোকে ভুল বুঝিনি, তুইও বুঝিস না। লিলিকে ক্ষমা করিস, যদি দেখা হলে তোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। তুই বরং, আমি না লিখলে, এদিকে আসিসই না। সব শান্ত হয়ে গেলে আমিই তোকে গ্রিন-সিগন্যাল পাঠাব। আমার স্ত্রী একজন আলাদা ব্যক্তি। তাঁর ব্যক্তিত্বকে আমি সম্মান করি। তাই ও যখন বুঝতে চায় না, আমিও জোর খাটাতে চাই না তাঁর উপর।

শ্যামল কি আমাদের বন্ধু? এই প্রশ্নটা আমাকে বড়োই পীড়িত করেছে। হয়তো তোকেও করবে। যে বন্ধু, অন্য বন্ধুদের মধ্যের সম্পর্ক নষ্ট করে সুখ পায় তাকে কি বন্ধু বলা উচিত। তবুও, বন্ধু যদি-বা নাও-ও হয়, তবু ওর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা উচিত নয় আমাদের, যদি-না সে শত্রু হয়ে ওঠে। মুজতবা আলীর 'দেশে-বিদেশে'তে আছে না, ভাই গেলে, ভাই আবার জন্মাতে পারে, বন্ধু গেলে কি বন্ধু পাওয়া যায়?

ভালো থাকিস। এখন সমসাময়িক আমাদের অনেকেরই পরিচয় তোরই বন্ধু হিসেবে। কোনো পার্টিতে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে লোকে আমার সঙ্গে অন্যর আলাপ করিয়ে দেন, 'এই যে, সাহিত্যিক আশিস করের বাল্যবন্ধু সুগত চাটার্জি।'

আই ফিল লেজিটিমেটলি প্রাউড বাউট ইট। কিন্তু শ্যামল আমাদের সমস্ত পরিচিতদের কাছেই কাগজটি পাঠিয়েছে এবং আমাদের আইনডেনটিফাইও করেছে বলে এখন মুখ দেখাতে পারছি না কারো কাছেই। জনে জনে গিয়ে তো আর 'শুনুন মশাই, আসল ব্যাপারটা হচ্ছে...' বলে বোঝাতে বসতে পারি না।

আবারও বলছি, ভালো থাকিস। এ সব পাসিং ফেজ। লিলি কুল-ডাউন করে যাবে। একটু সময় দে। রিমাকে আমার শুভেচ্ছা জানাস। একবার বেড়িয়ে যা এসে শীতকালে। আমার গ্রিন-সিগন্যাল পেলেই। এখানের শীত দিল্লির তুলনায় অনেক মাইল্ড।

--ইতি তোর সুগত।

সকালে সাহিত্য একাদেমিতে ড. সাহার কাছে একবার যাওয়ার ছিল একটি বইয়ের হিন্দি অনুবাদের ব্যাপারে। ফোন করে ক্যানসেল করতে হবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট।

বড়োই ভারাক্রান্ত হয়ে আছে মন। শ্যামল। সংসারে কতই বন্ধুবেশি শত্রু থাকে। অথচ এদের লাভ হয় কী কে জানে? কেন যে এরা এমন করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে?

চান করে, চা-জলখাবার খেয়ে লেখার টেবিলে এসে বসলাম। লিলিকে একটা চিঠি লিখতে হবে। রাগের চিঠি নয়। ভালোবাসারও নয়। একজন পাঠিকার কাছে একজন লেখকের চিঠি। একজন লেখক যে কেন একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে অন্যরকম হন, হওয়া উচিতও তাঁর,

সেকথাই বুঝিয়ে একজন ন্যায্যত ক্ষুব্ধ পাঠিকাকে, প্রায়-আত্মীয়াকে চিঠি লিখতে হবে। বড়ো দুরূহ কর্তব্য।

লিলি, কল্যাণীয়াসু,



হৌজ খাস, নিউ দিল্লি 25.9.84

তোমার চিঠি পেয়ে তোমারই যে চিঠি তা বুঝতে পারিনি প্রথমে। পরে অবশ্য বুঝতে অসুবিধে হয়নি কোনো।

তুমি অচেনা পাঠিকার ভান করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আমাকে লিখেছ। লিখেছ, লিখে টাকা রোজকার করার জন্যে আমি সুগত আর তোমার নামে কুৎসা করে গল্প লিখেছি।

এইরকম আক্রমণ এই প্রথম নয়। আমার মা তখনও বেঁচে ছিলেন। বাবা গেছিলেন আগে। আমাদের কলকাতার যৌথ পরিবারে ভাগের মা গঙ্গা পেতেন না। কোনো ভাগের মাইই পান না। এতে, আমার অপরাধও কম ছিল না অবশ্য অন্যদের চেয়ে। তবু, ভাগের মা যে সত্যিই গঙ্গা পান না, ছেলে-মেয়েরা তাঁর যত কেওকেটা হোক না কেন, তা নিয়ে 'গঙ্গা' বলে একটি গল্প লিখেছিলাম।

আমার বৌদিরা আমার সঙ্গে এক বছর কথা বলেননি। দাদারা মুখ ঘুরিয়ে নিতেন। আমার চারখানি মিনিবাসের মালিক ছোটো ভাই, পাড়ার গুন্ডাদের দিয়ে আমাকে গুমখুন করিয়ে দেবার মতলবেও ছিল। দাদারা হস্তক্ষেপ না করলে, এতদিনে মরেই যেতাম।

এক সময় রিমার সঙ্গে আমার যথেষ্ট মনোমালিন্য ঘটেছিল। সেই সময়েই আমার জীবনে একজন অল্পবয়সী, সুন্দরী প্রাণবন্ত পাঠিকা খুব কাছাকাছি এসেছিল। একথা তোমাকেই প্রথম বললাম। তার খুবই ইচ্ছা ছিল, প্রার্থনা ছিল যে, আমি তাকে বিয়ে করে এ জীবনের মতো আমার সব ভার তার হাতেই তুলে দিই। তার লেখক স্বামীকে সে দেবতার মতো পুজো করবে। কিন্তু তা সম্ভব ছিল না।

আমার জীবনের ওই অধ্যায় নিয়ে আমি একটি উপন্যাস লিখি। যখন সেই উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছিল একটি সাপ্তাহিক কাগজে ধারাবাহিকভাবে, তখন রিমা আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন এবং সুগতও বার বার আমাকে বলেন এবং লেখেন ও লেখে এ লেখা বন্ধ করে দিতে। রিমা রাগ করেছিল সবচেয়ে বেশি। তবুও লেখা বন্ধ করিনি। আজ প্রায় বারো বছর পরে সেই উপন্যাসই এখন বেস্ট সেলার। দিল্লির হৌজ খাস-এর জমি কিনেছিলাম আমি ওই একটি উপন্যাসের রয়্যালটিতে। বইয়ের বিক্রিটাই বড়ো কথা নয়। মানুষের জীবনের ঘটনা, নানারকম ঘটনা রোজ ঘটে আবার তটরেখার দাগের মতো মুছেও যায়। সাহিত্য সেই সব ঘটনাকে চিরস্থায়ী আনন্দ অথবা দুঃখ অথবা গভীর অনুভবের করে রাখে। শুধুমাত্র সাহিত্যই!

আসল ব্যাপারটা টাকা নয়, সাময়িক প্রশংসা বা নিন্দাও নয়, আসল ব্যাপারটা হচ্ছে বিশ্বাস। তুমি তোমার যে আকরদাকে চেন, যে তোমার রান্নাঘরের লাগোয়া খাবার ঘরের টেবিলে বসে গীতবিতান খুলে গানের পর গান ভুল সুরে গেয়ে তোমাকে মুগ্ধ করেছে বহুদিন, বহুবার যে তোমার হাতের চিতলমাছের মুঠার প্রশংসা করেছে অথবা পুদিনা পাতার বড়ার, অথবা তোমার সুন্দর করে সাজবার ক্ষমতার, সেই মানুষটি কিন্তু লেখক নয়, যাকে, তোমরা জান,

চেন। অথবা আমি নিজেও চিনি জানি যে মানুষটিকে, যে মানুষটির নাম আশিস কর সেও আদৌ লেখক নয়।

লেখক যে, সে কখনো আমার মধ্যে বাস করে কখনো বা করে না। কখনো সে আমাকে ছেড়ে আমার বাইরে সরে গিয়ে টেলিগ্রামের তারের পাখি হয়ে গিয়ে নীচের লাইন বেয়ে চলে যাওয়া খয়েরি ট্রেনকে দেখে। কখনো বা সে ট্র্যাফিক-সিগন্যাল হয়ে গিয়ে পথপেরুনো নরনারী, গাড়ি-বাসকে দেখে। কখনো বা সে ফুল হয়ে যায় সাদা, ক্রিসান্থিমাম বা রজনিগন্ধা কবরের এপিটাফ-এর পায়ের কাছে শুয়ে শুয়ে দুধের মতো চোখের জল ঢেলে কাঁদবে বলে।

আমি যাইই লিখি, তাইই আকর-এর কথা নয়। আশিস কর বলে যে লেখকটি আছেন এ সব তাঁর কথা। আমি আর সে এক নয় গো লিলি! সে যে কেঞ্জ, তা আমি নিজেও জানি না।

তুমি জানবে না একথা, সুগত জানে। অনেক বছর আগে একজন দাম্ভিক, অগ্রজ, অন্তঃসারশূন্য শিল্পীকে আক্রমণ করে একজন কথাসাহিত্যিক একটি প্রবন্ধ লেখেন 'দা স্টেটসম্যান'-এ। আশিস কর-এর বাবা শ্রীপ্রদীপ্ত কর সেই সমালোচকের নিন্দা করেন তীব্র ভাষায়। আশিস কর রিজয়েন্ডার দেয় বাবার সমালোচনার বিরুদ্ধে--ততোধিক তীব্র ভাষায়।



আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই বললেন ছিঃ ছিঃ এ কী! বাবা-ছেলেতে কাজিয়া শুরু করলে তোমরা? এ কী আকর? বাবাও আহত হয়েছিলেন আমার এহেন 'অশ্রদ্ধা' দেখে। আমি তখনও বলেছিলাম যে, বাবাকে শ্রদ্ধা করা আর তার সমস্ত মতকে শ্রদ্ধা করাটা একার্থক নয়। মতের বা পথের বা বিশ্বাসের প্রত্যয়ের ঝগড়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছুমাত্র মিল নেই। আকর প্রদীপ্তবাবুর অনুগত এবং প্রিয় ছেলে, কিন্তু লেখক আশিস কর প্রদীপ্ত করের কেউই নয়।

লিলি, লেখকমাত্রকেই দাম দিতে হয় জীবনে। দাম না দিয়ে যাই-ই কেনা যাক সে বস্তু থাকে না। সেই গল্প ছিল না একটা! এক পাখিওয়ালা স্টিমারঘাটে বসে পাখি বিক্রি করছিল। স্টিমার প্রায় ছাড়ো-ছাড়ো এমন সময় এক খদ্দের বলল, কত করে?

'চারটে টাকায়।' পাখিওয়ালা বলল।

'বড্ড দাম। যাই-ই হোক, গান তো গায় ভালো?'

'দারুণ!'

'দেবে তো দাও।'

'নাও।'

চার-পাখির খাঁচাটি তুলে দিল পাখিওয়ালা। বদলে একটি চাঁদির টাকা দিল চলন্ত স্টিমারের যাত্রী। জেটি ছেড়ে গভীর জলে একটু দূর যাওয়ার পর রেলিং-এ ঝুঁকে দাঁড়িয়ে সেই যাত্রী পাখিওয়ালাকে বলল, মিস্টার পাখিওয়ালা, দ্যাট কয়েন উইল নেভার রিং।

উত্তরে, পাখিওয়ালাও আকর্ণ হেসে বলল, 'দোজ বার্ডস উইল নেভার সিঙ।'

অচল টাকায় বোবা পাখিই পাওয়া যায়। যে দাম যত বেশি দেয়, তার প্রাপ্তি তত বেশি। সাময়িক প্রাপ্তি নয়, চিরকালীন, প্রকৃত প্রাপ্তি।

শ্যামল প্রায়ই আমাকে যা বলত তা শুনে শুনে তোমাদের দু-জনের উপরেই নয়, আমাদের

সকলের উপরেই বড়ো ঘেন্না হয়েছিল। আমাদের বাবা-মায়েদের কথা ভেবে বড়ো দুঃখ হয়েছিল। যাঁরা আমাদের বুকে করে বড়ো করলেন, নিজেদের জীবনযৌবনের সব আনন্দকে গলা টিপে মেরে আমাদের ফুলের মতো বড়ো করে তুললেন তুলোর মধ্যে করেঞ্জ, সেই আমরাই তাঁদের বৃদ্ধ অশক্ত অবস্থায় যদি দেখাশোনা না করি তাহলে আমাদের সম্বন্ধে ঘৃণা হওয়া কি অন্যায়?

কোনো গল্প, কোনো উপন্যাসই আসলে একমুঠো নর-নারীর কাহিনি নয়। তারা নাটকের চরিত্ররই মতো চরিত্র। তারা প্রত্যেকেই অন্য অনেকেরই প্রতিভূ। তাদের মুখ দিয়ে, তাদের ব্যবহারের মাধ্যমে শুধু তাদের নিজেদের কথাই নয়ঞ্জ, অনেকেরই কথা বলতে চান লেখক। এক একটি যুগের কথা, প্রজন্মের কথা, সময়ের কথা। যা বলা হয় সেটাই আসল, কে বলল সেটা অবান্তর, কেন? তাও অবান্তর।

এই রকম অভিমান অশিক্ষিত, বোকা গুমোরসর্বস্ব পাঠককে মানায়, তোমার মতো উচ্চশিক্ষিতা বুদ্ধিমতী এবং লেখকের এমন একজন প্রিয়জনের পক্ষে আদৌ মানায় না। তুমি যে কী করে এমন নিষ্ঠুর এবং বেনামি চিঠি লিখতে পারলে আমাকে, জানি না। সত্যিই জানি না।

মাসিমা মেসোমশাই কেমন আছেন জানিও। সুগতর মা-বাবার কথাও জানিও। তোমার ছোটো ভাই? সে কি এখনও বম্বেতে?

বড়ো করে চিঠি দিও আমাকে। তুমি রাগ করতে পার, কিন্তু তা বলে আমি পারি না। তোমাকে এবং সুগতকে আমি আগের মতোই ভালোবাসি। একবার এখানে চলে এসো বেড়াতে। আমার এখানেই উঠো।

শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা--তোমাদের আকর।



যেদিন আমি এলাহাবাদে রওয়ানা হব সেদিনই আরেকটা চিঠি পেলাম লিলির।

লেখক,

আপনার চিঠি পেলাম। কিন্তু আমার নিজের মত বদলাবার কোনো হেতুই খুঁজে পেলাম না। লেখকের যেমন বিশ্বাস বা প্রত্যয় থাকে, পাঠক-পাঠিকারও থাকে। থাকা উচিত।

দিল্লি গেলে, ওদের কোম্পানির গেস্ট হাউসে অথবা অনেক জানাশোনা কোম্পানিরই গেস্ট-হাউস আছেঞ্জ, সেখানেই উঠব। আপনার এ ব্যাপারে দুশ্চিন্তা না করাই ভালো।

ভগবান আপনার মঙ্গল করুন। অন্য লোকের সর্বনাশ করে আরও অনেক অনেক রয়্যালটি পান এই প্রার্থনা করে।

--একজন পাঠিকা।

পুনশ্চ . আমার স্বামী আরও রোগা হয়ে গেছেন।

রিমাকে এলাহাবাদে পৌঁছে এসব ব্যাপারে কিছুই বলিনি। মতপার্থক্য সবচেয়ে সুন্দর এবং সহনীয় শুধু হয় পুরুষে পুরুষে। একটু অসুন্দর হয় পুরুষে-নারীতে হলে। এবং সবচেয়ে অসুন্দর হয় নারীতে নারীতে। রিমা এই সব চিঠির কথা জানলে যে আবার কোন মধুর ভাষায়

লিলিকে পত্রাঘাত করবে সে সম্বন্ধে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না।

সুতরাং চেপেই গেলাম।



অনেকগুলো বুড়ি বছর ঝরাপাতার মতো হাওয়ার সওয়ার হয়ে ঝরে গেল।

রিমার যে খুড়তুতো বোনের বিয়েতে আমরা এলাহাবাদে গেছিলাম তার ছেলের বয়স হয়ে গেছে পাঁচ।

সুগতর প্রথম ও লিলির দ্বিতীয় চিঠির পর ওদের কাছ থেকে আর কোনো চিঠিই আসেনি। আমি দু-জনকেই কম করে দশটি দশটি কুড়িটি চিঠি লিখেছি। তবু কোনো উত্তর আসেনি। সুগতও দেয়নি। সুগতর গ্রিন-সিগন্যাল এখনও এল না।

শ্যামল আজকাল খুব কম আসে। বোধ হয় কিছু আঁচ করেছে। এবং এলেও সুগতর খবর জিগগেস করলে এড়িয়ে যায়। অনেক সময় মিথ্যে কথাও বলে, বুঝতে পারি। তাই-ই এখন আর জিগগেসই করি না। আমারও কিছুই যায়-আসে না সুগত বা লিলি সম্পর্ক রাখল কী না রাখল। ওদের কটা লোকে জানে? আমাকে চেনে সকলে। ইন ফ্যাক্ট ওদের সঙ্গ দেওয়ার মতো সময় আমার একেবারেই নেই।

তবু...

মুখে এবং অভিমানে বশ করে যাই-ই বলি না বা ভাবি না কেন, বুকে বড়ো লাগে। একা ঘরে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কতদিনের বন্ধু। ছেলেবেলার বন্ধু। বন্ধু-পত্নী লিলি। সুগতর বিয়ের পরই বহরমপুর থেকে সুগত, লিলি, আমি শ্যামল, ভুতনাথ সকলে আমরা ফারাক্কার কাছে নৌকা ভাড়া করে পাখি শিকারে গেছিলাম। শীতের শেষে। লিলি আমার পাশে বসেছিল। নতুন বন্ধুপত্নীর গায়ের পারফিউমের গন্ধটি এখনও আমার নাকে লেগে আছে। নতুন সিল্কের শাড়ির গন্ধ, খসখস শব্দ। আমাদের মধ্যে সুগতই সবচেয়ে আগে বিয়ে করেছিল।

জীবন তখন অনেক সুগন্ধি, আবহাওয়া অনেক অনাবিল, অক্সিজেনে ভরপুর ছিল। সত্যিই ছিল। এখন সবই পাস্ট-টেন্স।

আগামীকাল দেওয়ালি।

এক পাবলিশার্স-এর বাড়ি গেছিলাম ফ্রেন্ডস কলোনিতে। বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদ, শামসুর রহমান, নির্মলেন্দু গুন এবং মহিলা কবি রুবি রেহমানকে নেমন্তন্ন করেছিলেন প্রকাশক। হাই-টিতে। চা খেয়ে বেরিয়েছি, একাই। ওদের সকলকে প্রকাশক-বন্ধুই পৌঁছে দেবেন। কিছুটা এসেই, ডানদিকে মোড় নিতেই দেখি খুব সুন্দর একটি নতুন দোতলা বাড়ির বারান্দার রেলিং-এ চোদ্দো প্রদীপ লাগাচ্ছেন এক সুন্দরী বাঙালি মহিলা। হালকা কমলারঙা শাড়ির উপর দারুণ কমলারঙা একটি মলিদা গায়ে দিয়ে।

চমকে উঠলাম। লিলি না?

হ্যাঁ। তাই-ই তো! লিলিই!

গাড়িটা একটু এগিয়ে নিয়ে গেট-এর কাছে গিয়ে নেমপ্লেট দেখলাম, সুগত চ্যাটার্জি।

আবার অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিলাম। মোড়ের পান-সিগারেটের দোকানে এসে সিগারেট কেনার অছিলা করে নামলাম। জিগগেস করলাম, বাড়িটাকে দেখিয়েঞ্জ, ওই বাড়িটি কার?

বহত বড়া শেঠকা। বাঙালি বাবুকা। উনি তো বিলাইত-আমেরিকাই করেন সব সময়। এই তো এক বছর হল এসেছেন, বাড়ি কিনে।

সঙ্গে আর কে কে থাকেন। শুধুই মেমসাহেব, একা?

কেন জিগ্যেস করছেন?

তোমার কোনো ভয় নেই। আমি চোর ডাকাত নই। বাবুকে আমি চিনতাম। মানে আমার বন্ধু ছিলেন। তিনিই কি না, তাই-ই জানছি। চ্যাটার্জি সাহাব কী?

হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনিও কি বাঙালি?

হ্যাঁ।

আপনার বন্ধু ছিলেন বললেন না? ছিলেন মানে? এখন বন্ধু নেই?

বোকার মতো বললাম, এখন নেই।

এখন শত্রু?

নাঃ। তাও নয়।

পানওয়ালা বলল, এক ছেলে, এক মেয়ে, আর সাহেবের মা আছেন। বুড়িয়া। সঙ্গেই থাকেন ওদের। আর মেমসাহেবের বাবা।

ঠিক জান তুমি?

হ্যাঁ। সাহেবের বাবা আর মেমসাহেবের মা তো মারা গেছেন। আমার বহু যে ওই বাড়িতে ঠিকে কাজ করে সাহাব। এই জন্যেই তো সব জানি।

সিগারেট ধরিয়ে আমি গাড়িতে এসে বসলাম। স্টার্ট করে এসে বড়ো রাস্তায় পড়লাম। বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে দিল্লিতে। কাল দেওয়ালি। বাড়ি বাড়ি আলো এবং প্রদীপের মালা দুলে উঠছে। আমার চোখের কোণ ভিজে ওঠায় আলোগুলো সব প্রথমে বড়ো হয়ে গোল হয়ে যাচ্ছে তারপর নানারঙা হিরের মতো ভাঙা ভাঙা হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় গাড়ি চালালে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে। গাড়িটা দাঁড় করালাম পথের বাঁ-দিকে।

সুগতটাকে কত বছর দেখি না। কে জানে? ছিল কি না বাড়িতে। লিলি আগের মতোই সুন্দরী আছে। একটুও মোটা হয়নি। তেমনই সুন্দর ফিগার। আমার গল্পর কারণে সুগত আরও কত রোগা হয়ে গেছে কে জানে? কিন্তু সুগত বাড়িতে থাকলেও যাওয়া তো আর যাবে না। আমার একটা চিঠিরও উত্তর দেয়নি ওরা কেউই। তার মানে ওদের জীবনে আমার আর কোনোই জায়গা নেই। বুকের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট হতে লাগল। ছেলেবেলার বন্ধু মরে গেলে যেমন কষ্ট হয়।

গাড়িটা স্টার্ট করলাম আবার। খুব আস্তে আস্তে চালাতে লাগলাম। বড়ো রাস্তার মোড়ে মস্ত হোর্ডিং পড়েছে। সুগত আর লিলির বাড়ির বারান্দা থেকে সোজা দেখা যায়। আমার 'খাজনা' উপন্যাসে শ্রুতি-নাটক হবে আইফ্যাক্স হলে। কলকাতা থেকে অপর্ণা সেন, মনোজ মিত্র, দীপংকর দে, দেবরাজ রায়, রুদ্রপ্রসাদ ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত সব আসছেন। বড়ো বড়ো হরফে আমার নাম লেখা হয়েছে হোর্ডিং-এ। তার নীচে উপন্যাসের নাম 'খাজনা'। তারও

নীচে, যাঁরা অংশ গ্রহণ করবেন তাঁদের নাম।

এখানে লোকেরা বলে আশিসজি বহুত বড়া রাইটার হেঁ। এক সময় কবিতা লিখতাম, তাই-ই অনেকে আবার বলেন, শায়ের। কত মানুষ আমাকে চেনে জানে, কত সম্মান, ফুলের মালা! কত কী! কত কী যে পেয়েছি এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে লেখক হিসেবে, সকলে সেটাই দেখে। কত কাঁটা এবং কত রকম কষ্ট, কত রকম দুঃখ বুকে নীরবে বয়ে যে এত দূর পথ আসতে হল তার খোঁজ কেউই রাখে না।

বাড়ির গ্যারেজে গাড়িটা রাখতে রাখতে ভাবছিলাম, সুগতর বিয়ের অ্যালবামটা এবং আমাদের ছেলেবেলার যেসব ছবি আছে তা নিয়ে আজ বসব রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর। একা। কী জানি, কোনোদিনও সত্যিকারের লেখক হতে পারব কি না। লেখে তো অনেকেই কিন্তু লেখক ক-জন হতে পারেন? পারব কি কখনো? হৃদয়ের মধ্যে সব সময় নীরবে রক্তক্ষরণ হতে থাকে অথচ বাইরে থেকে কেউই বোঝে না। না ডাক্তার, না কার্ডিওলজিস্ট।

লিলি, সুগতঞ্জ, তোমরা তোমাদের বন্ধু আকরকে অপমানিত করেছ, দুঃখ দিয়েছ, ছোটো করেছ, ভুলে গেছ ঠিকইঞ্জ, কিন্তু লেখক আশিস করের চুলও স্পর্শ করতে পারনি। যে মানুষটি লেখে, সে তোমাদের কেউই নয়, সে তার নিজেরও কেউ নয়। সে রেললাইনের পাশের টেলিগ্রাফের তারে-বসা ছোট্ট পাখি অথবা কবরের এপিটাফ-এর পায়ের কাছে দুধের মতো চোখের জল ফেলা ক্রিসান্থিমাম অথবা রজনিগন্ধা অথবা...যে লেখক ব্যক্তিজীবনের উপরে উঠে না লিখতে পারেন তার বিশ্বাসের কথা নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় নৈর্ব্যক্তিকভাবে বলতে না পারেন, তিনিও কি লেখক?

ঠিকানা তোমার হারিয়ে ফেলেছি - সালেহা চৌধুরী



লিলিকে অয়ন প্রথম দেখেছিল ভিনসেন্ট বুলাভার্ডে। একটি ফুলের দোকানে ফুল কিনছিল লিলি। অয়ন তখন পড়াশোনা করত প্যারিসে। অয়নের পরীক্ষা হয়ে গেছে। দুদিন পরে সে দেশে ফিরে যাবে। ঠিক তখনই। চমৎকার ফরাসি মেয়ে। ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি বলে। একরাশ লম্বা চুল। আর একটি কিউট মুখ এবং অড্রে হেপবার্নের মতো হাসি। সেই হাসি থেকেই কাছাকাছি আসা। অয়ন আর লিলি। অয়নের পুরো নাম ফরিদ হোসেন অয়ন।
কোথায় থাকো তুমি। ও দেখিয়ে দিয়েছিল সেই বাড়িটা, যেখানে ও থাকে। বলেছিল – এসো এককাপ চা খাবে। আমন্ত্রণ এত আকস্মিক, অয়ন অবাক হয়েছিল। এমন করে পশ্চিমে কেউ কাউকে ডাকে না।
ছোট একটি ফ্ল্যাট। ‘আল কার্টা’ নামের দশতলা দালানের শেষ মাথায়। একটি কেকের দোকানে কাজ করে লিলি। মায়ের সঙ্গে কী কারণে মন-কষাকষি বলে ও তখন নিজের মতো থাকছে। মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মা ফরাসি। বাবা ভারতীয়। লিলি এক ব্রোকেন ফ্যামেলির মেয়ে। মিশেল চেহারার লিলি অপরূপ। জলপাইয়ের মতো গায়ের রং এবং ঘন বড়-বড় পল্লবে কালো চোখ। চুলও কালো। সব মিলিয়ে লিলি ক্ল্যাসিক। চা পান আর দোকানের পেস্ট্রি খেতে-খেতে নানা গল্প। অয়ন বলেছিল – লিলি তোমার হাসি থেকেই তোমাকে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে; কিন্তু তুমি যে আমাকে বাড়িতে ডাকলে তার কারণ কী?
তুমি কি কখনো আয়নায় দেখেছ তোমার হাসিটাও কত মিষ্টি। আর থুতনির টোল! কিউট। এই বলে লিলি মুখ নিচু করে হাসছিল। অয়ন তাকিয়ে দেখছিল ওকে। যেন কোনো এক ওল্ড মাস্টার্সের ক্ল্যাসিক ছবি ও। চোখ ফেরাতে পারছিল না। লিলির সরল চোখে এক ধরনের প্রশংসা।
তোমার চোখ দিয়ে আমি তো কখনো আমাকে দেখিনি। কেউ বলেওনি এমন কথা। বলেছিল অয়ন। দশতলার ছোট ফ্ল্যাট থেকে পুরো প্যারিস শহর চোখে পড়েছিল। ছড়ানো প্যারিস ডানা মেলে ছড়িয়ে আছে অনেকটা জায়গা নিয়ে। ব্যালকনিতে ছোটখাটো দু-একটা ফুলের গাছ। বলেছিল – ফুলের বাগানের আমার বড় শখ; কিন্তু বলো তো, এই দশতলার ফ্ল্যাটে কী করে বাগান করি। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। আমি সময় পেলেই বাগানে ঘুরতে যাই। জানো তো, এখানে কতসব বড়-বড় বাগান আছে।
একটা বড় বাড়ির মালিককে বিয়ে করে ফেলো। তাহলে একটা বড় বাগান করতে পারবে সেখানে।
কে আমাকে বিয়ে করবে। তা ছাড়া এমন কোনো বড়লোকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বড় শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিল লিলি।
অয়নের তখন বলতে ইচ্ছা করছিল – আমার বড় বাড়ি নেই; কিন্তু একটু অপেক্ষা করলে আমি একটা বড় বাড়ি ভাড়া নিতে পারব। তবে ইতোমধ্যে আমাকে একবার দেশে যেতে হবে। তুমি কি ততদিন অপেক্ষা করবে?
লিলিকে বলেছিল কেবল – আমি দেশ থেকে ফিরে এসে তোমার খোঁজ করব।
ঠিক আছে। তখন আবার কথা হবে। কবে যাবে তুমি দেশে?
পরশু দিন।
এই শেষ সময়ে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো? পরিচয় হলো। লিলি মুখটা একটু বিষণ্ণ করেছিল।
লিলি একসময় প্যারিসে ঘুরতে-ঘুরতে একটা ভিনসেন্ট বস্নু টাই উপহার দিয়েছিল অয়নকে। প্যারিসে ঘোরার ঘটনা সেও তো এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। অয়ন লিলির পছন্দের জায়গা দেখতে-দেখতে প্যারিসের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। বোধকরি লিলিও। এসব জায়গা হয়তো আগেও দেখেছিল কিন্তু লিলির সঙ্গে নয়। যখন পরদিন অয়ন দেশে যাবে ঘটনা ঘটেছিল তার আগের দিন। বলেছিল লিলি – এই টাইটা খুব পছন্দ হয়েছে। তুমি পরবে স্যুটের সঙ্গে। বলেছিল ও – ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের সব কিছুই আমার ভালো লাগে। ইস! কত অল্প বয়সে মারা গেল ও বলো তো। ওর ছবি দেখতে-দেখতে আমার চোখে পানি চলে আসে। ভালোবাসার কাঙাল ছিল; কিন্তু সারাজীবন সত্যিকারের ভালোবাসা পায়নি। এই বলে লিলি স্টার স্টারি নাইটের কয়েক লাইন গান গেয়ে শুনিয়েছিল। হাউ ইউ ট্রাই টু সে টু মি/ সাফারড ফর ইয়ের স্যানিটি। ইস! কেবল আমি পাগল নই এটা প্রমাণ করার জন্য যুদ্ধ। কেবল স্যানিটি বজায় রাখতে ওকে কতসব অপরূপ ছবি আঁকতে হয়েছিল। কতসব ছবি! এখন ভিনসেন্ট বেঁচে থাকলে আমি ওকে অনেক ভালোবাসতাম। অনেক। বলতে-বলতে লিলি আরেক জগতে চলে গিয়েছিল। অয়ন হাত ধরে বলেছিল – ভিনসেন্ট নেই তো কী হয়েছে। আর কেউ হয়তো ভালোবাসার জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কখন একফোঁটা ভালোবাসা বৃষ্টি হয়ে নামে। নির্মল পিপাসার জল। কিংবা সকালের শিশির। লিলি হেসেছিল। এ-কথার কোনো উত্তর না দিয়ে। একটু কাছে সরে এসেছিল কেবল।
প্রথম দিন লিলি আট ফুট বাই দশ ফুট রান্নাঘরের চুলোতে কী সব রান্না করে খাইয়েছিল। কুচি-কুচি মাশরুম-ভরা ফ্রেঞ্চ অমলেট। বেশ হয়েছিল খেতে। বলেছিল – আমি প্রায়ই বাইরে খাই। আজ তোমার জন্য আমি রান্না করলাম। কাল আমি ছুটি নেব। তুমি আর আমি ঘুরব। বিষাদ গ্রাস করতে চেয়েছিল অয়নকে। কারণ পরদিনই ওর চলে আসার কথা। স্মৃতি! এক বোতল স্মৃতি নিয়ে দেশে চলে যাও অয়ন। দুজনে মুখোমুখি একটা ছোট ডাইনিং টেবিলে বসেছিল। তাকিয়েছিল মুখের দিকে অনেকবার। এক বোতল স্পার্কলিং ওয়াইন আর দুই পেস্নট ফ্রেঞ্চ অমলেট। কী অপরূপ সে সময়! তারপর আসার আগে চা আর পেস্ট্রি। কিন্তু লিলি বলেছিল – ওয়াইন নয়, আমি স্প্রিং ওয়াটার পান করছি। তুমি, পছন্দ হলে, একটু ওয়াইন নাও। আজকের স্মৃতি বেশ। আমার খুব ভালো লাগছে।
বলতে চেয়েছিল অয়ন কেবল স্মৃতি নয়, তোমাকেই নিয়ে যেতে চাই। বলা হয়নি। একদিনের পরিচয়ে কাউকে এমন কথা বলা যায়? না, যায় না।
ও বলেছিল, আমরা নৌকায় সেন নদীতে ঘুরব। প্যারিস দেখব নৌকা থেকে। বরং তার আগে কিছু ভালো জায়গা দেখে নিয়ে আমরা নৌকায় উঠব। আমার সঙ্গে চলো। প্যারিস শহরের সব আমার জানা। অলিগলি তস্য গলি। বড় রাস্তা অ্যাভিনিউ, ল্যান্ডমার্ক, বাগান, সব।
কোন এক পার্ক এখন নাম মনে নেই। সেটা ছিল একটা বোটানিক্যাল গার্ডেন। যেখানে গাছের নিচে বসে চা আর কুকিজ খাওয়া। গাছেদের মতো এত সুন্দর আর কিছু নেই মনে হয়েছিল তখন। দিনটি ছিল প্রসন্ন। তেমন শীতও নয় আবার তেমন গরমও নয়। ওর গায়ে মিষ্টি বেগুনি রঙের একটা কার্ডিগান ছিল প্রথমে। এরপর সেটা খুলে কোমরে বেঁধে নিয়েছিল লিলি। চুলগুলো একটা ব্যান্ডে কপালে আসতে না দেওয়ার শাসনে অবারিত হাওয়ায় বারবার উড়ে-উড়ে ঘুরে-ঘুরে ওর মুখের চারপাশে খেলা করছিল। এবং একসময় হাত দিয়ে সেগুলো পেছনে ঠেলে আর একটি ব্যান্ড বেঁধে নিয়েছিল লিলি। কিউট মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছিল তখন। এবং হাসি।
আইফেল টাওয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল ও – ফিরে এসে রাতের আইফেল টাওয়ার দেখে তারপর নিজ ডেরায় ফিরে যাবে। আইফেল টাওয়ার বাই নাইট একটি অসাধারণ দৃশ্য।
আমি দেখব। দরকার হলে সারারাত ঘুরে-ঘুরে তুমি যেখানে নিয়ে যাবে সেখানে যাব। বলেছিল ও – ল্যুভে কেবল মনের বাগান আর ভিনসেন্টের ছবি দেখব কেমন?
ও জানত কোন মেট্রো কোথায় খুব তাড়াতাড়ি ওদের নিয়ে যায়। মনের বাগানে চোখ ছলছল হয়েছিল লিলির। আর ভিনসেন্টের ছবির তলায় হাঁটু মুড়ে বসেছিল ও। সৌন্দর্যের পাদদেশে সব ভুলে মানুষ যখন হাঁটু মুড়ে বসে। অয়নের কাছে কোনো ক্যামেরা ছিল না। মোবাইল বা সেলফির যুগ নয় তখন। হাত ধরে তুলেছিল ওকে। বলেছিল – এখানে সারাদিন বসে থাকবে লিলি!
চলো।
‘আর্ক দি ট্রায়াম্পে’র কাছে আইসক্রিম খেয়েছিল ওরা দুজন। টুটি ফ্রুটি।
বেশ খাওয়া হলো আজ। বলেছিল লিলি।
তা হলো। তুমি সঙ্গে তাই।
‘অপেরা গারনিয়ের’ ছাদে দেখেছিল অয়ন মার্ক সাগালের ছবি। আগে এখানে এলেও মার্ক সাগালের ছবি দেখা হয়নি তেমন করে। অয়ন বুঝতে পেরেছিল লিলি শিল্প ভালোবাসে এবং শিল্পের জ্ঞান ওর ভয়ানক। একটা বড় ল্যান্ডস্কেপের সামনে এসে বলেছিল ও আমাকে – এখানে থাকে অসহায় মানুষ। এবং আহত সৈনিক।
পম্পিডু সেন্টারে ঝটিকা সফর। বলেছিল ও – এখানে এসে কেউ সারাদিন কাটাতে পারে। আমাদের সময় নেই। আমরা এক ঘণ্টা থাকব। প্যানথিওন নামের চার্চের বাড়িটাই বা কী আশ্চর্য সুন্দর! অয়ন তাকিয়ে থাকতে-থাকতে ওর ক্লান্ত চোখ লিলির মুখের ওপর মেলে দেয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে অয়ন যখন একবিন্দু নির্মল পিপাসার জলের কথা ভাবছিল তখনো জানে না লিলি নামের সুপেয় পেরিয়ার ওয়াটারের সান্নিধ্যে একদিন সারাদিন ও কাটিয়ে দেবে। প্যারিসে এমন কেউ থাকে? যার দিকে কোনো কামনা-বাসনায় হাত বাড়ানোর কথা মনে হয় না। কেবল পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে ভালোবাসার মতো কোনো অনুভব। কে জানে একি লিলির ভারতীয় টাচ। টেনে বাঁধা চুলের নিচে মসৃণ কপালে রোদ পড়েছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে অয়নের মনে হয়েছিল – এ-দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর। কোনো এক বাসিলিকার চুড়ো দেখে মনে হয় কফির ওপরের সেই নরম সাদা ফেনা। আর লিলির দুচোখে ছিল কালো কফির আলো। – আসলে পৃথিবীর সব বড় সৃষ্টি ধর্মের কারণে। বড়-বড় মন্দির, মসজিদ, চার্চ, বাসিলিকা এই কারণেই সৃষ্টি হয়। লিলি বলেছিল অয়নকে – জানো অয়ন, মানুষ বড়ই দুর্বল তাই ঈশ্বরের জন্য বড়-বড় দালান, ছবি আর বাগান তৈরি করে। আবার টাকা-পয়সাও রাখা হয় ঈশ্বরের কথা ভেবে।
ঠিক তাই। বলেছিল অয়ন।
আসলে আমরা সত্যিই দুর্বল। জানো এবার নটর ডেমে গিয়ে আমি একটা বিশেষ প্রার্থনা করব। দেখি নটর ডেমের ঈশ্বর তা মঞ্জুর করেন কিনা।
চাইবে তো দেশে গিয়ে যেন এক অপরূপ সুন্দরীর সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়। মজা করে বলেছিল লিলি।
হলো না। বলেছিল অয়ন।
তাহলে একটা ভালো চাকরি।
তাও হলো না।
ঠিক আছে। অন্যকিছু।
চল আমরা নটর ডেমের পাশে কোনো এক রেসেত্মারাঁয় দুপুরের খাবার খেয়ে নৌকায় উঠে সেন নদীতে প্যারিস দেখব আবার। ঠিক আছে।
আসলে খাওয়া নয়। কাছাকাছি বসা। এবং সময় কাটানো। খাওয়াটা উপলক্ষ।
তুমি বলছ তারপরও ঠিক থাকবে না লিলি?
খেতে-খেতে প্রশ্ন করেছিল অয়ন – লিলি তুমি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?
অবশ্যই। সেসব শুনে কী হবে। এই বলে ও দুষ্টুমির হাসি হেসেছিল। আর একদিন বলব। বলে দূরে তাকিয়ে ছিল লিলি।
ইস!
ইস কেন? আরে মাছ খেতে টার্টার সস নেবে না, তাই কি হয়? ও অয়নের পাতে খানিকটা টার্টার সস তুলেদিয়েছিল। দূরের দৃষ্টি থেকে চলে এসেছিল কাছের মানুষের কাছে।
আর সেন নদীতে শুনিয়েছিল ছোটখাটো দু-একটি কবিতা। ওর চোখ বাঁচিয়ে অয়ন একটা নিনা রিচি পারফিউম কিনেছিল। বলেছিল – তোমার তুলনা। তারপর নদীতে নেমে এসেছিল বিকেল থেকে সন্ধ্যা। নৌকায় ওঠার সময় ক্যামেরাম্যান ওদের ছবি তুলেছিল। বলেছিল – লাভলি কাপল। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল যে ফুলের বাগান সেখানে কোনো ছবি উঠল না বলে অয়নের মন খারাপ হয়েছিল একটু। কিন্তু সেন নদীতে ওঠার আগের সে-ছবিটা বেশ হয়েছিল। অয়ন আর লিলি সে-ছবির দুটো কপি নিয়েছিল যে যার সংগ্রহে রাখবে বলে। দুজনে পাশাপাশি বসে জানল, কোনো প্রিয় সান্নিধ্য পাশে থাকলে সবকিছুই কত অপরূপ হয়ে ওঠে। যখন ওরা কথা বলছিল ছোট-ছোট শব্দে এবং গভীর কোনো আনন্দবোধে। অয়ন বুঝতে পারেনি হঠাৎ খুঁজে-পাওয়া এই লিলি নামের মেয়ে এত তাড়াতাড়ি এত গভীর করে ওর মনের ভেতরে জায়গা করে নেবে। এটা এক ধরনের মিরাকল – বলেছিল ও।
একটা দিন ফুরোতে কতক্ষণ লাগে? অতবড় সূর্যটাও তো একদিন বস্ন্যাকহোল হয়ে সূর্যত্ব নাম মুছে ফেলবে। পৃথিবীটা একদিন কোথায় যে মিশে যাবে কে জানে। দিন শেষ হলো। রাতের আইফেল টাওয়ার দেখে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে অয়ন বলেছিল – তোমার সঙ্গে কি আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না?
ও নিজের ব্যাগ থেকে একটা একশ ফ্রাংকের নোটে ওর বাড়ির ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখে দিয়েছিল। বলেছিল – অ্যানি টাইম অয়ন।
খুব ইচ্ছা করছিল আসার আগে অনেক সময় ধরে ওকে বুকের ভেতর রেখে দেয় অয়ন। যেতেই দেব না তোমাকে আজ রাতে। কিন্তু সে-ইচ্ছা পূরণ তখন সত্যিই মুশকিল। আগামীকাল অয়নকে দেশে ফিরতে হবে। একটু চুমু রেখেছিল অয়ন ওর ঠোঁটে। এর চেয়ে বেশি কিছু আজকের সুর কেটে দেয় এই ভেবে বেশি কিছু করতে ভয় হয়েছিল ওর। লিলি বলেছিল – এর পর এলে সোজা ভার্সাইয়ের প্যালেস। ওখানে সারাদিন। ও টিস্যুতে কাজল ঠিক করছিল না চোখের পানি মুছছিল বুঝতে পারেনি অয়ন। বলেছিল – যোগাযোগ রেখ অয়ন। আমি তোমাকে ভুলব না। কারণ? সব কারণ শুনতে নেই।
ওর হাত ধরে বলেছিল অয়ন – অবশ্যই যোগাযোগ রাখব। সেই একশ ফ্রাংকের নোটটা ওর পার্সে সযতনে রেখেছিল। বলেছিল ফরাসি ভাষায় – জে লা আডোরে। কোথায় যেন শুনেছিল ও এমন কোনো বাক্য। আর এক লাইন ফরাসিতে হেসে উঠেছিল লিলি। বলেছিল কেবল – মেস চেরি! মাই ডার্লিং। ঝু টে ডোর। এই ব্যাক্যের অর্থ জানত অয়ন। বুঝেছিল লিলি ওকে বলছে – আই লাভ ইউ। আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তারপর একটা মেঘ যখন আকাশ থেকে নেমে দশতলা বাড়ির ছাদে, বলেছিল লিলি – এখন যাই।
সেই বিচ্ছেদের কষ্ট তখন অয়নের বুকে। অনেক দিন ব্যথার মতো লেগেছিল সেই অনুভব।
তার পর যখন পেস্ননে ওঠার আগে ওকে ফোন করতে চেয়েছিল বুঝতে পেরেছিল পার্সটা হারিয়ে গেছে। যেখানে সযতনে রাখা ছিল একটি একশ ফ্রাংকের নোট। ওখানে আর কোনো টাকা-পয়সা রাখেনি। পাছে ভুল করে খরচ হয়ে যায়। তার পরও শেষ রক্ষা হলো না। হিপ পকেট থেকে টুক করে কেউ তুলে নিয়েছিল সেই পার্স। দুঃখে, বেদনায় ও কেবল পাগলের মতো ফোন নম্বর মনে করার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। মনে-মনে বলেছিল ভিনসেন্ট বুলাভার্ড, উচ্চারণ করেছিল বারবার। ভিনসেন্ট ভিনসেন্ট। তারপর স্টার স্টারি নাইট। অয়ন জেনে গেছে কখনো ও এ-নাম ভুলবে না। যেন এ-নামটা কখনো মন থেকে মুছে না যায় লিখে রেখেছিল ডায়েরির অনেক পাতায়।
আল কার্টার দশতলা বাড়ি। ডিস মানে দশ, এটাও জানা ছিল ওর। মনে-মনে ভেবেছিল, সামনের বছর ফিরে আসব এবং সোজা ওর বাড়িতে চলে যাব। দশতলার শেষ বাড়ি। যেখানে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে পুরো প্যারিস দেখা যায়। যে-দালানের নিচে একটি ফুলের দোকান আছে। যে-দোকানে ও প্রথম দেখেছিল লিলিকে।
কিন্তু আসা হয়নি। প্রথমে বাবা ছিলেন অসুস্থ। বড় ছেলে অসুস্থ বাবাকে ফেলে আসতে পারে না। এর পর বাবা চলে গেলে তার ব্যবসাপত্র বুঝে নিতে-নিতে সময় চলে গিয়েছিল। মা বউ ঠিক করলেন। বিয়েও করে ফেলল অয়ন; কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে লিলির মুখটা রইল অমস্নান। যখন সে প্রথম দশতলা দালানের নিচে ফুল কিনতে দেখেছিল। ঠিক সেই ছবিটা। হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে লিলি যখন ওকে দেখছিল। একরাশ চুলের ভেতরে ওল্ড মাস্টার্সের ক্ল্যাসিক ছবি, এমনই দেখতে ছিল কিনা ও।
রপসা বেশ মেয়ে। সুন্দর মেয়ে। সংসারে সুখী বলতে যা বোঝায় তেমনই তো ছিল ও। তাহলে লিলিকে কেন মনে পড়ত সময়ে-অসময়ে কে জানে।
এবার অয়ন প্যারিসে এসেছে বিশ বছর পর। মনের ভেতর সেই ছবিটা স্পষ্ট। লিলি দোকানে ফুল কিনছে। লিলির বয়স কত ছিল তখন? উনিশ-কুড়ি। ব্রোকেন ফ্যামিলির ও মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করে কেবল নিজের এক ছোট ফ্ল্যাটে বাস করছে। স্বাধীনতায় পাখির মতো চঞ্চল। বাড়িটা খুঁজে পেল কেবল এই জানতে লিলি ওখানে থাকে না। লিলি রায়। কোথায় থাকে ওই দালানের কারো জানার কথা নয়। কবে সে ছিল, কবে সে চলে গিয়েছিল, সে-খবর কে রাখে। পাগলের মতো খুঁজছিল অয়ন লিলিকে। একটি দিন একসঙ্গে কাটানোর সেই আবেশটা এখনো ওকে অস্থির করে। কোথায় গেল লিলি। কোথায়? প্যারিস শহরে ঠিকানাবিহীন একজনকে খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সুচ খুঁজে পাওয়ার মতো কঠিন। ওর বাড়ি ছিল ‘বেল এয়ার’ মেট্রো স্টেশনের খুব কাছে। এখন তার পাশে অনেক পরিবর্তন হলেও ওর সেই দশতলা বাড়িটা আছে।
আসার আগের দিন চলে এলো। লিলিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। ডানিয়ুব নামের মেট্রোর স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠে অয়ন। ওকে যেতে হবে ভিক্টর হুগো স্টেশনে। চুপচাপ ভাবছে, কোথায় হারিয়ে গেল আমার সেই লিলি। হঠাৎ চমকে মুখ তুলে তাকায়। ওই তো লিলি। একটা কালো ব্যান্ড মাথায় আর একটি ছোট হেয়ারব্যান্ডে এক বন্য দুরন্ত চুলকে বাতাসের শাসন থেকে বাঁচাতে বেঁধে রেখেছে। অয়ন ওর দিকে ছুটে যেতেই ডানিয়ুব স্টেশনে ট্রেনটা থেমে গেল। লিলি নেমে পড়েছে। কাঁধে একটা বড় ঢাউস ব্যাগ। হাতে একটা ফুলের ব্যুকে। অয়ন নানাসব জিনিসপত্র সামলিয়ে ওকে খুঁজতে থাকে। এসকেলেটর বেয়ে ও ওপরে উঠছে। অয়ন চিৎকার করে ওর নাম ধরে ডাকবে, কেমন হবে সেটা। কেবল দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে। অয়ন জানে, লিলি খুব জোরে হাঁটতে পারে। এবার ও হাঁটতে-হাঁটতে সোজা বড় রাস্তায়। অয়ন প্রায় ছুটে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ায়। ওর হাতের জিনিসপত্র নিয়ে হাঁফাতে-হাঁফাতে বলে – লিলি লিলি। তখন থেকে আমি তোমার পেছনে ছুটছি। লিলি মুখ ফেরায়। মসৃণ কপালে দুপুরের আলো। দুই চোখে অপার বিস্ময়। কালো বড়-বড় চোখ। কালো চুলের রাশ। এই তো লিলি! লিলি তাকিয়ে আছে মুখের দিকে। তারপর হেসে ওঠে। বলে – আমি লিলি নই।
কে তুমি?
আমি শিভন।
তুমি লিলি না?
মেয়েটি বলে – চলুন ওই বেঞ্চটায় বসি।
একটা বিশাল গাছের নিচে বেঞ্চ পাতা। শিভন ওর কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রাখে। হাতে একঝাড় ফুল। অয়ন বসে। তারপর বলে ও – আপনি অয়ন, তাই না?
আমি অয়ন। তুমি যদি লিলি না হও কেমন করে জানলে আমি অয়ন। শিভন আবার হাসছে। বলে, আজ থেকে বিশ বছর আগে আপনি লিলিকে দেখেছিলেন তাই না? কেমন করে ভাবলেন বিশ বছর পরেও লিলি ঠিক আগের মতো আছে।
অয়ন বোকা হয়ে যায়। ঠিক! কি করে একজন বিশ বছর পরেও একরকম থাকে? তার মুখের রেখায় হয় না কোনো পরিবর্তন! কেমন করে। এবার অয়ন অসহায়ের মতো হাসে। ঠিক বলতে পারে না, হৃদয়ের ভেতর যে-ছবিটা আছে তার তো কোনো বয়স বাড়েনি। ঠিক তেমনি একটি মুখ।
মায়ের নোটবইয়ে একটা ছবি ছিল। সেন নদীতে নৌকায় ওঠার ছবি। ছবিটা মা বড় সযতনে রেখেছিলেন। আর আপনার সঙ্গে ঘোরার পুরো ঘটনা সেই নোটবইয়ে যত্ন করে লেখা ছিল। মা অনেক দিন আপনার জন্য প্রতীক্ষাও করেছিলেন বলে জানি। আসলে আমি সেদিন কিন্তু আপনাদের সঙ্গে ছিলাম।
তুমি ছিলে?
আপনি যখন আমার মাকে দেখেন তার কিছুদিন আগে একজন তাকে নির্দয়ভাবে ফেলে চলে যান। ফরাসি মেয়ে কেবল ভোগের জিনিস, এই ছিল তার ধারণা! যা আমার সরল মা বুঝতে পারেননি। ওই মানুষটার কারণে মা নিজের মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে নিজের মতো বাঁচতে চেয়েছিলেন। মা শেষ পর্যন্ত সেটা পারেননি। ওদের ভালোবাসার সন্তান আমি।
আমাকে তো কিছু –
আপনি ফিরে এলে বলতেন। সেদিন না বললেও। তারপর থেকে আমার মা একা। আর কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্ক করতে চাননি।
অয়ন অবাক হয়ে শিভনের কথা শুনছে। শিভন একটু থেমে বলে – আমি সেই ভালোবাসার সন্তান। আমি আর মা বেশ ছিলাম আমরা। এরপর অনেক সময় ও চুপ করে থাকে। তারপর বলে – আসলে হয়েছে কি জানেন, আজ আমি আমার মায়ের কবরে ফুল দিতে চলেছি। গত বছর এই দিনে আমার মা ক্যান্সারে মারা যান।
ওর বুকের ব্যথা আবার তীক্ষন সুচের মতো অয়নকে আঘাত করে। শিভন বলে – সবাই বলে, আমি নাকি আমার মায়ের কার্বন কপি। আপনি লজ্জা পাবেন না ভুল করার জন্য।
একরাশ ‘লিলি অব দ্য ভ্যালি’ কিনেছিল অয়ন। পরেছিল সেই ভিনসেন্ট বস্নু টাই, যা লিলি একদিন ওকে উপহার দিয়েছিল। এমন একটি দিনের জন্য যে-টাই সযতনে রাখা ছিল। লিলির কবর একটা নির্জন জায়গায়। সেখানে গাছ আছে, চারপাশে ফুলের বাগান আছে। এ-কবর নয়, মনে হয় কোনো এক ফুলভরা পার্কের অংশ। যেমন প্রকৃতি লিলির খুব পছন্দ ছিল।
সরসর শব্দে গাছটা কী বলেছিল অয়নকে – এতদিন পরে তোমার সময় হলো অয়ন? দুলে উঠেছিল ঝুলে-থাকা একটি ফুলভরা শাখা। অয়ন অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকেছিল সেই সমাধির পাশে। তারপর বলেছিল – এতে আমার কিছু এসে-যায় না লিলি। তোমার শিভন? সেটা এমন কি ঘটনা বলো? আমি তোমাকে ভালোবেছিলাম জানো। আমার এতদিনের প্রতিটি মুহূর্তে তুমি আমার সঙ্গে ছিলে। তোমাকে দেখার একটা গভীর প্রত্যাশা ছিল। সময়মতো আমি আসতে পারিনি লিলি। ক্ষমা করো তুমি। কবরে লেখা ‘লিলি রায়’। তারপর তার জন্ম-মৃত্যুর তারিখ। আর ফরাসি ভাষায় এক পঙ্ক্তি কবিতা। কোনো এক ফরাসি কবির কবিতার এক লাইন। পাশের কবরে একজন ফুল দিতে এসে সেই কবিতার মানে করে দিয়েছিল – এমন ফুলভরা বাগানে আমার সময় কাটবে কে কবে ভেবেছিল।
সত্যিই ফুলভরা বাগান। অয়ন শিভনের কোনো ঠিকানা নোটবইয়ে লিখে রাখেনি। লিলির কার্বন কপি হলেও শিভন লিলি নয়।

সন্ধ্যায় সমকালীন - প্রশান্ত মৃধা


সন্ধ্যায় সমকালীন
প্রশান্ত মৃধা
আলতাফের চায়ের দোকানের সামনে হুডতোলা রিকশা থেকে মাথা বের করে মুনা জানতে চাইল, ‘সজীব ভাই, বিপ্লবরে দেখিচেন?’
সজীব আর ইকু পাশাপাশি দোকানের ভেতরের দিকে বেঞ্চিতে বসা। মুখ সামনের দিকে। তাদের সামনে বসা আশেক আর দেবাশিস। মাঝখানে টেবিল, সেখানে একটু আগে খালি হওয়া চায়ের ছোট্ট গেলাস। সজীব ইকু আর আশেকের হাতে আধপোড়া সিগারেট। সজীব আর ইকু সামনের দিকে মুখ করে বসে থাকায় মুনাকে দেখতে পেল। আশেক আর দেবাশিস দেখল না। মুনা বিপ্লবের খোঁজ জিজ্ঞেস করেই হুডের ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছে। রিকশাটাও দাঁড়িয়েছিল একেবারে আলতাফের দোকানের চুলোর সামনে। রিকশাঅলা সেখান থেকে একটু সমানে এগোলো। মুনা আবার গলা বের করছে। তার জিজ্ঞাসায় একপ্রকার উৎকণ্ঠা ছিল। তাতে সজীব হাতে ধরা সিগারেটটা ঠোঁটের কাছে নিয়েও থমকাল।
সামনে তাকায় সে, একই সময়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আশেক আর দেবাশিসের চোখে সজীবের চোখ। মুহূর্তে তারা পেছনে ঘুরে তাকিয়েছে। আর সজীব বলল, ‘না দেহিনি। কেন কী হইচে, ও মুনা?’
ইকু গলা নামিয়ে সজীবের কাছে জানতে চাইল, ‘মাইয়েডা কেডারে, এ সজীব?’
সজীব ইকুর উত্তর না দিয়ে মুনার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে রিকশা থেকে নেমেছে। নামামাত্র রিকশাটা এগিয়ে গেছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মুনা। দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, সে উদ্বিগ্ন। একশ’ ওয়াটের একটা বাল্ব, দোকানময় চা বানানোর চুলোর ধোঁয়াও কিছু আছে। চেষ্টা করেও মুনার মুখ যেন ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না। আবার যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে ঠিকঠাক পড়ে নেয়া যাচ্ছে সে মুখের উদ্বেগ। মুনা দোকানের দরজায় দাঁড়াতেই সজীব একটু দাঁড়ানোর ভঙ্গি মতো করে বসে জানতে চাইল, ‘কী হইচে, বিপ্লবরে পাতিচো না?’
‘না।’ মুনা বলল। যে ‘না’-টা তার মুখে ছিল, সেখান থেকে সহজে খসে পড়ল।
এদিকে ইকু, আশেক আর দেবাশিসের চোখ দেখে বুঝেছে তারা মুনাকে চেনে। সে-ই একমাত্র চেনে না এমেয়েকে। মুনা টেবিলের পাশে দাঁড়ায়। আশেকদেবাশিসের বাঁ দিকে, ইকু আর সজীবের ডান দিকে টেবিলের কোনায়। ইকুকে মুনা বলল, ‘কেমন আছেন, ইকু ভাই?’
ইকু ‘ভালো’ বলে আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে সত্যি মুনাকে চিনতে পারেনি। বিপ্লবকে চেনার চেষ্টা করছে। শহরে ইকুর পরিচিত অন্তত তিনজন বিপ্লব আছে। এক বিপ্লব তার পিঠাপিঠি বড় ভাই রুনুর সঙ্গে পড়ত, তার সঙ্গে ইকুর তুই-তোকারি সম্পর্ক, এই মেয়ে যে সেই বিপ্লবকে খুঁজছে না, তা বুঝতে পেরেছে; অন্য বিপ্লব তাদের ইস্কুলে নিচের ক্লাসে পড়ার সময় একসঙ্গে প্রচুর ফুটবল খেলেছে, মুনাকে দেখে বুঝেছে সেই বিপ্লবকে ও খুঁজছে না, কারণ সেই বিপ্লবের খোঁজে তার সজীবের কাছে আসার কথা না; বাকি যে বিপ্লব সে সজীবদের পাড়াতেই থাকত এক সময়, রামপালে একই গ্রামে বাড়ি, সম্পর্কে সজীবের কেমন যেন ভাই হয়, বয়সে তাদের চেয়ে বেশ ছোট। কিন্তু সেই বিপ্লবের সঙ্গে এই মেয়ের সম্পর্ক কী? আগে যতবার কোনো ছুটিতে শহরে এসেছে, কখনও দেখিনি ওই বিপ্লবের সঙ্গে অথবা একাকী!
সজীব বলল, ‘ফোন দাও। ফোন দিচো?’
‘কতবার,’ মুনা বলল, ‘তার তো দুটো সিম, দুটোই বন্ধ!’
‘বসো,’ সজীব বলল, ‘তোমার সাথে শেষ কহোন কথা হইচে?’
“বিকেলে, তখন সে খুলনায়— রওনা দিচে— ক’ল বাসস্ট্যান্ডে নাইমে আমারে ফোন করবে। তারপর আর কোনো খোঁজ নেই মানুষটার। ভাবলাম এই জায়গায় আড্ডা দিতিচে নাকি, সেই জন্যি খোঁজ করতি আসলাম।”
‘বসো।’ ইকু বলল, ‘এ রাজু,’ সে আলতাফের ছেলেকে ডাকল, ‘ওই চেয়ারডা টাইনে দে, মুইছে দিস।’ তারপর মুনাকে, ‘খুলনাদে বাসে ওঠার পর কথা হইনি তোমার সাথে?’
“হইচে। একবার। ক’ল ফয়সল ভাইর সাতে নাগেরবাজারের দিক যাবে। আমি ফয়সল ভাইরে ফোন করিচি— তার ফোনও বন্ধ—”
এতক্ষণ যেন ঘটনার একপ্রকার সূত্র পাওয়া গেল। মুনা বসেছে। চোখ-মুখের উৎকণ্ঠা কমেনি। কমার কথাও না। বসলেও যে কোনো সময় যেন উঠে যেতে পারে। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, ফয়সলের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে চারজনই এক সঙ্গে প্রায় একে অন্যের দিকে তাকাল। ফয়সল বিপ্লবের ভগি্নপতি, বড়ো বোন বুলার স্বামী। ইকু এইমাত্র বিপ্লবকে ঠিকঠাক শনাক্ত করতে পারল। কিন্তু মেয়েটা কে— বুঝে উঠতে পারেনি। তবে অনুমান করে নিল, বিপ্লবের বউই হবে।
মুনা তাদের পরস্পরের দিকে তাকানোটা খেয়াল করল। এমনকি এইসঙ্গে তার উৎকণ্ঠার বিষয়টাও যে একটু যেন তল পেয়েছে তাদের কাছে। দেবশিস জানায়, সে বাসা থেকে আসার পথে ফয়সলকে নাগেরবাজারের দিক থেকে ফেরিঘাটের দিকে যেতে দেখেছে। দেবশিস ভেবেছিল, জানতে চায় এইদিকে কোথায় যায়। কিন্তু ফয়সলের রিকশা দ্রুত বেরিয়ে গেলে তার আর জানা হয়নি।
সজীব প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দিল, ‘তা-লি মনে হয় ফয়সল ভাইর সাথে আছে।’
মুন বলল, ‘সেই জন্যি দুই জনেরই ফোন বন্ধ থাকপে?’
‘আইসে যাবে। টেনশন কইরো না। মনে হয় এমনি ফোন বন্ধ কইরে রাখিছে—’ ইকু জানতে চাইল, ‘চা খাও?’
‘না, এখন না। আগে বিপ্লবরে খুঁজি, দরকার আছে।’
‘চা খাইয়ে যাও?’ সজীব বলল।
‘না।’
‘ফোন কইরো আমারে— আমার ফোন নম্বর আছে তোমার কাছে?’
‘হু। আমার নম্বর আছে আপনার কাছে?’
সজীব মাথা ঝাঁকাল।
মুনা বেরিয়ে গেল।

আশেকই এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি। মুনার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর প্রতিবারই সজীব আর ইকুর সঙ্গে তার কথোপকথন খেয়াল করেছে। মুনা বেরিয়ে যেতেই বলল, ‘এই জায়গা বইসে চা খা’লি বিপ্লব শুনলি ওরে আস্তো রাখপো না— ওই যে বাইরে যে কয়ডা [রাস্তার উল্টোদিকে পুরনো বার কাউন্সিলের সিঁড়িতে] বইসে রইচে তাগো আইসে জিগোবে মুনা এই জায়গায় বইসে চা খাইতে কি-না?’
‘কেন?’ সজীব জানতে চাইল, ‘আমাগো সাতে চা খালি কী হবে?’
‘পুরুষতন্ত্র—’
আশেক এভাবে কথা বলে। শুনে, হো হো হো করে হাসল ইকু। রাজু চায়ের গেলাস ধুচ্ছিল। ফিরে তাকাল। ইকু বলল, ‘এ রাজু ফিরে দেহিস কী? চা দে— আমারে রঙ চা। আর সিগারেট আন।’
ইকুর কথা শেষ হতেই আশেক বলল, ‘নিজে যেহানে যা করুক। মাল খাইয়ে পইড়ে থাকুক আর ফান্টু খাক, আর ঝন্টু ডলতি ডলতি হাতের তালু সমান বানাইয়ে ফেলুক আর যাই করুক— দরকার হলি মাগিবাড়ি যাক কোনো সমস্যা নেই— বউ পরপুরুষের সাথে বইসে চা খাইচে তাতে যত সমস্যা।’
ফান্টু অর্থাৎ ফেনসিডিল, ঝন্টু অর্থাৎ গাঁজা। স্থানীয় নেশাখোররা এভাবে বলে, যারা এতে অভ্যস্ত নয় কিন্তু বিষয়টা জানে, তারাও নিজেদের ভেতরে এভাবে বলে। আশেকের কথা শুনে রাজু হাসল, ‘আশেক কাকু, আস্তে—’
ইকু আবার হাসল। হো হো শব্দ তুলে। সেই ফাঁকে সজীব প্রায় স্বগতোক্তি করল, ‘আমার সাতে বইসে চা খা’লিও পর পুরুষ?’
‘নয়তো কী? শরিয়ত মোতাবেক আপনি তো তাই? নাকি? যতই আপনি বিপ্লবরে ন্যাংটা কাল দে চেনেন— আপনার ছোটো বুন সুপ্তি আর মুনা খুলনা ভার্সিটিতে এক সাথে পড়ূক— তাতে কী আসে যায়? বউ তো বাড়ির বউ— হোক এই শহরের মাইয়ে কিন্তু আলতাফের চার দোকানে বইসে চা খাইছে— তা বিপ্লবের মতো মানুষ সহ্য করবে কী করে? মুনার ঠেঙানির ভয় আছে না?’
ইকু আবার শব্দ তুলে হাসে। সজীব বলে, ‘তোর হইচে কী, বোকাচোদার মতো হাসতিচিস কেন?’
‘এ বুদ্ধিচোদা, আমি বোকাচোদার মতন হাসলাম কহোন? সব বুইজে আমি আসলে বোকাচোদা সাইজে গেইচি— হাসতিচি জ্ঞানীর মতন। আমার কতখানিক জ্ঞান লাভ হলো, তুই বুঝদি পারতিচিস? দেবা [দেবাশিস] যা কওয়ার মুনারে কইয়ে দিচে— আসল কথা। আর আমিও যা বোঝার বুইঝে গেইচি—’
‘এ কী বুজিচিস তুই?’ সজীব জানতে চায়।
‘ইহু— এহোন কওয়া যাবে না।’
‘কেন?’
‘আগে দেবার কথা শুইনে লই— তারপর ক’বানে—’
দেবাশিস গলা নামিয়েছে বলে, ‘আমার আর কথা কী, যা কওয়ার কইচি।’
দেবাশিসের এ কথার অর্থ সজীব কিছুই বোঝেনি। ইকুও না। তবে, আশেকের মুখ দেখে তারা কিছুটা হলেও অনুমান করতে পেরেছে ঘটনাটা কী? হয়তো দেবাশিস আর আশেক বিষয়টা কিছুটা হলেও জানে। তাই স্বাভাবিক। ইকু বহুদিন ধরে ঢাকায় থাকে। সজীব থাকে খুলনায়। এসেছে সুপ্তির বিয়ের ব্যাপারে, কথা হচ্ছে এ জন্য। ইকু এসেছে এনজিওর কাজে। দেবশিস ঢাকায় যায় আসে। ঢাকায় গেলে ভাইয়ের বাসায় থেকে কীসব কোচিং করে। বিদেশে যাবে। আশেক সার্বক্ষণিক পার্টি কর্মী। এমন না যে তাদের এ মুহূর্তের এখানে বসা খুব হিসেবে করে।
সন্ধ্যা হয়েছে, ইকু আর সজীব আলতাফের চায়ের দোকানে এসেছে, সেখানেই বসাছিল দেবাশিস আর আশেক— আড্ডা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ হলো বসেছে। চা খেয়েছে একপ্রস্থ। এর ভেতরে মুনা আসায় তাদের আলোচনা ঘুরে গেছে। হয়তো ইকুর জন্যই এখন মুনা আর বিপ্লবকে নিয়ে আগ্রহী তারা। কিন্তু দেবাশিসের শেষ বিকেলে ফয়সলকে দেখা আর সে কথা মুনাকে বলার ভেতর দিয়ে তারা বুঝতে পারল— আশেক আর দেবাশিস কিছু একটা অনুমান করছে, আর বিষয়টা তাই। আশেক সে কথা ইঙ্গিতে বলেওছে। হয়তো তাদের দু’জনের চেয়ে ওরা বয়সে ছোট বলে কথার অনেকখানিকই রেখেঢেকে বলছে।
ইকু বলল, ‘দেবা, কী হইচে— কী ক’তিলে [বলছিলে]?’ বলেই রাজুকে বলল, ‘এ রাজু, যা কয়ডা সিগারেট নিয়ে আয়।’ এরপর সজীবকে, ‘এ সজীব, এই মেয়ের সাথে, কী যেন নাম মুনা— বিপ্লবের বিয়ে হইতে কবে?’
‘তা বছরখানেক,’ আশেক বলল, ‘বিয়ে আর কী? বিপ্লব জোর কইরে উঠয়ে নিয়ে আইচে।’
‘মানে?’ ইকু ধন্ধে পড়ল। সজীব সবই জানে। সুপ্তির কাছে শুনেছে।
‘মানে আর কী? ওরা তো আগে বাগেরহাট থাকত। তারপর মুনা খুলনা ভার্সিটিতে চান্স পালি ওরা খুলনা চইলে যায়। ওর ছোটভাই জিলা ইস্কুলে ভর্তি হইচে। এই সময় বিপ্লবের সাথে প্রেম... কিন্তু মুনার বাপ তো বিপ্লবের চৌদ্দগুষ্টি ভালো কইরে চেনে... আর দিনে দিনে মুনাও বুঝদি পারছি বিপ্লব নেশা করে... মনে হয় রাজি ছিল না বিয়ে করতি...’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী? একদিন গল্লামারি যাইয়ে উঠোইয়ে নিয়ে আইচে... ফয়সল ভাই আর বিপ্লব... সাথে বাগেরহাটের আর কয়জন কৃতী সন্তান... এহোন তো মুনার ক্যারিয়ার শেষ... দিন শেষে বিপ্লব কোথায় আছে খুইচে বেড়ায়?’
‘এর সাথে সজীবের কাছে এইভাবে এইসব কওয়ার সম্পর্ক কী?’
‘আছে। সেই জায়গায় তো কবি নীরব... চা খাতি সমস্যা নেই... কিন্তু—’
এবার সজীব ধাঁধায় পড়ল। একেবারে অবুঝ চোখে সে আশেকের দিকে তাকাল। সন্ধ্যাটা এখন বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে। বাসায় কোনো কাজ আছে কি-না কে জানে। সুপ্তি ফোন করলেই সে উঠে যাবে। কিন্তু সুপ্তি ফোন করছে না। আম্মা সুপ্তিকে নিয়ে হরিণখানা গেছে বড় খালার বাসায়। হয়তো ফেরেনি। এসব ভেতরে ভেতরে ভেবে নিয়ে সজীব আশেকের মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু আশেক কথা থামিয়েছে। দেবাশিস বলল, ‘মেয়েটা আছে মহাসমস্যায়... কয় মাসে কী হইয়ে গেইচে... এহোন তাকানো যায় ওর মুখের দিকে... আগে কী সুন্দর দেখতি ছেলো...
‘দেবা আস্তে কথা ক’— বিপ্লবের বউরে তুই সুন্দর কইচিস— দেখা গেল তোর চোখ খুইচে নিয়ে গেইচে— তা আবার আমার মতো বামপন্থির পাশে বইসে কইচিস— সরকারি দলের নেতার বউ—’
‘ও নেতা নাকি?’ ইকু জানতে চায়।
‘পাতি— তয় নেশাখোরগো নেতা। নেশাখোরগো এট্টা সর্বদলীয় সার্কেল আছে— সেই সার্কেলের নেতৃত্ব দেয়—’
কিন্তু এতে সজীবের কাছে মুনার আসার রহস্য ঘোচে না। ইকুর মতো প্রায় কিছুই না জানলেও সজীব শহরের বর্তমান পরিস্থিতির কিছু জানে। জানে বিপ্লব আর মুনার সম্পর্কেও। কিন্তু আশেক যে ইঙ্গিত দিল এইমাত্র তার কোনো কিছুই সে বুঝতে পারল না। ফলে, সজীব আশেককে বলল, ‘আমার কাছে এভাবে বিপ্লবের খোঁজ জানতে চাওয়ার কারণ কী, আশেক?’
আশেক কোনো কথা বলল না। চুপ করে থাকল। দেবাশিসের দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘এ দেবা, ক— কী সম্পর্ক?’

তবে, মুনা আলতাফের চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে নাগেরবাজারের দিকে গেছে। সে কিছুটা হলেও জানে কোথায় ফয়সল অথবা বিপ্লবকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ফয়সলের বন্ধু হাবলু বাসায় নেই। হাবলুর ফোনও বন্ধ। আর বিপ্লব এইদিকে মাঝে মাঝে কুতুবের বাসায় আসে, কিন্তু মুনা কুতুবের বাসা চেনে না। সে বিপ্লব আর কুতুবের বন্ধু টগরকে ফোন করে। টগর তাকে কুতুবের নম্বর এসএমএস করে। সেই নম্বরে কুতুবকে ফোন করলে কুতুব জানায়— সে এখন আড়তে, নাগেরবাজার। বিপ্লবের সঙ্গে দুপুরের পরে তার আর কোনো কথা হয়নি। তবে, কুতুব এখনই খুঁজতে বের হচ্ছে কোথায় বিপ্লব আছে। কিন্তু মুনা জানে কুতুব খুঁজতে বের হবে না বিপ্লবকে। এক কাজ একজন মানুষ কয়দিন পর পর করবে কেন? আর যদি করেও তা আরও পরে, এখন কুতুব আড়ত থেকে বের হবে না।
এই সময় সজীবকে ফোন করে মুনা। বলে : সজীব ভাই, আমি নাগেরবাজার আইচি। বিপ্লবরে কোথাও পালাম না। এখন বাসায়ও যা’তি পারতিচি না। আমার শাশুড়ি আইজকে আমারে ভীষণ গালাগালি করিচে। যা বলিছে তা আপনারে এখন বলতি পারব না। সামনাসামনি দেখা হলি ক’বানে—’
বিপ্লব মাঝখানে একবার ‘হু’ বলল। তারপর মুনা আবার বলে যায় : বিপ্লবরে না নিয়ে আমি বাসায় ঢুকতি পারব না। আপনি দেইখেন তো বারের সামনে যারা বইসে আছে তাগো মধ্যি কেউ বিকেলে কি সন্ধ্যার পরে বিপ্লবরে দেহিচে কি-না। একটু খোঁজ নেন... প্লিজ...’
মুনার গলা ধরে এসেছে। বিপ্লব বলল, ‘হ্যালো মুনা, শোনো...’
মুনা বলে চলে, ‘আপনারে ওই সময় কিছু কথা ক’তি চাইলাম, কিন্তু আপনার সামনে সবাই, সেই জন্যি ক’তি পারলাম না। আচ্ছা পরে ক’বানে— আমি দেখি বিপ্লব রেললাইনের ওদিকে গেইচে নিকি?’
সজীব ফোন রাখতেই আশেক সজীবের দিকে তাকাল। তারপর আশেকের দিকে। ইকু বুঝতে পারল না, কিন্তু বোঝার চেষ্টা করল। আশেক বলল, ‘কী মুনার ফোন?’
ইকু প্রসঙ্গটা পাল্টাতে চাচ্ছিল। পাল্টেওছিল। কিন্তু মুনার এই ফোনে আবার তারা প্রায় অজানিতে আগের পরিস্থিতিতে ঢুকল।
সজীব ‘হু’ বলতেই আশেক বলল, ‘কইনেই [বলেছি না], মুনা আপনারে ফোন করবে— জানতাম—’
‘কেন?’ ইকু জিজ্ঞাসা করল। সজীব আশেকের আচরণে আর দেবাশিসের সায়ে একটু হকচকিয়ে গেছে। বুঝতে পারছে না, এখন কী বলবে।
আশেক বলল, ‘এ দেবা, এই বড় ভাই দুজনরে বুঝোইয়ে ক— কেন ফোন করিছে। কয়দিন বাদে বাদে শহরে আসে আর জানে তো না যে মাইয়ে-ঝি-বউ এখন কী পদের জিনিসে পরিণত হইচে?’
‘কী হইচে?’ ইকু বলে।
‘কী আর? বিপ্লব ভাইরে রাতে ফোন করবে। কবে তারে পারলি কিছু টাকা ধার দিতি। নয়তো ফ্লেক্সি করতি। দেহা গেল কাইলকে ক’ল ওরে খুলনা নিয়ে যা’তি—’
ইকু বিস্মিত, ‘তাই নাকি?’
সজীব চুপ। তার বোনের বান্ধবী। অনেক দিন ধরে চেনে। সে এই মুহূর্তে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চায় না।
‘তাই নাকি? তাই ঘটে।’ ইকু বলে।
আশেক সিরিয়াস ছেলে, তার কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো কথা নেই। কিন্তু একটু আগের ঘটনার সঙ্গে এখন ইকু আর সজীব কোনোভাবে চিন্তার দৌড় মেলাতে পারে না। পরস্পরের দিকে তাকায়। ইকু সজীবকে বলে, ‘এ সজীব কয় কী? ঘটনা এরকম নাকি? এতদূর? বুড়ো হইয়ে গেলাম নাকি? কিছুই তো বুঝি না।’
দেবাশিস বলে, ‘বুড়ো হবে কেন? বুড়ো হলি কী আর এত কিছু হয় আপনাগো নিয়ে?’
আশেক বলল, ‘দেখলেন না কীভাবে কেমন আছে ইকু ভাই জানতে চাইল!’
‘ধুস, কী কও এই সমস্ত—’
‘সত্যি— দেইহেন— আপনারা বড় ভাই, আপনাগো সাতে ইয়ার্কি মারি নাকি? দেইহেন— গরিবের কতা কহোন বাসি হলি তারপর ফলে—’
‘এ রাজু, চা দে—’ ইকু বলে সজীবের দিকে তাকাল, ‘চা খা আর একবার টেনশন করিস না— রিয়েলিটি— বাস্তবতা—
‘না। পরাবস্তবতা—’
ইকু আবার গলা ছেড়ে হাসল। সজীব শুকনো মুখে। সুপ্তি কেন ফোন করছে না ভাবল। তারপর বলল, ‘ইকু, পরাবাস্তবতা অর্থ যেন কী?’
‘কোনো অর্থ নেই— চা খান—’ দেবাশিস এবার আশেককে বলল, ‘তুই এট্টু ভালো কইরে বুঝোইয়ে দে—’
‘বুঝোনোর কিছু নেই। সময় হলি আপনিই বুঝে যাবেন।’
সজীবের ফোন আসে। সুপ্তি ফোন করেছে। সজীব বলে, ‘আসতিচি।’ ফোনটা পকেটে রেখে ওঠামাত্র সজীবের কাছে মুনা ফোন করে, ‘সজীব ভাই, কথা আছে আপনার সঙ্গে—’ সজীব বলে, ‘মুনা, আমি এখন ব্যস্ত— তুমি পরে ফোন করো।’ মুনা বলে, ‘আচ্ছা, রাতে ফোন করবানে—’
ইকু আশেকের দিকে তাকায়। সজীব উঠে যায়, ‘আমি এট্টু বাসার দিক গেলাম। ইকু আধঘণ্টা বাদে আমারে ফোন করিস— ফ্রি থাকলি আসপানে— তুই কোথায় আছিস আমারে জানাস?’
সজীব বেরিয়ে যেতেই আশেক বলে, ‘দেইখেন ইকু ভাই, মুনা সজীব ভাইরে কী কয়। যা কইচি তাই ঘটপে।’
ইকু বিস্ময়ের সঙ্গে আশেক আর দেবাশিসের দিকে চেয়ে থাকে।

মুনা পরে সজীবকে আবার ফোন করে, সন্ধ্যাটা পুরোপুরো রাতে পরিণত হওয়ার আগেই। আর, আশেক যা যা বলেছিল, প্রায় তাই বলে। সজীব ফোন করে বলে ইকুকে।
সৌজন্যে : সমকাল, ২৩/৮/১৩

পিতৃবিয়ােগ - আখতারুজ্জামান ইলিয়াস


পিতৃবিয়ােগ

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

সুর্মা দেওয়া চোখ, কপালের ভাঁজ খুলে যাওয়ায় ফর্সা চামড়া এখন পাথরের মতাে মসৃণ। শাদা কাপড়ে লােবান ও আতরের গন্ধ। শিয়রে ও পায়ে ধূপকাঠি পােড়ে, মনে হয় ধোয়াটাও শরীরের ভেতর থেকে আসছে। আর যা সব আগের মতােই। মাঝখান দিয়ে আঁচড়ানাে ছােটো করে ছাঁটা চুলে শাদা রেখা যা ছিলাে তাই আছে। পাছে তার আঙুলগুলাে কোনাে ফাঁকে ঐ চুলে বিলি কাটতে শুরু করে এই ভয়ে ইয়াকুব নিজের হাতজোড়া সরিয়ে রাখে। খাড়া নাকের নিচে গোঁফের ঝােপে শাদা কাঁটার সংখ্যা বােধ হয় একটিও বাড়ে নি। গালের নীলচে আভাটা নেই, গালে অতি সংক্ষিপ্ত চিবুকে দাড়ির অঙ্কুর, তার বেশ কয়েকটির রঙ শাদা। ফ্যাকাশে ঠোঁট একটির ওপর আরেকটি টাইট করে আঁটা, চিরকাল এমনই ছিলাে। চোখের ওপর শােয়ানাে চোখের পাতা। ভেতরের মণির রঙ কালাে কি গাঢ় খয়েরি জানা নেই। ঐ মণির দিকে কি কখনাে সরাসরি তাকানাে গেছে ? এখন মণিজোড়া একেবারে আড়ালে চলে গেলাে। চোখের পাতা আর কোনােদিন নিজে নিজে খুলবে না।
আর সামলানাে যায় না। ইয়াকুবের মাথা নুয়ে পড়ে নিচের দিকে। চোখ জুড়ে মেঘ নামে। লাশের মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে নেওয়ার পর তার সারা শরীরে যে গাএলিয়ে-দেওয়া অবসাদ নেমে এসেছিলাে, তা কেটে যাওয়ায় মাথা, চোখ ও গলাকে এখন স্পষ্ট অনুভব করা যাচ্ছে। চোখ দিয়ে অঝােরে পানি ঝরতে শুরু করলে ইচ্ছা হয় ‘আব্বা' বলে খুব জোরে একবার হামলে উঠি। কিন্তু জীবিত আশরাফ আলীর গম্ভীর ও শীতল মুখের কথা ভেবে, তার আকাঙ্ক্ষিত পিতৃ-সম্বােধন দাঁত ও নােনা জিভের চাপে বেরিয়ে আসে ফোঁপানির মধ্যে। সামনে সব ঝাপশা।
‘দেখিছেন ?' কে যেন পাশ থেকে কথা বলে, তাকেও দ্যাখা যায় না, ভালাে করি দেখি নেন বাবা! আর কোনােদিন দেখতি পাবেন না!'
‘একটা দিন আগে আসলিও তাে দেখতি পারতেন! কপাল!' ‘আরে একটা দিন আগে আসলি উনার বাপে মরে ? ছেইলে এখেনে থাকলি পর ডাক্তারে কি তারে বগলদাবা করি নিয়ে মাল টানাতি পারে ?'
‘আস্তে আস্তে!  ছেইলে তো বাপু!  তিনি ছেলেন মাটির মানুষ, যে যেখানে ডেকিছে গেছেন!
‘ঐটে কোনাে কতা নয়! কপাল! অদ্দেষ্ট! শ্যাষ পর্যন্ত ছেইলেরে দেখতি পারলাে না!'
‘ছেইলির জন্যি শ্যাষে দেখলে না কেমন মাথা বেঁকিয়ে দুই চোখের নাটা দুইখান ঘুরােয়ে ঘুরােয়ে দেখতিছিলাে, মন্তাজ ভাই খেয়াল করিছাে ?'
'করি নাই ? আমারে কয়, ও মন্তাজ, একমাত্তর ছেইলে তারে দেখতি পালাম না! খপর দিও!’
‘ও মণি! তুমি এইডে কী কও? তার কি আর কতা কওয়ার হুশ ছেলাে ?'
‘আহাহারে! একমাত্তর সন্তান ! মরার আগে তার হাতে এক ঢোক পানি খাতি পারলাে না!'— এই সব সংলাপের শব্দ ইয়াকুবের কানে আসে, কিন্তু বাক্যে বাঁধা পড়বার আগেই গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। ছেলের হাতে পানি খেয়ে মরা কি ছেলের উপার্জনে ভাত খাওয়ার আয়ােজনও তাে ইয়াকুব করে ফেলেছে। তার ধীর-স্থির বাবা আর একটা বছর ধৈর্য ধরতে পারলাে না ? তেইশটা বছর একেবারে একা একা কাটালাে! কোথায় দক্ষিণের গ্রাম, এখানে কে তাকে দেখতাে, কে খাওয়াতাে, আদর-যত্ন করতাে কে ? এ সবের জন্য তার পরােয়াও ছিলাে না। চার মাস আগেই তাে রিটায়ার করার কথা, এক্সটেনশন হলাে এক বৎসরের জন্য। ইয়াকুব তখন চাকরি পেয়ে গেছে, বাপের এখন চাকরি করার দরকার কী ? না, তার এক কথা, দিলাে যখন আর একটা বছর, কাজ করি। ইয়াকুবের চকরি হয়েছে গােপালপুর সুগার মিলে, পােস্ট ছােটোখানাে, কিন্তু পারচেজে আছে, কাঁচা পয়সার জায়গা। মিলের বাড়ি পেয়েছে, হার্ডবাের্ডের সিলিং-দেওয়া দুটো টিনের ঘর, ছােট্টো উঠান, বাতাবিনেবু, গাছের নিচে পাকা কলপাড়, টিউবওয়েল, কলাগাছের ঝাড়, দুটো পেঁপে গাছ। দূরত্ব যাই হােক এখান থেকে ট্রেনে চাপলে বদলাবদলি নেই, একনাগাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা চললেই গােপালপুর।
কিন্তু ন’মাস চাকরি হলাে তার, আশরাফ আলীকে একটিবারের জন্য নিয়ে যেতে পারলাে না। দুই মামাকে দিয়ে বললাে, চিঠি লিখলাে দু’বার। দু’বারই তার একই জবাব, 'কর্মজীবনের প্রান্তে অনাবশ্যক ছুটি লইয়া কর্তব্যে অবহেলা ঘটাইতে চাই না।' চিঠির কপালেও ভাঁজ, ভুরুতে ডবল গেরাে। তার পােস্টকার্ড আসতাে মাসের মাঝামাঝি, পিঁপড়ের সারির মতাে গুটি গুটি অক্ষর, তাতেই উপদেশ, শ্বশুরবাড়ির সকলের কুশলজিজ্ঞাসা এবং নাম ধরে ধরে ‘শ্রেণিমত সালাম ও দোয়া জ্ঞাপন করা। দিন যায়, সালাম পাওনাদারদের সংখ্যা কমে, দোয়াপ্রার্থীরা বাড়তে থাকে, যথাস্থানে ঠিক ঠিক লােকের নাম লিখতে আশরাফ আলীর কখনাে ভুল হয় না। মাসের প্রথম দিকে বরাদ্দ ছিলাে মানিঅর্ডারের টাকা, মানিঅর্ডারের কুপন জুড়ে পিপীলিকা বাহিনীর পুনরাবির্ভাব, ফের উপদেশ, ফের কুশলজিজ্ঞাসা এবং সালাম ও দোয়া নিবেদন। কী পােস্টকার্ড কী মানিঅর্ডার কুপন— প্রত্যেকটির কপালে ভাঁজ, খাড়া ও কাঁটা কাঁটা গোঁফের নিচে বন্ধ পাতলা ঠোঁট। মামারা যে তার বাপের শালা তাদের সামনে পর্যন্ত সেই ঠোঁটজোড়ার কশ একটুও ঢিলে হতাে না। মামাদের মধ্যে মেজোমামাটারই ভাগ্নের দিকে টানটা বেশি। আবার আদর করে ওকে এখানে-ওখানে নিয়ে গেলে ইয়াকুব কারাে সঙ্গে তেমন কথা বলতে পারতাে না বলে বাড়ি ফিরে মেজোমামা মাঝে মাঝে বকতাে, ‘তাের বাপ হলাে হাঁড়িমুখাে পােস্টমাস্টার, চিঠিতে সীল মারতে মারতে মুখখানাকেও সীলের ডিজাইনে নিয়ে এসেছে! তারই তাে ছেলে, তুই আর লােকের সঙ্গে কথা বলবি কী ? নানী তখনাে বেঁচে। ছেলের এই একটি বাক্য তার সারাদিনের প্যাচালের উৎস খুলে দিতো ‘তুই আর লােকের সঙ্গে কথা বলবি কী ? তাই ভালাে। বেশি রসকস থাকলে ছেলেটা সৎমায়ের হাতে পড়তাে না? ভাগ্নেকে টাকাপয়সা খরচা করে মানুষ করার ক্ষমতা তােমাদের আছে ? নিজেদেরগুলােই টানতে পারে না আবার ভাগ্নেকে লেখাপড়া করাতাে, এ্যাঁ ? বাপ টাকা না পাঠালে এই ছেলে কোথায় ভেসে যেতাে!'
টাকাটা আশরাফ আলী পাঠাতাে খুব নিয়মিত। টাকা আসার সঙ্গে সঙ্গে জোহরা বিবির কন্যাশােক উথলে উঠতাে, ‘বিয়ের পর আঠারাে মাসও কাটলাে না! ফিরােজা, মা আমার, কী কপাল করে এসেছিলি মা রে, ছেলেকেও ভালাে করে দেখতে পারলি না! একুব, ভাই রে, কী কপাল করে এলি রে, ভাই, মাকে একবার দেখতেও পারলি না!'
কিন্তু নানীর কাছে, খালাদের কাছে, মামাদের কাছে গল্প শুনতে শুনতে মাকে তার একরকম দ্যাখাই হয়ে গেছে। মায়ের রঙ ছিলাে চাপা, কালাের দিকেই বলা যায়। ইয়াকুব পেয়েছে মায়ের রঙ। ইয়াকুবের স্বভাবও অবিকল তার মায়ের স্বভাব। সে কারাে সঙ্গে চড়া গলায় কথা বলতে পারে না, যে যা-ই বলুক না, 'না’ বলার শক্তি তার নেই। কিন্তু আশরাফ আলীর রগ অন্যরকম। তার বিয়ের সময় তার শ্বশুরের ইসলামপুরে কাটা কাপড়ের জমজমাট কারবার। তার শালাদের বয়স তখন কম, শ্বশুর কতােবার তার ব্যবসায়ে ঢুকতে বললাে। তার এক কথা, ‘না’। শ্বশুর শেষ পর্যন্ত না পেরে কলেজে পড়া চালিয়ে যাওয়ার খরচ দিতে চাইলাে। তাতেও না। কারাে কথায় কান না দিয়ে আশরাফ আলী প্রাণান্ত পরিশ্রম করে এই চাকরি জোগাড় করলাে, নতুন বৌ নিয়ে ড্যাং ড্যাং করে রওয়ানা দিলাে খুলনা না যশাের জেলার কোন গ্রামের দিকে, সেই গ্রামের সে হলাে পােস্টমাস্টার। সাহসটা দ্যাখাে! কয়েক মাস পরে পােয়াতি মেয়েটা আসে বাপের বাড়ি। সময়মতাে ব্যথা উঠলাে, মেয়ে গেলাে হাসপাতালে, সেই তার শেষ যাওয়া। তার বদলে ঘরে এলাে তার ছেলে। তা আশরাফ আলী ছেলেকে নিজের কাছে রেখেই মানুষ করতাে, সে যা একরােখা লােক, তার পক্ষে সবই সম্ভব। কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যুর ব্যাপারটা ভালাে করে বােঝবার আগেই তার হাতে-পায়ে ধরার উপক্রম করে জোহরা বিবি, বড়াে মেয়ের একমাত্র স্মৃতিটাকে সে কোলে-পিঠে করে রাখতে চায়।
আশরাফ আলীর তখন যা বয়স তাতে তার বিয়ে না করার কোনাে প্রশ্নই ওঠে । তার ওপর 'রাজপুত্র জামাই আমার, মিছে কথা বলবাে কেন?— মেয়ের তুলনায় জামাই আমার অনেক সুন্দর! তুই তাে হয়েছিস একটা ছুঁচো! একে তাে কালাে হলি মায়ের মতাে, আবার বাপের মতাে যদি একটু উঁচা-লম্বাও হতিস! সেই ফর্সা-লম্বা আশরাফ আলী মা-মরা ছেলেকে রেখে ফের চলে যায় পােস্টমাস্টারি করতে, কতাে জায়গায় যে ঘুরলাে, এই কুষ্টিয়া, এই যশাের-খুলনার গ্রামেই বেশি। ডুমুরিয়া, বাহিরদিয়া, দিয়ানা, নলতা, নাভারণ, নীলমণিগঞ্জ, আলমডাঙা—নিজেরই হাতে মারা কতাে ডাকঘরের সীল যে তার-লেখা পােস্টকার্ডে থাকতাে! এর কয়েকটি জায়গায় ইয়াকুবও গেছে। আশরাফ আলী নিজেই একবার নিয়ে গিয়েছিলাে। তখন এ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ, শীতকাল ছিলাে। ইয়াকুব তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। আলমডাঙা, কুষ্টিয়া জেলার সাব-পােস্টঅফিস। তারপর আর একবার ডুমুরিয়া গিয়েছিলাে ছােটোমামার সঙ্গে। আশরাফ আলীর অসুখের খবর পেয়ে জোহরা বিবি দু’জনকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাে।
কিন্তু রােগশয্যায় শুয়ে আশরাফ আলী ভ্র কোঁচকায়, 'আমার অসুখ ? কে বলল?'
‘আপনার চিঠিতেই তাে ছিলাে। মা বললাে।' ছােটোমামা মিন মিন করে, ইয়াকুবকে বােধ হয় লিখেছিলেন।
 টাকা পাঠাতে সেবার একটু দেরি হয়। তাই মানি-অর্ডারের কুপনের এক কোণে হঠাৎ লেখা হয়ে গিয়েছিলাে, শারীরিক দুর্বলতার দরুণ পত্র দিতে বিলম্ব হইল।।
আশরাফ আলীর মুখ লাল হয়ে যায়, 'ব্যস, এই জন্যে দু’জনে ড্যাং ড্যাং করে চলে এলে ? স্কুল-কলেজ থেকে নাম কাটানাে হয়ে গেছে ?'
ছােট মামা তখন নতুন-নতুন ভর্তি হয়েছে, তার খুব রাগ হয়েছিলাে। ঢাকায় ফিরে রাগ ঝাড়লাে মায়ের ওপর, 'অসুখের খবর শুনে গেলাম। মনে হয় মার্ডার করে তার কাছে গিয়েছি শেল্টার নিতে! আরে, মানুষের রােগে মানুষ যাবে না ? অসুস্থ লােককে দেখতে গেলেই তার প্রেসটিজ পাঙচার হয়ে যায়?' ছােটোমামার কথা শুনে রাগে ইয়াকুবের গা জ্বলে যায়, কিন্তু কাউকে চড়া করে কথা বলা তার সাধ্যের বাইরে। সুতরাং মনে মনে কেবল ফোঁসে, আমার বাবা কি তােমাদের মতাে মাগী টাইপের ? তােমাদের মতাে নাক দিয়ে দু'ফোঁটা জল পড়লেই ফোঁৎ ফোঁৎ করে রাজ্যময় ন্যুমােনিয়ার বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়ায় না। স্যাঁতসেঁতে কথাবার্তা শুনতে তার বাপের ঘেন্না হয়। ইয়াকুবের নিজেরই কতােবার বাবার সঙ্গে সােহাগ করতে ইচ্ছা করেছে, আশরাফ আলী আমল দেয়নি। ওর বড়ােমামার ছেলেমেয়েরা অফিস থেকে ফিরলে বাপের সঙ্গে কী জড়াজড়িটাই না করে! বড়ােমামা কেমন দিব্যি এই টুকুকে চুমু খাচ্ছে, এই খুকুকে নিয়ে লােফালুফি করছে। আর মেজোমামা তাে দোকান বন্ধ করে বাড়ির কাছাকাছি এসে 'আমার আব্বুজান’, ‘আমার বাপপুজান’ বলে চ্যাঁচাতে শুরু করে। অনেকদিন পর একবার আশরাফ আলী বাড়ি এসেছে। ইয়াকুব এক দৌড়ে দরজায় গিয়ে 'আব্বু'' বলে বাপের বুকে উঠে গলা জড়িয়ে ধরলাে। আশরাফ আলী আস্তে আস্তে তার হাত দিয়ে ছেলের হাত দুটো খুলে তাকে মেঝের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখে বলে, 'বয়স হলে ন্যাকামাে শােভা পায় না।'
আর একবারের কথা খুব মনে পড়ে। দুতিনদিন পর পর স্বপ্নে মসজিদের মতাে একটি জায়গার সামনে দাঁড়ানাে অস্পষ্ট নারীমূর্তির হাতছানি দেখতে পেয়ে ভয়ে ইয়াকুবের জ্বর এসে গিয়েছিলাে। তখন খুব ছােটো নয়, বারােতেরাে বছর বয়েস। জ্বরের ঘােরে তার প্রলাপ বকা শুনে জোহরা বিবি ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে আর মৃত কন্যার উদ্দেশ্যে বিলাপ করে, 'মা গাে, ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে হাত বাড়ালি ? মা রে, তাের ছেলেকে এতােটা বড়াে করলাম, কেন নিবি মা?' টেলিগ্রাম পেয়ে বেনাপােল থেকে বাবাকে চলে আসতে হয়। শাশুড়ির কাছে পুত্রধনের স্বপ্নদর্শনের কথা শুনে তার চাপা ঠোঁট আরাে সেঁটে যায়। ফিরে গিয়ে পাক্ষিক পত্রে আবার ভ্রু-কোঁচকানাে উপদেশ— জাগ্রত অবস্থায় তরল বিষয়ের প্রতি অবাঞ্ছিত মনোেযােগ ও অহােরাত্র লঘু কল্পনার জগতে অনূচিত বিচরণই এইরূপ স্বপ্নদর্শনের কারণ। চিত্ত উচ্চস্তরের চিন্তা দ্বারা শক্তিশালী হইলে এইরূপ কলঙ্ক ঘটিবার সম্ভাবনা রহিত হয়।
'কতােক্ষণ ধরি গল্পগুজব করলে! উজির আলী সরকার এলাে, তার সাথে কতাে ঠাট্টা-ইয়ার্কি, কতাে হাসাহাসি!' এই পর্যন্ত বলার পর লােকটার গলায় কাঁদো-কাঁদো স্বর ফোটে, এতাে হাসিখুশি মানুষ, এরকম কাউরি কিছু না বলি চেরটাকালের মতাে বিদায় নিয়ে যায়, এ্যাঁ? মন তাে শান্তি পায় না বাবা, মনকে বুঝ দিতি পারি না! ইয়াকুবের পিঠে হাত রেখে বলে, আমাকে তুমি চেন না বাবা! আমার নাম এহােসান আলী, ডাক্তারি করি, বাজারে ডিসপেন্সারি আছে। এহোসান ডাক্তারের দোকান বললি কাকপক্ষীও চেনে। তােমার আব্বার বন্ধু বলাে আত্মীয় বলো ছোটোভাই বলাে আমাদের ওঠা-বসা খাওয়া-দাওয়া সব একসাথে ছেলো বুঝেছাে ? আমি রয়ে গেলাম মানুষের নাড়ি টিপতি, আর যে মানুষ সদাসর্বদা হাসিয়ে রাখতাে, হাস্যরসে সর্বজনেরে মাতিয়ে রাখতাে, সে-ই কিনা সবারে কাঁদায়ে চলি গেলাে। এ্যাঁ ? লােকটার কথা সব স্পষ্ট শােনা গেলাে। নােনতা জল ভরা চোখ ও বাষ্পাচ্ছন্ন মাথাতেও ইয়াকুবের অস্বস্তি লাগে। লােকটা কে ?– গ্রামের ডাক্তার, এহসান ডাক্তার। কার সম্বন্ধে কথা বলছে ?-বাবার সম্বন্ধে ? বাবার মুখটা ভালাে করে দ্যাখা দরকার। হ্যাঁ, সেই আশরাফ আলীই বটে! সেই ছােট্টো চিবুক সেই গাল এবং পান-না-খাওয়া ও বিড়ি-না-টানা চাপা ঠোঁট। এই সব মিলিয়েই গম্ভীর মুখমণ্ডল, মামারা খালারা যাকে বলতাে পােস্টঅফিসের সীল। বড়োখালার রিপাের্ট অনুসারে আশরাফ আলীর টাইপটা শুরু থেকেই এরকম।
আশরাফ আলী পড়াশােনা করতাে ফিরােজার মামার বাড়িতে থেকে। সে মামাবাড়ি ওদের একই রাস্তায়, বেচারাম দেউড়ির এমাথা ওমাথা। খুব ভােরে ঘুম থেকে উঠে খড়ম পায়েই সে মিটফোর্ড হাসপাতাল পর্যন্ত দুটো চক্কর দিয়ে আসতাে। এই প্রাতঃভ্রমণ করতে করতে নিমের দাঁতনে মেসওয়াক করা। ফজরের নামাজ পড়ে মাথার কিস্তি টুপি না খুলেই ফিরােজার মামাতাে ভাই-বােনদের সে কড়াকিয়া শতকিয়া মুখস্থ করাতাে। সাড়ে ন'টার দিকে তার পরনে পাজামা-শার্ট, অর্থাৎ এখন তার কলেজে যাওয়ার সময়। আশরাফ আলী থাকতাে একটা ঘরে একাই। তার ঘরে কোনাে টেবিল ছিলাে না। তােষকটা ছােটো থাকায় তক্তপােষের একদিকে বেরিয়ে পড়তাে। ওখানে আশরাফ আলীর বইপত্র সাজানাে থাকতাে। তক্তপােষের নিচে সে রেখে দিতাে পুঁটলিতে বাঁধা চিড়ে-গুড়। আর ছিলাে কাগজে জড়ানাে চিরতার কাঠি। খিদে পেলে দরজা বন্ধ করে আশরাফ আলী শুকনাে চিড়ে খেতাে। বুঝলি না, তাের বাবা ছিলাে পুরাে গাঁইয়া, তােরা আজকাল "ক্ষ্যাত" বলিস না— সেই মাল।' বড়োখালাম্মার কথাবার্তা ভয়ানক কাটা-কাটা, শুনতে একটুও ভালাে লাগে না, তাের বাবা কলেজে গেলে কি মসজিদে গেলে আমরা তার ঘরে ঢুকে চিড়ে খেয়ে ফেলতাম, চিরতার কাঠি ফেলে দিতাম, আর তাের বাপ ফিরে এসে সবই বুঝতাে, রাগে গজ গজ করতাে, মেয়েদের ঠাট্টা বােঝার ক্ষমতাও তার ছিলাে না।' মেয়েদের দিকে তাকানাে তাে দূরের কথা, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে তার বলতে গেলে কোনাে সম্পর্কই ছিলাে না।'
বাবা থাকতাে তার পড়াশােনা নিয়ে, অঙ্ক-বাঙলা ভালােই জানা ছিলাে, দিনরাত্রি হয় লেখাপড়া নয় কোরান তেলাওয়াৎ। ইংরেজিটা রপ্ত করতে পারেনি বলে আই.এ. আর পাস করা হয়নি। খালাম্মা বলে, “বিয়ে হলে আমরা ভাবলাম আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। হায় রে কপাল! কিসের কী ? একটা ইঞ্চি যদি বদলায়!'
অতাে সােজা! তার বাবা তাে বদলাবার লােক নয়। বিয়ে তাে তুচ্ছ কথা, মরণের পরও আশরাফ আলী একটুও বদলায়নি। সেই টাইট করে সাঁটা ঠোঁট, সেই কাঁটাঝােপের গোঁফ। তার মাজা ছিলাে সােজা, পায়ের পাতায় জোর ছিলাে, তাই নিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছে, কাউকে পরােয়া করেনি। দ্যাখাে না কেমন ডাঁটসে শুয়ে রয়েছে! তােমরা একবার দ্যাখাে না! এই মুখে হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য ইয়াকুবের দুই হাতের আঙুল নিসপিস করে। কিন্তু না। একটুও বিরক্ত করতে সাহস হয় না।
‘বাবা, এসেছাে?' দরজার ওপার থেকেই মেজোমামার ভেঙেপড়া গলা শােনা যায়। মেজোমামা এসে ইয়াকুবকে জড়িয়ে ধরে, 'নাই! নাই! নাই! এতিম হয়ে পড়লি বাবা! তাের মামী শুনে কাঁদতে কাঁদতে গড়ায় আর বলে একুব এতিম হয়ে গেলাে!' এই শোকাহত আলিঙ্গনের ফলে মেজোমামার বুকে ইয়াকুবের মুখ, মেজোমামার বুকের শক্ত মাদুলিটা তার নাকে বড়াে কঠিন লাগে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেজোমামা ইয়াকুবকে ছেড়ে ‘দুলাভাই! দুলাভাই!' বলে চশমা খুলে ইয়াকুবের দিকে এগিয়ে গিয়ে আশরাফ আলীর বুকে নিজের মুখ ঘষতে শুরু করে। মেজোমামার এ সব কাজ অনুমােদন করা যায় না। এই মাখাে-মাখাে ভাব আশরাফ আলীর অসহ্য। এই লােকটা কি আশরাফ আলী মরতে না মরতে তার স্বভাব একেবারে ভুলে গেলাে ?
এহসান ডাক্তার এসে মেজোমামাকে ধরে বাইরে নিয়ে যায়, 'আপনে এমন ভেইঙে পড়লি চলবে কেন? ভাইগ্নেরে বুঝেয়ে সুজোয়ে থামান। বাদ জোহর জানাজা পড়ি আসরের আগেই দাফন সেরি ফেলতি চাই।'
এহসান ডাক্তার বাইরে গেলে স্বস্তি পাওয়া যায়। আব্বা বােধ হয় এই ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করাতাে। আব্বার কী রােগ ? তবে দুজনের মধ্যে সম্পর্ক নিশ্চয়ই খুব ভালাে ছিলাে। মনে হয় আশরাফ আলীর জন্য শােকটা বেচারার চামড়া ফুঁড়ে আরেকটু ভেতরে বিধে গেছে। তাই কার সম্বন্ধে কী বলছে ঠিক ঠাহর করতে পাচ্ছে না।
ফের ভেতরে এসে মেজোমামা আলগােছে ওর পিঠে হাত রাখলে শিরদাঁড়া শির শির করে ওঠে। বলতে ইচ্ছা করে, 'মেজোমামা, আর একটা বছর বাঁচলে আব্বা আর আমি এক সঙ্গে থাকতে পারতাম! সারাটা জীবন আব্বা একা থাকলাে, আব্বার জন্যে কিছুই করতে পারলাম না!' কিন্তু বলা হয় না। আশরাফ আলীর কাফন-মােড়া লাশ লােবান-ধূপের গন্ধের তর্জনী তুলে আদিখ্যেতা করতে বারণ করে। মেজোমামাকে বাইরে ডেকে নিয়ে কারা যেন বাঁশ-চাটাই কেনার টাকা চেয়ে নেয়। আবার সে যেন বলে 'হাট ছাড়া চাটাই পাওয়া যাবে না।' হাট কোথায় ?– হাট কাছেই, দেড়ক্রোশ পথ, কিন্তু বৃহস্পতিবার ছাড়া হাট বসবে না। ডাক্তার পরামর্শ দেয়, দ্যাখাে তাে কুসুমহাটিতে যাও দিনি, মুকুন্দ সাহার গদিতে চাটাই থাকতি পারে।' 'মুকুন্দ সাহা খুচরাে বেচপে ?'
‘শালা চামার ! বেচতে চাইবে না, দুটো পয়সা বেশি দিলে পরে শালার বাপে ঘাড়ে করি এইনে দিয়ে যাবেখন।'
আধ ঘণ্টার মধ্যেই আর একজন কে চলে এলাে, ঢুকতে ঢুকতে বলে, 'কখন হলাে ? কীভাবে হলাে? কী হয়েছিলাে বলাে দিনি ? এ্যাঁ? এখন গফুর পিওন গিয়ে বলে, ও বাবু, মাস্টার সাহেবের জন্যি চাটাই কেনবাে।– চাটাই ক্যানে ? চাটাই দিয়ে কী হবে ?—না, মাস্টার সাহেব মরি গিয়েছে, কব্বরে চাটাই লাগবে !' বেঁটে ও কালাে লােকটা ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মােছে, ধরা গলায় বলে, 'আমারে কেউ খবর দিলে না, এ্যাঁ? পেরায় হাটে আমার গদিতে গিয়ে হাঁক দিতাে, ও সাহামশায়!—ব্যস, তিনি ঘরে ঢুকলেন তাে আমরা কাজকাম বন্ধ করি তারেই ঘিরি বসলাম। মাস্টার সাহেব এলি পরে কিসের হিসেবনিকেশ, কিসের বেচাকেনা। কী রসিক মানুষ, একবার গল্পগুজব শুরু করলাে তাে রাত দশটাই কী আর বারােটাই কী ?'
ইয়াকুব বেশ ঝামেলায় পড়ে, তার মাথার গাঁথুনি শিথিল হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। ছবিতে-স্মৃতিতে, চোখে-ঠোটে-চিবুকে, প্রােফাইলে-পাের্টুেটে আশরাফ আলীকে যেভাবে সে গড়ে তােলে, এই সব সংলাপের তােড়ে সবই দারুণরকম টাল খায়।
‘সেদিন কী করিছেন জানেন? কবে’? ‘গত হাটের দিন এট্টু দেরি করি গেছে। হাট ভেঙ্গি গিয়েছে, রাত্রি আটটা হবে। আমি খবর শুইনে রেডিও বন্ধ করি দিয়ে গদিতে বসিছি তাে মাস্টারসায়েব গিয়েই বললেন, 'ও মুকুন্দবাবু, নীলমনিগঞ্জ ইস্টিশনের কাছে বড়াে এ্যাকসিডেন্ট হয়ি গেলাে, খবরে বলে নাই ?'- না তাে। কোয়ানে ?– আরে এই তাে নীলমনিগঞ্জ—'আহা কোমল হিরদয়ের মানুষ, বলতি বলতি কেঁদে ভাসায়!' তার কথা শেষ হতে না হতে ধুতি পরা আর একজন লােক বললাে, “সোমবার সন্ধ্যায় হাই স্কুলের ফিল্ডে বসি ঐ এ্যাকসিডেন নিয়ে কত আক্ষেপ করলে, কতাে দুঃখ করলে ! বলে, নিতাইবাবু ঐ গাড়িতে আমিও থাকতি পারতাম না ? আমার ছেইলে চাকরি করে গােপালপুর, রাজশাহী জেলা, তাে তার ওখানে যাতি হলি তাে আমার ঐ লাইনেই যাতি হবে, আমিও তাে থাকতি পারতাম!—বলেন আর কাঁদেন। আমরা বলি মাস্টার সাহেব নরম মানুষ তাই সতি পারতিছেন না। আসলে কী ? মরণ তারে জানান দিয়ে গেছে, বুইলেন না ?
এ সব উক্তি কার সম্বন্ধে করা হচ্ছে ? সামনে শােয়ানাে কাফন-ঢাকা মৃতদেহ ভালাে করে দ্যাখা দরকার। মুখের কাপড় তুললেই তাে দ্যাখা যায়। ভরসা হয় না। সেই গম্ভীর চেহারা ভেদ করে যদি কারাে হাসিখুশি মুখ ভেসে ওঠে, তাহলে? 
তবে নিতাই কুণ্ডুকে দ্যাখাবার জন্য গফুর পিওন কাপড়টা তুললে ইয়াকুবও ঝুঁকে পড়ে দেখলাে। না কোথায় ? এ সব লােক কী বলছে ? বাবার সেই মুখ সেই আটকানাে ঠোঁট। সেই ঠাণ্ডা কপাল। এমন কি প্রাণপণ মনােযােগে খুঁটিয়ে দেখলে শুকিয়ে যাওয়া জলের রেখার মতাে বিরক্তির পাকা দাগটা পাওয়া যেতে পারে। বােধ হয় আর আধ ঘণ্টাও থাকবে না। এই তাে শেষ। এর মধ্যে যা দ্যাখার শেষবার দেখে নাও। এই তাে তার বন্ধ দুটো চোখ, চোখের ভেতরে মণি দুটো দ্যাখা যায় না। কপালের ভাজ খসে পড়েছে, একটু আগে অস্পষ্ট যে রেখার অনুসন্ধান চলছিলাে তার সমস্ত সম্ভাবনা মসৃণ ফর্সা চামড়ার নিচে অস্ত গেছে। দুই ঠোঁটের টাইট গাঁথুনি কি আলগা হয়ে আসছে ? এইবার এই ঠোঁটজোড়া কি অট্টহাসির ওজন নিয়ে গড়িয়ে পড়বে তারই মাথার ওপর ? নিজের মাথায় হাত রেখে ইয়াকুব আরাে তীক্ষ্ম চোখে তাকায়, এই কি আশরাফ আলী ? এই তাে তার বাবা ?
'কলেমা শাহাদৎ পড়েন, সকলেই পড়েন।' যিনি নিদের্শ দিচ্ছেন তিনি হলেন সাবরেজিস্ট্রার, এক্ষুনি এলেন, এসেই কবরযাত্রীদের নেতৃত্ব ও লাশের খাটিয়ার একটি অংশ তাঁর পাঞ্জাবীআবৃত স্কন্ধে তুলে নিলেন।
'আশহাদো আল্লা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আশহাদো আন্না মােহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।' পালাক্রমে সবাই লাশ বহন করে। ইয়াকুব একেকবার তার বেঁটে ঘাড় পেতে দিলে ঘাড়ের ওপর খুব হাল্কা ঠেকে। তার পাজোড়া টলমল করে ওঠে : খাটিয়া কি শূন্য ? আশরাফ আলী জীবনে কোনােদিন ভালাে করে কথাও বললাে না, মরণের পর তার এ কী রকম আচরণ ? এই আচরণ বুঝতে না বুঝতে গ্রামের গােরস্তানে পৌছে যায়। জানাজার পর সাব-রেজিস্ট্রার বলেন, “তােমার বাবার হয়ে মাফ চেয়ে নাও। পােস্টমাস্টার সাহেব ছিলেন সদাহাস্য সদাপ্রফুল্ল ব্যক্তি। সকলেই তাকে ভালােবাসতাে। আপনারা তার ওপর কোনাে দাবি রাখবেন না।'
ডাক্তার বলে, মাফ চাও বাবা!
‘কেন ?'
মেজোমামা বলে, 'মাফ চাও। তুমি তাঁর একমাত্র সন্তান।'
ডাক্তার প্রম্পট করে, ইয়াকুব বলে, 'আপনারা, আপনারা, আপনারা আমার বাবাকে মাফ করে দেবেন।'
লাশ নামাবার জন্যে কবরে তিনজন লােক দরকার। প্রথমে নামলাে মেজোমামা, তারপর গফুর পিওন। ইয়াকুব নামবার উদ্যোগ নিতেই মেজোমামা বলে, তুমি নেমাে না বাবা, তুমি ধরতে পারবে না। তারপর সকলের দিকে তাকিয়ে বলে, 'আপনাদের একজন নামেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে পাক-সাফ থাকে— এমন কেউ আসেন। কিন্তু ধার্মিক ও পবিত্র কেউ নামবার আগেই ইয়াকুব নেমে পড়লাে।'
'মুর্দার মুখ পশ্চিম দিকে করে দাও, কেবলামুখী করাে।'
‘এইবার  মুখের ঢাকনা খােলো, সবাইকে দ্যাখাও বাবা।'
ইয়াকুব নিজেই ভালাে করে দেখতে চায়। কিন্তু চোখের সামনে নােনাজলের জাফরি কাটা পর্দা। বাবার ঠোটের কোণে কি তার চোখের জল ঢেউ খায় ? ফর্সা রঙের শান্ত কপালে একটা পেন্সিলের রেখা এঁকে দিলেই বাবার পরিচিত বিরক্ত মুখটা দ্যাখা যেতাে। এখানকার লােকজন কি এই দাগটা কোনােদিন দেখতে পায়নি ? নাকি এটা অন্য কারাে মুখ ? নাকি সে এতােকাল অন্য কাউকে দেখে এসেছে ? কাকে ? নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ইয়াকুব ওপরের দিকে মুখ তােলে।
আসরের নামাজের পর সবাই স্কুলের মাঠে বসলাে। হেডমাস্টার, সাব-রেজিস্ট্রার, স্টেশন-মাস্টার, রেলওয়ের এক গার্ডসায়েব, এহসান ডাক্তার, করিম গাজী, রজব আলী সানা— এরা সবাই চায় যে কুলখানিটা এখানেই হােক। ইয়াকুবদের কোনাে অসুবিধা হবে না, খাটাখাটনি যা সব এরাই করবে। তিনদিন পর অনুষ্ঠান শেষ হলে ইয়াকুব ও তার মামা ফিরে যাবে।
সাব-রেজিস্ট্রার লােকটার গঠনমূলক উপদেশ দেওয়ার বাতিক, 'দ্যাখাে, বেশি খরচ করাে না, ফকির মিসকিন খাওয়াও, ম্যাক্সিমাম ২৫/৩০ জন, কোরান খতম করাও, মিলাদ পড়াও, তাহলে তােমার আব্বার রুহের শান্তি হয়।'
'কার ?'
ইয়াকুবের এই প্রশ্নে তার বিচলিত চিত্তের কথা ভেবে লােকজন আরাে অভিভূত হয়। করিম গাজী বলে, 'আহা রে, বাপের মতাে নরম স্বভাব পেইয়েছে! মাটির মানুষ বাবা, তিনি ছিলেন মাটির মানুষ। আমার মেইয়ে, বুয়েছো, এই এতাে বড়ডি হইয়েছে।' করিম গাজী মাঠে আসন পেতে বসেই হাত উঁচু করে মেয়ের বয়স বােঝাবার চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে কেবল তার আড়াই হাত উচ্চতাই বােঝা যায়, ‘তাে সে মেইয়ে জামগাছ থেকে পড়ি জখম হইয়েছে। তাই সে আসতি পারলাে না, মাস্টার সাহেবের খবর শােনবার পর থেইকে সে কেইন্দে-কেইটে একাকার।' বলে করিম গাজী নিজেও ফোঁৎ-ফোঁৎ করে নাক ঝাড়ে এবং খােনা গলায় কোঁকায়, জামগাছ থেইকে পড়ার পর মেইয়ে আমার খালি চেঁচায়, খালি কান্দে। দু'তিনদিন তার খাওয়া-দাওয়ার সাথে কোনাে সম্পর্ক নেই। তার মা কেইন্দে মরে, একটা দানা যদি তার মুখি দেওয়া যায়! শেষ-মেষ মাস্টারসাহেব দেখতি গেলাে, নিজে হাতে মাগুর মাছের ঝােল দিয়ে ভাত মেইখে তারে মুখি তুলি দেয়, তবে তার পেটে অন্ন পড়ে। মাস্টারসাহেব বলে, 'ও মণি, তুমি না খাও তাে তােমার এই বুড়াে ছেলিটা না খেয়েই মরবে।'
এদিকে ইয়াকুবের পাশে বসে গফুর পিওন মেজোমামার কানে ফিস ফিস করে, 'শালার এহােসান ডাক্তারই মাস্টারসাহেবরে খেলাে, বুইলেন ? শালা পেত্যেক দিন নিজির দোকানে বসি ওঁয়ারে মৃতসঞ্জীবনী খাওয়াতাে। বাঞ্চোৎ কিপ্টের একশেষ, নিজেও ওঁয়ার পয়সায় বােতল বােতল মাল গিলতাে। মাস্টার সাহেবের বুকির ব্যথা হলাে মাল খেতি খেতি। এই মাটির মানুষটারে শালা শেষ করি ফেললাে!' মেজোমামা শুনে ভয়ে অস্থির, 'থাক বাবা, এ সব কথা এখন থাক।' গফুর পিওন থামতে চায় না। কিন্তু করিম গাজীর কথা তখন বক্তৃতায় গড়িয়ে পড়েছে, সুতরাং মেজোমামার অখণ্ড মনােযােগ এখন সেই দিকেই। 'বুঝলেন, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ, ধনী-নির্ধন, হিন্দু-মুলমান সকলেই তাঁর উন্নত চরিত্রের কথা মনে করিয়া মুগ্ধ হইত।' মনােযােগী জনতা দেখে করিম গাজীর গলা চড়ে। সাব-রেজিস্ট্রার তখন সভাপতিসুলভ ভঙ্গিতে বলে, অনেকেই অনেক কথা বলবেন। তার কথা বলে শেষ করা যায় না। তবে আমার মনে হয়, আমি বলতে চাই যে, তাঁর রসবােধ বা হাস্যরস বা রসিকতাই তাহার চরিত্রের সর্বপ্রধান গুণ। এখনাে আমার চক্ষু দুইখানি বন্ধ করলে তাঁর হাসিমুখের প্রসন্ন মূর্তিখানি আমার সামনে প্রতিভাত হইয়া ওঠে।'
রাত্রে পােস্টঅফিস সংলগ্ন আশরাফ আলীর পরিত্যক্ত বাসগৃহে আশরাফ আলীর চওড়া তক্তপােষে শুয়ে মেজোমামা হু হু করে কাঁদে। লােকটা বড় কাঁদতে পারে। নানীর মৃত্যুর পর এক মাস ধরে একনাগাড়ে কান্নাকাটি করেছে। একটু বিরতি দিয়ে সে ডাকে, ‘গফুর!' গফুর পিওন বারান্দায় মশারি টাঙাচ্ছিলাে। সে এলে মেজোমামা বলে, 'এক গ্লাস পানি খাওয়াও তাে ভাই।'
হ্যারিকেনের সলতে বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে ঘরের দেওয়াল, বিছানা, টেবিল, আলনা, জলের কুঁজো, দড়িতে ঝােলানাে গামছা, লুঙ্গি সব দুলে উঠলাে। জল-খাওয়া ঠাণ্ডা গলায় বলা মেজোমামার কথাও শির শির করে কাঁপে, ‘দুলাভাই এখানে খুব পপুলার ছিলাে, না রে?' শুয়ে পড়তে পড়তে মেজোমামা ফের বলে, 'হ্যারিকেন কমাবার দরকার নেই।'
এই ঘর, দেওয়াল, বিছানা, দেওয়ালের ছায়া— সবই ইয়াকুবের অপরিচিত। আশরাফ আলী এই ঘরে পাঁচ-ছয় বৎসর কাটিয়ে দেয়, তেইশটা বছর সে এইভাবে জীবন-যাপন করেছে। এই বিছানায় শুয়ে থাকতাে। শালার মেজোমামাকে হটিয়ে এখানে আশরাফ আলীকে দিব্যি শুইয়ে দেওয়া চলে। কিন্তু বাবার মুখটা এই সময় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলাে। কবরে নামাবার পর চোখের পাতা খুলে মণি দুটো ভালাে করে দেখে নিলে হতাে। যে বালিশে আশরাফ আলীর মাথা রাখার কথা তার একটি কোণে আঙুল দিয়ে ঘষলে তার চোখের পাতা ওপরে ওঠে এবং অপরিচিত চোখের মণি ভালাে করে মেলতে না মেলতে বুজে যায়। লণ্ঠনের আগুন, কেরােসিন ও ধোয়ার মিলিত গন্ধে ইয়াকুবের নাক খচ খচ করে। ফলে তার নিজেরই তৈরি বিভ্রম ভেঙে গেলেও সে মন খারাপ করার সুযােগ পায় না।
এর চেয়ে বাবার ওপর রাগ করতে পারলে বরং একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। আব্বার ওপর রাগ করার কারণ আছে বৈ কি ? না জীবনে, না মরণে— লােকটা কোনােদিনই তাকে পাত্তা দিলাে না। এদিকে দ্যাখাে, এহসান ডাক্তারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে বােতল ওড়ায়। কার না কার মেয়ে জামগাছ থেকে পড়ে ঠ্যাং ভাঙ্গলে কোন অজপাড়াগাঁয়ে গিয়ে মাগুর মাছের ঝােল দিয়ে তার জন্যে ভাত মাখে। কিন্তু বাবাকে শালা জুৎ করে কোথাও বসানাে যাচ্ছে না। দেখতে না দেখতে সব হাওয়া হয়ে যায়। দরজায় লম্বা একটি ছায়া পড়লাে, সেদিকে ভালাে করে তাকাবার ভরসা হয় না, পাছে নতুন কাউকে দ্যাখে। বুকে বল ধরে ইয়াকুব যদি বা মুখ ফেরালাে তাে দ্যাখো কোথায় কী ? কেউ নেই, কিচ্ছু নেই!
বাবাকে না পেয়ে তার ওপর রাগ করার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। বাবাকে খুঁজতে খুঁজতে মাথা নিচে নেমে আসে, দুই হাঁটুর মধ্যে কখন মাথা গোঁজা হয়ে যায়। তিন মিনিটের তন্দ্রায় একটা মাঠে বসে কয়েকজন গল্পগুজব করে। এটা কোথাকার মাঠ ? কোন মাঠ, কোন মাঠ— ঠাহর করতে করতে উচ্চকণ্ঠ হাসির দমকে মাঠটা ছড়িয়ে পড়ে বিশাল প্রান্তরে, সেখানে মাঠের কোনাে চিহ্নই আর বাকি থাকে না। এমন করে হাসে কে?
সন্ধ্যাবেলার ময়লা শূন্যতা ঝােলে, তার ফাঁকে ফাঁকে হেডমাস্টারকে দ্যাখা যায়, তার পাশে সাব-রেজিস্ট্রার। এহসান ডাক্তার আছে, করিম গাজী আছে, জামগাছের ভাঙা ডাল থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে তার আড়াই হাত লম্বা মেয়ে। কিন্তু আশরাফ আলী কোথায় ? এরকম জোরে জোরে হাসছে কে ? আশরাফ আলীর হাসি ইয়াকুবের অপরিচিত। তাকে সনাক্ত করে কী করে? ফের দমকা একটা হাসি বেজে উঠলে তার তন্দ্রা একেবারে তছনছ হয়ে যায়। চোখ মেলে ইয়াকুব শূন্য ঘর দ্যাখে। বাবা কোথায় ? নেই।
ভাের হবার আগেই মেজোমামাকে ডেকে ইয়াকুব বলে, 'মেজোমামা, ছ'টার ট্রেনে আমি চলে যাই।'
দরজা খােলা, বারান্দায় গফুরের মশারি হাওয়ায় কাঁপে। ভােরবেলায় বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। মেজোমামা পিঠের নিচে থেকে বিছানার চাদর তুলে গায়ের ওপরে চড়িয়েছে। জড়ােসড়াে হয়ে বসে মেজোমামা বলে, 'কী ?'
‘আমার অফিসে অনেক কাজ, আজ বরং আমি চলে যাই।' কিছুক্ষণ পর মেজোমামা উঠে দাঁড়ায়, ‘কেন ? কুলখানি না পরশু!' ‘আপনি ম্যানেজ করে নেবেন।' মেজোমামা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়, ‘ভয় করে ? স্বপ্ন দেখেছিস?'
'নাঃ! ভয় কিসের?' প্যান্টের ভেতরে শার্ট গুঁজে দিতে দিতে ইয়াকুব বলে, 'যাই মামা।'
‘খারাপ লাগছে ? একা একা আরাে খারাপ লাগবে। কুলখানির পর আমিও তাের সঙ্গে যাবাে। তা?

ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী - শওকত ওসমান


ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী
শওকত ওসমান
আমরা সহপাঠী ছিলাম। হৃদ্যতার বন্দি।
বলা বাহুল্য, একই স্কুল। রূপচাঁদ ভুক্ত ছিলেন এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁরই বদান্যতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। গ্রামের নাম নন্দনপুর। শ্রীযুক্ত রূপচাঁদ উক্ত গ্রামের অধিবাসী ছিলেন না। সুতরাং এখন উপলব্ধি করা যায়, বদান্যতার সঙ্গে বিশেষ মহানুভবতা ছিল। প্রতিষ্ঠাতা নিজের গ্রাম নয়, কেন্দ্রীয় একটি গ্রাম বেছে নেন যেন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিদ্যার্থীরা স্কুলে আসতে পারে। পাশ দিয়েই চলে গিয়েছিল সেকালের সরকারি জেলা বোর্ডের সড়ক। পাড়াগাঁয়ে যাতায়াতের কথাও ভাবতে হয়। চষা ক্ষেত, মাঠের আল, খানাখোন্দল, এবড়োখেবড়ো জমি—বিদ্যার্জন এবং লোক-চলাচলের আদ্যে অনুকূল নয়। শ্রীযুক্ত ভুক্ত তা জানতেন—সেদিক থেকেও তাঁর দৃষ্টি প্রশংসনীয়।
আরো একটি কথা বলে রাখা যায়। ষাট বছর পূর্বে অর্থাৎ সে যুগে স্কুলের শ্রেণিবিভাগ আজকের মতো ছিল না। সপ্তম শ্রেণী থেকে উচ্চ ইংরেজি স্কুল বা ইংলিশ হাই স্কুলের ক্লাস শুরু হোত। তারপর ষষ্ঠ শ্রেণী। এইভাবে ক্রমে ক্রমে কমে-কমে প্রথম শ্রেণী বা ফার্স্ট ক্লাস। বর্তমান যুগে গতি বিপরীত। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কোথাও কোথাও যায়। এইসব কথা বলা অতীতের কিছু আঁচ দেওয়ার জন্যে।
পল্লী অঞ্চলে স্কুলের সংখ্যা সে-যুগে ছিল খুব কম। চার-পাঁচ মাইল দূর থেকে অনেককে বিদ্যাভ্যাসে আসতে হোত। শিক্ষাবিস্তারের কারো তাগিদ তাই কৃতজ্ঞতার তুলাদণ্ডে ওজন করা কঠিন ছিল ওই যুগে।
রূপচাঁদ ভুক্ত হাই স্কুলে মুরারি পাচাল ছিল আমার সহপাঠী—ষষ্ঠ শ্রেণীতে। পাচাল পদবিটি সচরাচর দেখা যায় না। আমি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম মুরারির মিষ্টি ব্যবহারে। তার চেহারাটিও ছিল আকর্ষণীয়। স্কুলে পণ্ডিতমশাই কবিতা মুখস্থ করতে দিতেন। মুরারি পাচালের আবৃত্তি হোত সবচেয়ে শ্রুতিমধুর। কৈশোরকাল ভবিষ্যতে সূচারুরূপে ধরা হয়। ক্লাসে মুরারি ফার্স্ট হোত না বটে, কিন্তু উপরের দিকে—অর্থাৎ, প্রথম চার-পাঁচজনের মধ্যে তার পজিশন ছিল বাঁধা।
ইংরেজি প্রবাদ : প্রত্যুষকাল দিনের সূচনা। কথাটা মুরারির ক্ষেত্রে মিথ্যে হয়ে গেল।
ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে প্রমোশন পাওয়ার পরই মুরারির মাথার গণ্ডগোল দেখা দিল। খেয়ালের বশে কখন কী করে বসবে বলা দায়। হাফ-ইয়ার্লি বা ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় দেখা গেল সে ফার্স্ট হয়ে বসে আছে। সব বিষয়ে ফার্স্ট। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে মাঠে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে, বিকেলে ‘ফিট’ হয়ে পড়ে গেল স্কুলের কম্পাউন্ডে। মাইল দুই দূরে গ্রাম। খবর পেয়ে বাড়ির লোকেরা ওকে তুলে নিয়ে যায়। পাঁচ দিন মুরারি বিছানায় পড়ে রইল। আশ্চর্য, এক জল ছাড়া আর কিছু আহার করল না। সাত দিনের মাথায় সে আবার স্বাভাবিক, যেন কিছুই ঘটেনি।
উদ্বিগ্ন মা-বাবা মুরারির চিকিৎসার দিকে মন দিলেন। সে যুগে মনোরোগের বৈজ্ঞানিক কেতায় চিকিৎসার কোনো বন্দোবস্ত ছিল না। হাতুড়ে কবিরাজ, তুকতাক, ফুঁকফাঁক অথবা কোনো ঠাকুরের থানে মানত—এসবই ছিল দাওয়াই। কোনো মন্দির বা দরগায় ‘হত্যে’ দিয়ে পড়ে থাকারও রেওয়াজ ছিল। সেখানে হিন্দু-মুসলমান বিপদে পড়ে এক গোয়ালের গরু। ঠাকুরের থান বা পিরের দরগার ক্ষেত্রে সে যুগে কোনো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না।
মুরারির বাবা-মা মুষড়ে পড়লেন। অমন ব্রিলিয়ান্ট ছেলে শেষে এমন ব্যাধির খপ্পরে পড়ল। তখন মুরারি স্কুলে আসত খেয়ালের বশবর্তী হয়ে। গার্জেনদের সঙ্গে স্কুল-কর্তৃপক্ষের একটা অলিখিত চুক্তি ছিল। মুরারি স্কুলে যাক বা না যাক, বেতন দিয়ে যাবেন বাবা। তিনি উচ্চবিত্ত কৃষক। টাকাপয়সার তেমন অভাব ছিল না।
মুরারি স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক—যেকোনো অবস্থায় আমার কাছে এলে শান্ত হয়ে যেত, কথা বলত আমার সঙ্গে। তার বেশির ভাগ অবিশ্যি অসংলগ্ন। কিন্তু তার আদব-কায়দার পরিধি একচুল এদিক-ওদিক হোত না। মুরারির বাবা তাই আমাকে তাঁদের বাড়ি যেতে বলতেন। আমার মা-বাবা আবার দু’মাইল রাস্তা একা একা আমাকে ছেড়ে দিতে রাজি হতেন না। কাজেই সঙ্গী খুঁজতে হোত। তবু মুরারি অসুস্থ হলে আমি তাদের বাড়ি যেতাম। সকালে গিয়ে বিকেলে ফেরা। আমারও তো লেখাপড়া আছে। তবু সব অবহেলায় পাশে ঠেলে মুরারিদের বাড়ি যেতে আমার ভালোই লাগত। কিন্তু কাছে গেলে মন হাঁকাহাঁকি জুড়ে দিত ভেতরে-ভেতরে—’পালাও, পালাও।’ কারণ, অসংলগ্ন প্রলাপ মাঝে মাঝে শোনার ধৈর্য কতক্ষণ আর থাকে?
রেহাই পাওয়া যেত বৈকি। যখন সে স্বাভাবিক তখন তো সে বহু সুবোধ বালকের চেয়েও ঢের বেশি শিষ্টাচারী। মাঝে মাঝে সে ক্লাস করত। টিচার পড়া ধরলে জবাব দিত একদম ঠিক ঠিক। ছেলে তো খারাপ নয়। একদিক থেকে তুখখার (তীক্ষ্নধার) বলা যায়। ক্লাসের ফার্স্ট বয় হয়তো নয়, তবে কাছাকাছি তো বটেই।
মুশকিল ওইখানে-কখন শ্রীমান মুরারি পাচালের মাথা বিগড়াবে, তার তো ঠাঁই-ঠিকানা নেই। বিগড়ে গেলে তো সে আর এক চিজ অথবা চিড়িয়া। হয়তো মাঠে মাঠে দৌড় মেরে শেষে কোনো পাড়ার কাছে এসে চিৎকার পাড়বে, ‘আমি এই কলিযুগের ত্রাণকারী। পাপে ভরে গেছে পৃথিবী। পাপ ঘরের ভেতর পোকার মতো কিলবিল করছে। আমি ফুঁ দিলেই সব উড়ে যাবে। ফুঁ-ফুঁ-ফুঁ...।’ তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে ফুৎকার-ধ্বনি প্রদান চলবে বহুক্ষণ।
এসব কাণ্ড বিসদৃশ কিছু নয়। আশপাশে যারা থাকে তাদের কিছু হাসির খোরাক। কিন্তু আরো নানা রকম ব্যাপার বাধিয়ে বসত মুরারি। কথায় বলে, পাগলের কাণ্ড। মাথা ভালো থাকলে সে সোজা স্কুলে চলে আসত। কামাই করত না। চুপচাপ বসে যেত পিছনের বেঞ্চিতে। অবিশ্যি মুরারির আবির্ভাবে ক্লাসের পরিবেশ সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক হয়ে উঠত। শিক্ষক ক্লাসে, তাই ছাত্ররা হল্লার সুযোগ পেত না। কিন্তু গা টেপাটেপি করত চাপা-হাসিতে।
একদিন ক্লাসে সত্যি এক কাণ্ড ঘটে গেল। বলা বাহুল্য, মুরারির বেহাল হালৎ। আগে ওর ব্লাডপ্রেশার ছিল না। সম্প্রতি তাও এসে জুটেছে। মুরারি ক্লাসে ঢুকেই সম্বোধনী বক্তৃতা জুড়ে দেয়, ‘ভদ্রমহোদয় সঙ্গীগণ, আমি শ্রীমুরারি পাচাল, পিতা শ্রীঅমুকচন্দ্র পাচাল তস্য সন্তান আমি কোনো বদ্ধ পাগল নই। তবে আমি পাগাল। তা-ও ঠিক। ডিগ্রির হেরফের। হ্যাঁ আমি, কাল থেকে নয়, পাঁচ শ বছর আগে থেকে সন্ন্যাসী হয়ে গেছি। সংসারত্যাগী। আমার ইহজগতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমি সন্ন্যাসী...’
ভালো কথা, আমাদের অঙ্কের মাস্টারমশাই উপেনবাবু তখন ক্লাস নিচ্ছিলেন। তাঁর টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েই মুরারি চার-পাঁচ মিনিট আরো উপদেশমূলক বক্তৃৃতা দিল। চমৎকার যুক্তির গাঁথুনি। কে বলে মুরারি পাগল। কিন্তু উপেনবাবু বোধ হয় ভুল করে তাকে বাধা দিয়ে ফেললেন। না, বাধাও ঠিক নয়। তিনি কেশে উঠেছিলেন। তখনো মুরারি সকলকে সম্বোধন করে বলে চলে, ‘বন্ধুগণ, আমি সন্ন্যাসী। ইহজগতের সঙ্গে আমার নীল-ইংরেজি নীল-বাংলার নয়। আমি সন্ন্যাসী—ঠিকই।’
ঠিক এই সময়ে উপেনবাবু বলে ফেললেন, ‘বেশ। তারপর?’
‘তারপর?’ পাল্টা মুরারির প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ, তারপর।’ শিক্ষকের সায়।
‘এখানে একটা কিন্তু আছে।’
‘বলে ফেলো।’ শিক্ষকের তাগিদ।
‘স্যার, আমি সন্ন্যাসী হয়ে গেছি। তা নির্ঘাত অতীব সত্য। কিন্তু, স্যার আমার এখনও ‘নাইট-পলিশান’ হয়ে যায়।’
সেদিন উপেনবাবুর মতো রাশভারী শিক্ষক ক্লাসে না থাকলে আমরা যে কী নাদে চিৎকারে-হল্লায় হেসে উঠতাম, তা ঈশ্বর জানেন। আমাদের মুখ চাপা হাতের তালুর ভেতর। উপেনবাবু গম্ভীর গলায় ছড়ি নাচিয়ে (তা ছাড়া তিনি ক্লাসে আসতেন না) প্রায় যুগপৎ ধমক ও চিৎকারের সংযোগ ঘটালেন। আমাদের কানে শুধু বাড়ি পড়তে থাকে, ‘বেরো শুয়ার, বেরো।’
নিমেষে মুরারি হাওয়া।
ক্লাস শেষ হতে তখনো পাঁচ মিনিট বাকি।
উপেনবাবুর মতো নীতিপরায়ণ মানুষ, যিনি পুরো সময় ক্লাসে থাকেন, সেদিন আদেশের সুরেই বললেন, ‘ক্লাস শেষ। চুপচাপ বসে থাকো, অন্য টিচার না আসা পর্যন্ত। গোলমাল কোরো না।’
বলা বাহুল্য, তিনি চোখের আড়াল হওয়া মাত্র আমরা কিছু অকালপক্ব বালক (সংখ্যা শতকরা আশি) সশব্দে হো হো করে হেসে উঠলাম। কয়েকজন নিরীহ কিশোর মুরারির উচ্চারিত ইংরেজি শব্দের মানে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল আশপাশের সহপাঠীদের কাছ থেকে। ফলে হাসির হররা আর সহজে থামতে চায় না, তাদের বিলম্বে যোগদান-হেতু।
এহেন মুরারি কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিল। দু-তিন বছর নষ্ট হলো তার। কিন্তু সে ম্যাট্রিক পাস করে ফেলল এবং প্রথম বিভাগে। বাপ-মা তো তার ভবিষ্যতের আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তবু নসিব ফেরে। পাতা-চাপা আর পাথর-চাপা কপালে তফাত আছে।
এখানে দেখা গেল, কপাল প্রথম পর্যায়ে পড়ে। খুব ভালো রেজাল্ট, মুরারি আই-এ পাস করে ফেলল। বাপ-মা খাতিরজমা। দু-তিন বছর উপর্যুপরি কেটে গেছে। আর বোধ হয় মাথার গেরো নেই।
তা ছাড়া ম্যাট্রিক পাসের পর যখন মুরারির মামা বিজয়বাবু ওকে শহরে কলেজে ভর্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, মুরারির মা বেঁকে বসেছিলেন, "দাদা, চাষিবাসির ছেলে অত ‘নেকাপড়ায়’ কাজ নেই। মুরারি আমার কাছে থাকবে। স্বাভাবিক হলে আলাদা কথা ছিল। ওকে শহরে পাঠাব না।"
বিজয়বাবু এই এলাকায় সকলের শ্রদ্ধাভাজন। কৃষক-পল্লী থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কেরানির চাকরি পেয়েছেন। তা কম গৌরবের কথা নয়। তাঁর কথার দাম আছে। বোন নিজের মতামত দিল। কিন্তু ভগ্নীপতির শ্যালকের মতে মত। শ্যালক বয়সে বড়। তদুপরি সরকারি চাকুরে। বোনের বায়না টিকল না। তা ছাড়া শহরে কলেজের পড়ার হাতছানি মুরারিকে বেশ উত্তেজিত রেখেছিল। মাকে সে নিজের রাস্তায় টেনে নিয়ে এলো সহজে।
দু’বছর পর বিজয়বাবুর মর্যাদা প্রায় দেবতার পর্যায়ে পৌঁছায় আর কী। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সব অক্ষরে অক্ষরে ফলতে শুরু করেছে। যাকে সবাই বাতিল করে দিয়েছিল, সে পরীক্ষায় অমন ফল দেখাবে, কেউ ভাবতে পারেনি।
মুরারি বি-এ ক্লাসে ভর্তি হলো। শহরের পথঘাট চেনা হয়ে গেছে। চালচলন রপ্ত হতে বেশি দেরি লাগেনি। ফিটফাট থাকে সে। মাথার চুল বেশ পরিপাটি করে রাখে। কিন্তু টেরি কাটে না। তার বাবা বলেন, অমন টেরিকাটা ছেলেরা নাকি গোল্লায় যায় আর ওরা দুশ্চরিত্র হয়। মামা বিজয়বাবুও সেই পন্থী। মুরারি তা মেনে নিয়েছিল।
এককথায়, শহুরে দু’বছর বসবাসের ফলে মুরারি আদব-কায়দায় পিছিয়ে পড়ে থাকেনি। ছুটিতে গাঁয়ে ফিরলে বাবা খুব আনন্দিত হতেন। মা তো ঠাকুরের সিন্নি মানত, পুত্রের কল্যাণ-প্রার্থনায়। এক নয়, কত ঠাকুরের, তা তাঁরই জানা। বিজয়বাবু প্রায়ই বলতেন, ‘তোমার এই ছেলে আখেরে কাজ দেবে।’ ভগ্নীপতি এমন কথার জবাব দিতেন বৈকি, ‘দাদা, আপনি ওকে আশীর্বাদ করুন, ও যেন সুস্থ থাকে। নইলে ওর কাছে থেকে আমি কিছু পিত্যেশ করি নে।’
সবই ঠিকঠিক চলছিল। মুরারির বি-এ ক্লাসে কয়েক মাস কেটে গেল। প্রথম প্রথম কলেজের ডিবেটিং, অন্যান্য অনুষ্ঠানে সে যোগ দিত না। ইদানীং শুধু যোগ না, সে রীতিমতো শরিক হতে লাগল। ছড়িয়ে পড়ল মুরারির খ্যাতি ভালো ডিবেটার হিসেবে। আকর্ষণ, মুখর চেহারা। তেমনই কণ্ঠ। পূর্বে স্কুলে আবৃত্তির সময় তো বোঝা যেত। এখন তর্কস্থলে আর একরকমের খোলতাই রূপ দেখা গেল। শিক্ষকরা খুব আশান্বিত। আন্তকলেজ তর্ক-প্রতিযোগিতায় তাঁরা মুরারিকে প্রতিনিধিরূপে পাঠাবেন। শুধু বাচনভঙ্গি নয়, মুরারির ধারালো যুক্তি সেই সঙ্গে ঝিলিক দিয়ে উঠত। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ। প্রতিপক্ষ ঘায়েল বা ধরাশায়ী।
এ হেন মুরারি।
কিন্তু ঠিক পাঁচ-ছ’মাস পরে তার মাথার ব্যাধি আবার দেখা দিল। তখন সে আর নিয়মিত ক্লাস করত না। কলেজে গেলে একদিকে চুপচাপ বসে থাকত। ব্যক্তিত্বে, গুণে মুগ্ধ অনেকে মুরারির বন্ধুত্বলোভী। তারা মুরারির ভেতরগোঁজা ভাব দেখে ভাবলে, ‘ব্যাটা ভালো ডিবেটার। সেই গুমরে আর কারো সঙ্গে মিশতে অনিচ্ছুক।’ অনেকে ওর পরিবর্তন দেখে ক্ষুব্ধ। ডিবেটিং ক্লাবেও সে আর রীতিমতো যায় না। যেদিন যায়, প্রতিপক্ষকে প্রায় মেরে বসার উপক্রম করে। তর্ক আর তার কাছে বাকযুদ্ধ নয়। সুযোগ পেলে সে অন্য দলের মাথা গুঁড়িয়ে দিয়ে তবে শান্ত হবে। একদিন তো হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। এক অধ্যাপক মাঝখানে পড়ে ব্যাপারটা আর এগোতে দিলেন না। কলেজের আবহাওয়া সামান্য তেতে রইল। কারণ, দলাদলি। মুরারির সমর্থক অবিশ্যি কম ছিল না। কিন্তু সে নিয়মিত কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিল। প্রথম দিকে তিন চার দিন বাদ যেত হ্নায়। পরে হ্নায় সাত দিন এবং তা আরো গড়িয়ে যেতে লাগল।
মামা বিজয়বাবু ভাগ্নে পরিবর্তনে কোনো খোঁজ পাননি গোড়ার দিকে। মুরারি ভালো ছেলে, লেখাপড়ায় ফাঁকি দেওয়ার অভ্যেস নেই। রেজাল্টই প্রমাণ।
মেসে থাকে মামা-ভাগ্নে। এক কামরায় ডবল সিট। মামা-ভাগ্নে অবিশ্যি কথাবার্তা হয় কম। কিন্তু মুরারির হালেচালে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। কথাবার্তা কম। তা গুরুজনের সঙ্গে বয়োকনিষ্ঠের চিরাচরিত আদবের ব্যাপার। মুরারি কলেজে না গিয়ে শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। পার্কে, গাছতলায় শুয়ে আকাশ-পাতাল বিচরণ করে—মামা এসবের বিন্দুবিসর্গ জানতেন না।
একদিন আপিস যাওয়ার সময় বিজয়বাবুর চোখে পড়ল, ভাগ্নে নিজের সিটে শুয়ে আছে। একটা বই খোলা বুকের ওপর। মামা ভাবলেন, হয়তো ক্লান্তির চোখে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। আপিস থেকে ফিরে এসে তিনি মুরারিকে যে অবস্থায় দেখেছিলেন ঠিক সেই অবস্থায় পড়া শুরু করেছিল। ফলে ক্লান্তির চোটে ওই দশা। কিন্তু টেবিলের ওপর ভাত-তরকারি চাপা রয়েছে। বামনঠাকুরকে বলা আছে, মেসে কারো আবশ্যক পড়লে টেবিলে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখবে—সময়মতো যার যখন খুশি খাবে। ঢাকনি তুলে বিজয়বাবু দেখেন, মুরারি কিছু স্পর্শ করেনি।
মামা বিচলিত হয়ে পড়লেন। গোয়ালপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ-দর্শন। আপিস-ফেরত তিনি নিজেও ক্লান্ত। হাতমুখ ধুয়ে টিফিন সেরে অকুস্থলে পৌঁছলেন।
মুরারি তখনো নির্বিকার, গভীর ঘুমে মগ্ন। মামার অস্তিত্ব কি গতিবিধির খোঁজ তার কাছে ছিল না।
বিজয়বাবু কিছুক্ষণ ভাগ্নের দিকে অপলক তাকিয়ে ডাক দিলেন, ‘মুরারি-মুরারি।’ বেশ কয়েকবার।
মুরারি আচমকা উঠে বসে এবং ঘুমভাঙা উচ্চারণ করে, ‘মামা—!’
—এ কী? তুই এখনো খাসনি? শরীর খারাপ?
—না।
—তবে?
—ক্ষিধে নেই।
—তাহলে শরীর খারাপ।
—না।
কথোপকথনের ভেতর মুরারি একসময় বলে বসে, ‘মামা, আমি মুখহাত ধুয়ে আসি। আপনার সঙ্গে কথা আছে।’
—জলদি আয়। খাবি নে?
—না। অবেলা অসময়ে না খাওয়াই শরীরের জন্যে ভালো।
বিজয়বাবু কিছু আশ্বস্ত হন। মনের চতুর্দিকে নানা আশঙ্কা। আবার কি পুরাতন ব্যাধি ফিরে এলো? অবহেলায় আহার স্বাস্থ্যপ্রদ নয়। এতটুকু যার চেতনায় স্বাক্ষর আছে, তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা অনর্থক।
মেসের উঠানে চৌবাচ্চা। সেখানেই বারোয়ারি স্নানের ব্যবস্থা। একটু পরে মুরারি ফিরে এলো গামছায় মাথা মুছতে মুছতে। সে কেবল মুখহাত ধোয়নি, মাথায়ও প্রচুর জল ঢেলেছে। তা মামার চোখ এড়িয়ে যায়নি।
কে বলবে, ওই ব্যক্তির ভেতর অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার কোনো লক্ষণ আছে? এমনকি মুরারি ঠাকুরকে চা দিয়ে যেতে বললে। এক টিনে মামা-ভাগ্নের বিস্কুট থাকে এজমালি। মুরারি তা খেতে খেতে মামাকে জানায় যে, তার মাথায় কয়েক মাস থেকে একটা প্রশ্ন জেগেছে। এখন মাতুলের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষ।
বিজয়বাবু অমন কথায় মনে মনে খুব খুশি হলেন। তাঁর পূর্বাশঙ্কা তাহলে অমূলক। হয়তো শারীরিক কারণে মুরারি এতক্ষণ ঘুমিয়েছে এবং কিছু খায়নি।
জলখাবার শেষে মাতুল-ভাগ্নের সংলাপ শুরু হলো।
মুরারি। ক’মাস থেকে আমার মনে হচ্ছে, ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান। মানুষও তা হতে পারে।
বিজয়। তা কী করে সম্ভব?
মুরারি। সম্ভব। কেউ কোনোদিন চেষ্টা করে দেখেছে কি?
বিজয়। তা দেখেনি।
মুরারি। তাহলে কী করে আপনি বলতে পারেন মানুষের পক্ষে সর্বত্র বিরাজমান হওয়া অসম্ভব?
বিজয়। খামকা চেষ্টা করে লাভ কী?
মুরারি। খামকা না। চেষ্টা করে দেখা যাক। যদি সফল না হই, তখন বলা যাবে অসম্ভব।
বিজয়। যদি কেউ বলে আমি প্রশান্ত মহাসাগর এক গণ্ডূষে শুষে নেব, তা কী সম্ভব, না বিশ্বাসযোগ্য?
মুরারি। তা আলাদা ব্যাপার। বিরাজমানতার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। আমার মতে চেষ্টা করে দেখা উচিত।
বিজয়। অনর্থক চেষ্টা। সম্ভব নয়। সব জায়গায় যাবি কী করে? তোর কাছে মোটর আছে, এরোপ্লেন আছে, না ট্রেন আছে?
মুরারি। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়ে যাবে।
বিজয়। অনর্থক চেষ্টা।
মুরারি। চেষ্টার পর অনর্থক বলতে পারেন। কেউ চেষ্টা করেনি। আমি মানুষের ইতিহাসে পথিকৃৎ হতে চাই। জনপ্রিয়তার একটি লক্ষ্য : মানুষের মধ্যে সর্বত্র বিরাজমানতা। প্রকৃতি বাদ যায়। তা যাক। মানুষের দিক থেকে জনপ্রিয়তার মধ্যে ঐশ্বরিক বিভূতি আছে। তাই মানুষ জনপ্রিয় হতে চায়।
বিজয়। কিন্তু ঈশ্বর নিরাকার। তার পক্ষে সর্বত্র বিরাজমানতা সম্ভব। মানুষের আকার আছে। সে একই সময়ে সর্বত্র কিভাবে বিরাজমান হবে?
মামাও সেদিন সহজে ভাগ্নের নিকট হার মানতে রাজি ছিলেন না।
মুরারি। চেষ্টা করলে হবে।
বিজয়। চেষ্টা—?
মুরারি। হ্যাঁ। কেউ কখনো তা করেনি। আমি বলছি, আমি চেষ্টা করব। সফল হব না কেন। একবার ফেল করলে আবার তেড়ে ধরব। এইভাবে সফল না হলে বুঝব অসম্ভব।
বিজয়। খোকা, তোর মাথায় এই খেয়াল কেন চেপে বসল?
কোনো জবাব দিল না মুরারি। মামা নিজের মনে বলে উঠলেন, ‘সব জায়গায় যেতে টিকিট লাগে, তা বুঝি তোর হিসেবে নেই?’
ভাগ্নে তারও কোনো উত্তর দিল না। বরং সেই মুহূর্তে মেস থেকে বেরিয়ে পড়ল সর্বত্র বিরাজমানতার সাধনায়।
মুরারি রিপোর্ট দিল ওই দিন রাত্রি এগারোটার সময় বাসায় ফিরে। তার প্রথম পরিকল্পনা : সে শহরের এক ইঞ্চি জায়গা বাদ দিবে না যেখানে তার পা বা হাত পড়বে না। বিকেলে বেরিয়ে সে প্রচুর হেঁটেছে। প্রত্যেক জায়গায় তার উপস্থিতি সে এইভাবে জানান দেবে।
মামা বাধা দিলেন না বা কোনো তর্কে গেলেন না। তিনি ভাবলেন : পুরাতন ব্যাধি, বোধ হয়, আবার নতুন আকারে দেখা দিয়েছে।
মুরারির বাড়িতে এসব খবর পৌঁছাল না।
মামার জিদেই সে শহরে পড়াশোনা শুরু করে। এখন সব অপরাধের বোঝা তার মাথার ওপর পড়বে। তাই তিনি স্থির করলেন, কী ঘটে দেখা যাক আরো কিছুদিন। নেহাত বেগতিক কিছু হলে ওকে আবার গাঁয়ে ফিরিয়ে নেয়া যাবে।
তেমন কোনো গোলমাল বাধায় না মুরারি। খেয়ালমতো সে বেরিয়ে যায় আবার আস্তানায় ফিরে আসে। মেসে বিজয়বাবুকে সকলে শ্রদ্ধা করে। তিনি তাদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কোনো ভায়োলেন্ট, উগ্র পাগল নয়। মাথায় কিছু ছিট আছে। তাই আচরণ অস্বাভাবিক। নচেৎ মেসে কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা নেই তার।
মুরারির লেখাপড়া শিকেয় উঠেছে, তা বলা চলে না। মাঝে মাঝে সে কলেজে যায়, ক্লাস করে। তখন তার মধ্যে পাগলামির সামান্য রেশ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। বিজয়বাবু তাই ভাগ্নে সম্বন্ধে আশান্বিত। এসব একদিন কেটে যাবে।
কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ দেখা গেল না।
মেসে খবরের কাগজ নেওয়া হয়—একখানা ইংরেজি ও একখানা বাংলা দৈনিক। মুরারি প্রথমে সভাসমিতির কলামে নজর রাখে। বড় বড় মিটিং হলে তো আর কথা নেই। সে ঠিক সময়মতো পৌঁছে যাবে। কিন্তু সভায় কিছু শোনার প্রয়োজন নেই তার। সে এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকবে! রামঃ, রামঃ! তেমন বান্দা নয় মুরারি। সে সভায় এক প্রান্ত থেকে উজিয়ে আরেক প্রান্তে গিয়ে ঠেকবে। ভিড় থাকলে তা ঠেলে ঠেলেই এগোবে। সভা শেষে মেসে ফিরে সে মামাকে দেবে রিপোর্ট। মিটিংয়ের নয়, তার নিজের। ‘যদ্দূর পারা যায় আমি নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছি। ঈশ্বরের সঙ্গে আমার প্রতিযোগিতা।’ এমনধারা মন্তব্য করত মুরারি মামার কাছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাঁ-হুঁ করে তিনি সেরে দিতেন। আবার মাঝে মাঝে সতর্কবাণী শোনাতেন।
—শোনো বাপু, ঈশ্বরের সঙ্গে খামকা লড়তে চাও কেন?
—কেউ লড়ে না, আমি লড়ে দেখতে চাই!
—অসম প্রতিযোগিতা। কোথায় দুনিয়ার স্রষ্টা আর কোথায় তুমি! কোথায় রাজাভোজ আর...। বাক্য অসমাপ্ত থাকে।
—তবু চেষ্টা ভালো।
—অসম প্রতিযোগিতা আখেরে সব্বনাশ টেনে আনে।
—মামা, ওসব বস্তাপচা বুলি রেখে দিন।
এমন অবজ্ঞার সুরে মুরারি কোনোদিন গুরুজনের সঙ্গে কোনো কথা উচ্চারণ করেনি।
মামা তো ভাগ্নের সব খবর রাখতেন না। তিনি ছাপোষা কেরানি মানুষ। নিজের চাকরি এবং ঝামেলা নিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত। কাজেই মুরারির সব হালচালের খবর রাখা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
একদিন মুরারি শহরের জলের ট্যাংকের ছাদের কাছাকাছি পৌঁছে বক্তৃতা জুড়ে দিয়েছিল। পথচারীরা বিস্মিত, যেকোনো মুহূর্তে একটা দুর্ঘটনার আশঙ্কা তারা করছিল। লোক জমে গেল তামাশা দেখতে। শেষে ফায়ার ব্রিগেডে খবর দেওয়া হলো। তারা সে সিঁড়ি বেয়ে মুরারির কাছাকাছি পৌঁছে নানা আর্জি-মিনতি করে। পরে সুবোধ বালকের মতো মুরারি নেমে আসে। নামাও তো কম বিপজ্জনক নয়। খুব গালাগাল খেয়েছিল সেদিন মুরারি পুলিশের কাছে।
বিজয়বাবু ভাগ্নের এসব কীর্তিকলাপ সম্পর্কে আদৌ ওয়াকিবহাল ছিলেন না। কারণ, খবর পৌঁছত না তাঁর কাছে। উপরিউক্ত খবর তিনি কাগজে পড়েছিলেন, ‘খামখেয়ালি যুবকের কাণ্ড’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে। তিনি ভাবতে পারেননি গুণধর যুবক তাঁর ভাগ্নে। রিপোর্টে নামের উল্লেখ ছিল না।
আর একবার টেলিফোনের তারগুচ্ছের ওপর বসে গান গাইতে শুরু করেছিল মুরারি। ইলেকট্রিক তার হলে তো চরম একটা কিছু ঘটে যেত।
বিজয়বাবুর জবাবদিহি ছিল নিজের বিবেকের কাছে। তাঁর পরামর্শেই তো ভাগ্নে আজ শহরে। তবে তখনো তিনি হাল ছাড়ার বান্দা নন। ভাবতেন ব্যাধি সাময়িক এবং পূর্বের মতো একদিন সেরে যাবে।
কলেজের ছুটিতে বাড়ি যায়নি মুরারি। বাবার চিঠি আসে। মামা উত্তর দেন। বাহানার অভাব হয় না। পরীক্ষা প্রস্তুতি বা ওই জাতীয় আর কিছু। গাঁয়ে গেলে ঘুরে বেড়াবে, পড়াশোনার ক্ষতি হবে।
কিন্তু পরিস্থিতি কূলে ওঠে না। মামা-ভাগ্নের সংলাপ তিক্ত হতে থাকে।
—খোকা, ঈশ্বরের সঙ্গে কি মানুষ পারে?
—হয়তো পারে না। কিন্তু চেষ্টা করে দেখা উচিত। জানো, মামা—।
মামা ভাগ্নের মুখের দিকে তাকান। ওদিকে বাক্যস্রোত যথা-প্রবাহিত, ‘আমি আজকাল কোনো বড় মিটিং বাদ দিইনে। সব জায়গায় যাই। সর্বত্র বিরাজমানতার এই এক উপায়।’
কীভাবে? কৌতূহলে মাতুলের প্রশ্ন।
মিটিংয়ে হাজার হাজার লোক জমে। সেখানে তাদের নিশ্বাস মিশে যাচ্ছে। তুমি এক জায়গায় থেকেও আর একই জায়গায় নেই। তোমার নিশ্বাস তখন প্রবাহপথ পেয়েছে, ধেয়ে চলেছে ওই জোয়ারে।
ভাগিনা থামে। সে ফিলসফির ছাত্র এবং ভালো ছাত্র। মামা আর তর্কে প্রবৃত্ত হন না। আপন দুর্বলতা-সচেতন মামা তাই কথার মোড় ফেরাতে বলেন, ‘খোকা, অসম প্রতিযোগিতা আসলে ভালো নয়। ঈশ্বরের সঙ্গে বেয়াদবি পাপ। তা আখেরে সর্বনাশ ডেকে আনে।’
—বাজে কথা। আমি কোনো বেয়াদবি করছি না, আমি মানুষ হিসেবে চেষ্টা করছি।
মামা হটে গেলেন। কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণী ফলতে বেশি দেরি লাগল না।
সাধারণত যেখানেই যাক, মুরারি রাত্রি দশটা কি এগারোটার মধ্যে ফিরে আসত। মামা নিশ্চিন্ত থাকতেন। অন্তত নিরাপত্তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেনি তাঁর ভগিনীপুত্র।
শীতের এক রাত্রে মুরারি বিছানা ছেড়ে বাইরে পা বাড়িয়েছিল। মামা আদৌ টের পাননি। মুরারির সেই রাত্রির অ্যাডভেঞ্চার পুলিশ ও অন্যান্য সূত্র ধরে পরে রিপোর্টের আকারে পাওয়া যায়।
মুরারির গায়ে ছিল শুধু সুতি চাদর আর ভেতরে গেঞ্জি। পৌষের শেষ। কিন্তু শীতের প্রকোপ কিছু কম ছিল না। মুরারি পাড়া থেকে বেরিয়ে শহরের রাস্তায় পয়লা দফা না হেঁটে গড়িয়ে-গড়িয়ে গায়ে ধুলো মেখেছিল। পরে চাদর খুলে বগলে তুলে নেয় সে। অত রাত্রে পথে কোনো লোক ছিল না। তবু এক বিরল পথচারী তাকে পাগল ভেবে আর কাছে যায়নি বটে, তবে মুরারির প্রলাপ তথা চিৎকার তার কানে পড়েছিল : ‘তিনি সর্বত্র আছেন। জনপ্রিয়তার মধ্যে সেই লক্ষণ মেলে, যা সর্বত্র বিরাজমানতার মধ্যেও পাওয়া যায়। আমিও তেমন সর্বত্র থাকব। কেন থাকব না?’ পথিক-জন গায়ে গরম কোট চাপিয়েও শীতের জুলুমে কাঁপছিল। তখন তার চোখে পড়েছিল, মুরারির উদোম গা, ধুতি মালকোঁচা-মারা আর চাদর বগলে। পাগলের কাণ্ড দেখার ধৈর্য ছিল না পথিকের, এই রিপোর্টটুকু পুলিশের সংগ্রহ।
শীতের রাত্রি গভীর এবং বিস্তৃত। মুরারি অতক্ষণ কী করছিল, তার সব হদিস তো জানার উপায় নেই। তবে পরিমাণ দেখে কিছু কিছু অনুমান করা যায়।
সে মাটির ওপর গড়াগড়ি ছেড়ে কোনো একপর্যায়ে হেঁটেছিল বা দৌড় দিয়েছিল—অথবা এই জাতীয় কিছু করেছিল, যার ফলে সে তিন মাইল দূরে শহরতলিতে পৌঁছায়। বর্ধিষ্ণু শহরের শিং ষাঁড়ের মতো মাটি গুঁতিয়ে-গুঁতিয়ে এগোয়। শিঙের আগায় ধুলোবালি-ময়লা, অন্যান্য আবর্জনা লেগে থাকা স্বাভাবিক। নগর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। এই এলাকায় বাস করে সমাজেও যারা আবর্জনা বিশেষ—মেথর, মুদ্দাফরাস, দীনদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষ। বস্তি তাঁরাই জাঁকিয়ে তোলে সেখানে নর্দমা এবং আকাশের মুখোমুখি অবস্থান ঘটে।
মুরারিকে এমন নর্দমায় পাওয়া যায় পরদিন ভোরে। তখন সে মৃত। মেথরপট্টির পালিত শুয়োরের লীলাভূমি এইসব নর্দমা। মুরারির আশপাশে শুয়োর চরছিল। পোস্টমর্টেম থেকে জানা যায়, ওর শরীর থেকে অনেক রক্ত ঝরেছিল। দেহের কয়েক জায়গায় জখম। অনুমান করা যায়, পুলিশেরও তাই ধারণা, কোনো দাঁতাল শুয়োরের চারণভূমিতে মুরারি অনধিকার প্রবেশ করতে গিয়েছিল। জন্তু তাকে আদৌ শ্রদ্ধা দেখায়নি।
মুরারি জীবনের শেষ অঙ্ক এমনই অনুমানের ব্যাপার হয়ে রইল। ছোট মানিব্যাগে-রক্ষিত চিরকুট থেকে ঠিকানা পাওয়া যায়। ভোর থেকে উৎকণ্ঠিত বিজয়বাবুর কাছে সব খবর পৌঁছায় সন্ধ্যায়—পুলিশের কল্যাণে।
অনেককাল পূর্বের ঘটনা।
অনেক কিছু ভুলে যাওয়ার কথা।
কেবল আজও মুরারি আমার স্মৃতির রাজ্যে সর্বত্র বিরাজমান।